সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > জাতীয় > অচল ঢাকা

অচল ঢাকা

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর সড়ক অনুপাতে এমনিতেই বৈধ যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। তার ওপর ঈদকে সামনে রেখে রাস্তায় নেমেছে বিপুলসংখ্যক মেয়াদোত্তীর্ণ ও চলাচল অনুপোযোগী বাস, মিনিবাস ও হিউম্যান হলার। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যাটারিচালিত অবৈধ ইজিবাইক। সুযোগ বুঝে নগরীর পাঁচ লাখ অবৈধ রিকশার বহরে যুক্ত হয়েছে ঢাকার উপকণ্ঠ এলাকার আরো লাখ দেড়েক রিকশা। সব মিলিয়ে নতুন করে প্রায় পৌনে দু’লাখ যানবাহনের ভিড়ে থমকে গেছে নগরবাসীর জীবন। অচল হয়ে পড়েছে গোটা ঢাকা।

রমজান শুরুর আগে থেকেই ট্রাফিক পুলিশ যানজট নিরসনে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়েও সামান্যতম সফলতা আনতে না পারায় তারাও হতাশ হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় তারা অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়ে ‘রুটিন ওয়ার্ক’ পালনের মধ্যদিয়ে ঈদ পর্যন্ত সময়টুকু পার হওয়ার অপো করছেন। রাজধানীর আশপাশের এলাকার রিকশার অনুপ্রবেশ এবং অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা না গেলে ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে যানজট ততই ভয়াবহ হবে বলে মাঠ পর্যায়ের ট্রাফিক কর্মকর্তারা সাফ জানান দিয়েছেন।

তবে বৈধ যানবাহন মালিকরা বলছেন, ঈদকে সামনে রেখে উপরি অর্থ আদায়ে ট্রাফিক পুলিশ ও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিই (বিআরটিএ) নগরীতে অবৈধ যান চলাচলের সুযোগ করে দিয়ে ঘাপটি মেরে রয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালীদের আতাত রয়েছে। তাই ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝেমধ্যে অভিযান চালাতে গেলে নানা বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। এমনকি নানা অযুহাতে তাদের পুলিশি সহায়তা না দেয়ারও বিস্তর নজির রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রমজানের যানবাহন সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে প্রতি বছরই পরিবহন মালিকরা তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ ভাঙাচোরা বাস-মিনিবাস-হিউম্যান হলার রাজধানীর রাস্তায় নামান। বরাবরের মতো এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। এজন্য রোজা শুরুর বেশকিছু দিন আগে থেকেই গাবতলী, আমিনবাজার, সায়েদাবাদ, পল্লবী ও মিরপুর মাজার রোডের গ্যারেজগুলোতে ব্যবহার অনুপযোগী যানবাহন মেরামত ও রং চং দেয়ার ধুম পড়ে। সেখানকার শ্রমিকরা জানান, প্রতিদিনই অন্তত ১০-১৫টি গাড়ি জোড়াতালি দিয়ে রাস্তায় নামানো হচ্ছে। এসব গাড়ি শুধু কাগজপত্রেই চলাচল অনুপযোগীই নয়, মেরামতের পরও যেকোনো মুহূর্তে চলন্ত অবস্থায় বিগড়ে যেতে পারে।

বিষয়টি স্বীকার করে গাবতলী-গুলিস্তান রুটের গাড়িচালক সাঈদুল বলেন, ‘ঈদ খরচা তুলতে স্যাররা (ট্রাফিক পুলিশ) আমাগো রোজায় মুড়ির টিন (ভাঙাচোরা গাড়ি) চালানোর সুযোগ দিছে; আমরাও তাঁগো কিছু দিয়্যা খুশি রাখতাছি। এতে পাবলিকেরও ‘হেল্প’ হচ্ছে। রোজায় এসব গাড়ি রাস্তায় না নামলে পাবলিকগো হাইট্যা কামে যাওন লাগত।’ সাঈদুলের ভাষ্য, রমজানে যে সংখ্যক মানুষ ঈদ কেনাকাটায় ও বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রাস্তায় নামে তার অর্ধেক যাত্রী পরিবহনের মতো যানবাহন রাজধানীতে নেই। তাই ভাঙাচোরা গাড়ি রাস্তায় নামলেও প্রশাসন তা না দেখার ভান করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট জানান, রোজা শুরুর পর এখন পর্যন্ত আনুমানিক প্রায় দু’হাজার অবৈধ বাস, মিনিবাস, ট্যাক্সিক্যাব, হিউম্যান হলার ও অটোরিকশা রাস্তায় নেমেছে। এসব গাড়ির মালিক-চালকদের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশ ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের সপ্তাহিক লেনদেনের গোপন চুক্তি রয়েছে। রাজধানীর বাইরে থেকে আসা অবৈধ রিকশা চলাচলে সার্জেন্ট টু আপওয়ার্ড কর্মকর্তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই স্বীকার করে ওই সার্জেন্ট বলেন, এটা ছোটদের (কনস্টেবলদের) ঈদ বোনাস, এতে তারা কেউ ভাগ বসান না। নারায়ণগঞ্জ, টঙ্গী, সাভার ও কেরানীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে এসে ঢাকা মহানগরীতে এলাকায় চলাচলকারী রিকশা আটকে প্রতিদিন একজন ট্রাফিক কনস্টেবল ৫শ’ থেকে এক হাজার টাকা আয় করেন বলে জানান তিনি।

ট্রাফিক পুলিশের ওই সার্জেন্ট যে ভুল তথ্য দেননি অবৈধ রিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। রংপুরের চিলমারি থেকে আসা রিকশাচালক জাহাঙ্গীর জানান, রোজার দু’দিন আগে তারা দু’ভাই ঢাকায় এসেছেন। তাদের এক নিকটাত্মীয়ের পরামর্শে ১০ হাজার টাকা করে জামানত দিয়ে টঙ্গী থেকে রিকশা নিয়ে মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল ও শেওড়াপাড়াসহ আশপাশের এলাকায় চালাচ্ছেন। এতে আয় ভালো হলেও প্রতিদিনই দু’তিনশ’ টাকা ট্রাফিক কনস্টেবলদের ঘুষ দিতে হচ্ছে। তবে কখনো কোনো সার্জেন্টকে কোনো টাকা দিতে হয়নি। রমজানের পুরো মাস ঢাকায় রিকশা চালাতে পারলে ১৫-২০ হাজার টাকা বাড়িতে নিয়ে যাওয়া যাবে বলে জাহাঙ্গীর আশা করছেন।

রমজান মাসকে ঘিরে রাজধানীর রাস্তায় বিপুলসংখ্যক অবৈধ যানবাহন চলাচলের কারণে ভয়াবহ যানজটের কথা স্বীকার করে ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অপারেশন কিন স্ট্রিট চলাকালে ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র ও ফিটনেস না থাকায় চার হাজার বাস আটক করা হয়েছিল। এরমধ্যে প্রায় অর্ধশত বাস এখনো আটক আছে। অন্যগুলোর কিছু রাজধানীতে চলাচল করবে না এমন মুচলেকা দিয়ে এবং কাগজপত্র সংশোধন করার শর্তে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। রমজানে যান সঙ্কটের সুযোগে এর কিছু গাড়ি রাস্তায় নেমেছে বলে শুনেছেন। কিন্তু এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাননি। পেলে সংশ্লিষ্ট বাসমালিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।’ তবে রমজানকে ঘিরে বিপুলসংখ্যক অবৈধ রিকশা নগরীতে ঢুকে পড়ার বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করেন পুলিশের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

এদিকে বৈধ যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অবৈধ বাস-মিনিবাস-হিউম্যান হলার ও ট্যাক্সিক্যাবের সংখ্যা বাড়লেও রমজানের শুরু থেকেই নগরবাসী পড়েছে যানবাহনের মহাসঙ্কটে। বিশেষ করে পিকআওয়ারে যানবাহনে চড়তে গিয়ে যাত্রীরা রীতিমত মল্লযুদ্ধে নামছে। রোজা রেখে সামর্থ্যবানদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে অনেককেই বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। পরিবহন মালিকরা এজন্য সিএনজি গ্যাস স্টেশন দিনে ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন। তাদের ভাষ্য, এমনিতেই রমজানে যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। অথচ এ সময় গ্যাস স্টেশন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত বন্ধ রাখায় প্রতিটি গ্যাস স্টেশনে দীর্ঘ লাইন পড়ে। এতে প্রতিটি যানবাহনেরই দু’ থেকে তিন ট্রিপ মার যায়। তাই গাড়ির আধিক্য থাকলেও যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে মহা ভোগান্তিতে। সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারির কারণেও ব্যস্ততম অনেক সড়কে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন পরিবহন মালিকরা।

তবে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক যাত্রী পরিবহনযোগ্য যানবাহনের স্বল্পতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির চাপের কারণে নগরীর অধিকাংশ সড়কে দিনভর ভয়াবহ যানজট থাকলেও সাধারণ যাত্রীরা পড়ছে যানবাহন সঙ্কটের ভোগান্তির মুখে। এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অল্প জায়গায় বেশি যাত্রী পরিবহন করা যায়, এমন ধরনের বাহনকে প্রাধান্য দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন নগর বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধে কার্যকর পদপে গ্রহণ জরুরি বলেও সুপারিশ করেন তারা।

নগরবিদদের ভাষ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ ভাঙাচোরা যানবাহন যাত্রীদের সাময়িক চাপ কমালেও তা যানজট সৃষ্টির েেত্র মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কারণ এসব যান যে কোনো মুহূর্তে সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিকল হয়ে পড়ে। ফলে সৃষ্টি হয় ব্যাপক যানজট। যা নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কেটে যায়।

>