বৃহস্পতিবার , ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ , ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১০ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > অনুমোদন ছাড়াই চলছে নর্দার্ন মেডিকেল কলেজ

অনুমোদন ছাড়াই চলছে নর্দার্ন মেডিকেল কলেজ

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) অনুমোদন ছাড়াই চলছে বেসরকারি নর্দার্ন ইন্টারন্যাশন্যাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ফলে এমবিবিএস পাস করেও কোথাও প্র্যাকটিস করার সুযোগ পাচ্ছেন না এখানকার শিক্ষার্থীরা। কলেজ কর্তৃপক্ষের লাগামহীন দুর্নীতি ও অযোগ্য শিক্ষকদের ফাঁদে পড়ে প্রায় চারশ’ শিক্ষার্থীর ডাক্তার হয়ে ওঠার স্বপ্ন আজ অস্তমিত প্রায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নিজস্ব ক্যাম্পাস ভবন ছাড়াই চলছে নর্দার্ন মেডিকেল কলেজ। হাসপাতালের জন্যও নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে রাজধানীর ধানমণ্ডির ৮/এ সড়কের একটি আবাসিক বাড়িতে, যা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অনুমোদন পাওয়ার নিয়ম পরিপন্থি। এ সব কারণে প্রতিষ্ঠার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও বিএমডিসি অনুমোদন দেয়নি চিকিৎসক তৈরির এ প্রতিষ্ঠানটিকে।

এসব অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অন্তরালে খোঁজ নিতে গিয়ে পাওয়া গেছে অযোগ্য ও ভুয়া শিক্ষক চক্রের সন্ধান। তাদের ফাঁদে পড়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন কলেজের চার শতাধিক শিক্ষার্থী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক অদক্ষতা আর সীমাহীন দুর্নীতি।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে দেখা গেছে, প্রাইভেট এই মেডিকেল কলেজের অন্তত এক ডজন শিক্ষক-কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা ভুয়া অভিজ্ঞতাপত্র ও লবিং-তদবিরের জোরে কলেজটির বড় বড় পদগুলো দখল করে রেখেছেন। এসব শিক্ষকদের অব্যাহত স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতার শিকার হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা প্রার্থী অসহায় রোগীরা।

অভিযুক্ত শিক্ষকদের প্রায় সকলেই নর্দার্ন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে যোগদান করে মিথ্যা ও অসত্য তথ্য দিয়ে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক, এমনকি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। কেউ কেউ আবার বিভাগীয় প্রধানসহ বড় বড় পদ আঁকড়ে বসে আছেন।

বিএমডিসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুযায়ী তারা কোনোভাবেই বর্তমান পদ-পদবী ও সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন না বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এমন শিক্ষকদেরই একজন ডা. আব্দুল মালেক। ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) সাবেক অধ্যাপক পরিচয় দিয়ে নর্দান মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের শিক্ষকতা করছেন তিনি। ১৯৭৬ সালে ঢামেক থেকে এমবিবিএস পাস করার পর তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সহকারী সার্জন, কনসালটেন্ট, সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি ঢামেক থেকেই সহযোগী অধ্যাপক(চলতি দায়িত্ব) হিসেবে অবসরে যান।

ঢামেকে তিনি সহযোগী অধ্যাপক থাকলেও তার বিজনেস কার্ড, সাইন বোর্ডসহ সর্বত্র ঢাকা মেডিকেলের প্রাক্তন অধ্যাপক পরিচয় দিয়ে নির্জলা মিথ্যাচার করছেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে তিনিসহ অনেকে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন নর্দার্ন মেডিকেল কলেজ থেকে। তবে কোনো অদৃশ্য শক্তির জোরে আবারো বহাল হয়ে ‘স্বঘোষিত’ সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানও হয়েছেন।

উল্লেখ্য, সার্জারি বিভাগে কোনো অধ্যাপক না থাকায় বিএমডিসির নির্দেশনাক্রমে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল প্রফেসর মো. মোজাফফর হোসেনকে চলতি বছরের মে মাসে বিভাগে নিয়োগ দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শিক্ষক চক্রটির অসহযোগিতার কারণে এখনও দায়িত্ব বুঝে পাননি বলে জানিয়েছেন প্রফেসর মোজাফফর।

এসব অনিয়ম ও অভিযোগের ব্যাপারে ডা. আব্দুল মালেকের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

নর্দার্ন মেডিকেলের এ চিত্র শুধু ডা. আব্দুল মালেকের নয়, হাসপাতালের শীর্ষ একাধিক কর্মকর্তাসহ অন্তত ১২ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা মিথ্যা ও অসত্য তথ্য দিয়ে রোগী সেবা ও শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।

এসব শিক্ষকদের কারণে ক্লাস চলছে অনিয়মিত ও দায়সারা গোছের। সিলেবাস অসম্পূর্ণ থাকছে। পরীক্ষায় অনিয়মের মাধ্যমে পাস করিয়ে দেওয়ার প্রলোভনসহ নানা অনিয়মের ফলে শিক্ষার্থীদের বহুলাকাঙ্ক্ষিত ডাক্তার হবার স্বপ্ন অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছে।

শুরুর দিকে বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা অধ্যাপক এ মেডিকেল কলেজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও বর্তমান কর্তৃপক্ষ অর্থাভাব দেখিয়ে তাদেরকে বিদায় করে দেয়। অনেক শিক্ষকের ন্যায্য বেতন-ভাতাও প্রদান করেনি কর্তৃপক্ষ। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষাসহ একাডেমিক কার্যক্রমের ওপর।

মেডিকেল কলেজটিতে কোনো ধরনের নিয়োগ বিধিই মানা হয় না বলে অভিযোগ করেন খ্যাতনামা অ্যানেসথেটিস্ট ও নর্দার্ন মেডিকেলের সাবেক প্রফেসর ডা. ফজলুর রহমান। নিয়ম না মানার জন্যই প্রতিষ্ঠানটির এই দুরাবস্থা বলেও মনে করেন তিনি।

নাম গোপন রাখার শর্তে নর্দার্ন মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের একজন ছাত্রী বলেন, বিপুল অংকের টাকা পরিশোধ করে এখানে ভর্তি হয়েছি। অথচ কলেজটিতে শিক্ষার নিম্নমান ও পরিবেশ দেখে ডাক্তার হবার স্বপ্নটাই অপূর্ণ থেকে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে। এখানে কর্তৃপক্ষের কোনো বালাই নেই। অভিযোগ শোনার মতো কেউ নেই। যার যেমন ইচ্ছে, তেমন ভাবেই চালাচ্ছেন। জানিনা, এ মানের পড়াশোনা করে পাস করার পর কি করবো!

এমন নানা অভিযোগ আর হতাশার কথা শোনা গেছে, কলেজের প্রায় সকল বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে।
তবে প্রশাসন এসব ব্যাপারে নির্বিকার। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অংকের (এককালীন প্রায় ১৫ লাখ) অর্থ আদায় করে নিলেও এসব শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন না মানসম্মত ক্লাস, ল্যাব ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা। প্রথম দুটি বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিএমডিসি’র অনুমোদন নিয়ে শেষ হলেও কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালির কারণে ঝুলে আছে পরবর্তী ব্যাচগুলোর অনুমোদন। তারা জানেন না, পাস করে কি করবন।

সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে এই নির্বিকার থাকার কারণও জানা গেছে। মানসম্মত শিক্ষা কাগজে-কলমে, বিজ্ঞাপনে থাকলেও ব্যবসায়িক মনোভাব ও মুনাফাভিত্তিক মানসিকতার জন্যই শিক্ষাঙ্গণটির এ দুরাবস্থা।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো এই হাসপাতাল ও কলেজটির মালিকানা পরিবর্তন হয়। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল এখানকার শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর। মেডিকেল কলেজ মালিকদের শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ মনোভাবের ফলে জিম্মি হয়ে পড়েছেন এখানকার ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকরা।

নর্দার্ন ইন্টারন্যাশন্যাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রথম দু’টি ব্যাচের জন্য বিএমডিসি’র অনুমোদন পেয়েছিলাম। বর্তমান ব্যাচগুলোর অনুমোদনের জন্য চেষ্টা চলছে। তবে বিএমডিসি’র অনুমোদন না থাকলেও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে বলে জানান তিনি।

>