শুক্রবার , ২৩শে এপ্রিল, ২০২১ , ১০ই বৈশাখ, ১৪২৮ , ১০ই রমজান, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > অন্ধকারে ওষুধ নীতিমালা- ৯ মাস ধরে মন্ত্রীর টেবিলে

অন্ধকারে ওষুধ নীতিমালা- ৯ মাস ধরে মন্ত্রীর টেবিলে

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আলোর মুখ দেখছে না প্রস্তাবিত ওষুধ নীতিমালা। সব কাজ ও প্রস্তুতি শেষে এটি এখন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর টেবিলে। প্রজ্ঞাপন জারির অপোয় এখানে আটকে আছে দীর্ঘ নয় মাস
ধরে। মন্ত্রীর সিগন্যাল না পাওয়ায় এটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে বলছেন, ওষুধ শিল্পের সঙ্গে জড়িত একটি স্বার্থান্বেষী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপেই নীতিমালা প্রকাশে এই বিলম্ব।
তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী ঈদের পরেই খসড়াটি অনুমোদনের জন্য একনেক-এ পাঠানো হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএম নিয়াজ উদ্দিন মিয়া বলেছেন, কয়েকটি মন্ত্রণালয় জড়িত এই নীতিমালার সঙ্গে। তাদের মতামত পাওয়ার জন্যই একটু বিলম্ব হয়। সমপ্রতি মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত পাওয়া গেছে। এখন আর কোন বাধা নেই। খুব শিগগিরই নীতিমালা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ হবে। তিনি এই সরকারের আমলেই নীতিমালা জারির ব্যাপারে আশাবাদী।
এর আগে ওষুধ নীতি প্রণয়ন কমিটি খসড়া তৈরি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জমা দেয় গত বছরের মাঝামাঝির দিকে। স্বাস্থ্য সচিবের টেবিলে যায় সেটি সেপ্টেম্বরে। খসড়াটির বিভিন্ন দিক পরীা-নিরীা করতে একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি আইনের বিভিন্ন ধারা ও বানান দেখা শেষে মন্ত্রী প্রফেসর ডা. আ ফ ম রুহুল হকের দপ্তরে পাঠায় নভেম্বরের প্রথম দিকে। কিন্তু মন্ত্রীর টেবিল থেকে আর নড়ছে না নীতিমালাটি।
ওষুধ নীতি প্রণয়ন কমিটির শীর্ষ এক সদস্য জানান, আমার জানা মতে সব ঠিকঠাক। খসড়া প্রণয়ন, সংশোধন, ওষুধ প্রশাসন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনা ও অনুমোদন, পরীা-নিরীাসহ সমস্ত ধাপ পেরিয়ে এটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। বাকি শুধু গেজেট নোটিফিকেশন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যনীতির অংশ হিসেবেই ওষুধ নীতি করার প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারের। আমরা দেড় বছর কষ্ট করে একটা নীতিমালার খসড়া তৈরি করলাম অথচ এখনও সেটি প্রকাশ করা হচ্ছে না। সরকারের আয়ু আছে আর কয়েক মাস। এর মধ্যে যদি এটি প্রকাশ না করে তাহলে এটি অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। গত মে মাসে স্বাস্থ্য সচিব জানিয়েছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের বাইরে। তিনি দেশে ফিরলে সেটি পাঠানো হবে কেবিনেটে। কেবিনেট অনুমোদন করলে পরেই প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ হবে। এজন্য আরও কিছু দিন অপো করতে হবে। কিন্তু মন্ত্রী দেশে ফেরার পরও সেটি তার টেবিলে পড়ে আছে।
ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল ও নকল ওষুধ উৎপাদন বন্ধ ও উৎপদনকারীদের শাস্তি, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও যৌক্তিক ব্যবহার, কাঁচামালের উৎপাদন ও আমদানি সহজ এবং সর্বোপরি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে পুরনো নীতিমালা সংশোধিত করে খসড়া ওষুধ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০১২ সালে ১১ সদস্যের খসড়া প্রণয়ন কমিটি গঠন করে নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করা হয়। বর্তমানে ওষুধ শিল্প চলছে ৩১ বছরের পুরনো নীতিতে। এর আগে সর্বশেষ গত বিএনপি সরকার ২০০৫ সালের ১৮ই এপ্রিল জাতীয় ওষুধ নীতির ঘোষণা দেয়। তবে ওই নীতিমালা নিয়ে শুরু থেকে ছিল নানা সমালোচনা। ওই সময় সরকার বলেছিল, এটি ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতিমালার হালনাগাদ সংস্করণ। কিন্তু ওই সংস্করণটি বিশেষজ্ঞ মহলে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাদের অভিমত ছিল, সরকার নীতিমালার নামে ওষুধ কোম্পানির মালিকদের স্বার্থে একটি ‘শিল্প নীতি’ প্রণয়ন করেছে। ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটি ও মূল্য নির্ধারণী কমিটিতে প্রকৃত বিশেষজ্ঞদের বাদ দিয়ে কোম্পানির মালিক এবং তাদের স্পন্সরদের রাখা হয়েছিল। প্রণয়নে গঠিত কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যই ছিলেন ওষুধ  কোম্পানির মালিক। ফলে তা কোন মহলেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। এসব বিবেচনায় বর্তমান সরকার নতুন নীতিমালা প্রণয়নের পদপে নেয়। সামান্য সময়ের মাথায় আগের নীতিমালার অনুসরণে ২০১২ খসড়া প্রস্তুত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়।
দেশে প্রথম ১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ‘ফার্মেসি অধ্যাদেশ’ জারি করে ফার্মেসি কাউন্সিল গঠন করেন। আর ’৮২ সালের ১২ই জুন এরশাদ ‘ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ’ জারির মাধ্যমে জাতীয় ওষুধ নীতি ঘোষণা করেন। এটি জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে তৈরি করা হয়েছিল। এই ওষুধ নীতিমালা বিশ্বের অনেক দেশেই প্রশংসিত হয়। কারণ, এর মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ইত্যাদি বিষয় এমনভাবে ছিল যা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য জরুরি। চলতি খসড়া নীতিমালাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে। প্রণয়ন কমিটির ওই সদস্য জানান, এই নীতিমালাটি ’৮২-র চেয়েও উন্নত ও সময়োপযোগী। এটি প্রণয়নের েেত্র সবার আগে দেশের স্বার্থ দেখা হয়েছে। তৈরির আগে ওষুধ কোম্পানি, চিকিৎসক, দোকান মালিক, কর্মচারী, ফার্মাসিস্ট, স্টেক হোল্ডার সবার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। ওষুধ আমদানি ও রপ্তানি, মানি ট্রান্সফারের বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। যাতে বিদেশে ওষুধ রপ্তানির পথ আরও প্রশস্ত হয় সেই দিকে খেয়াল রাখা হয়েছে। আরও আছে ওষুধ বিতরণ-বিক্রি- এমনকি মেডিকেল শিার বিষয়টিও নিয়ে আসা হয়েছে। তিনি বলেন, ওষুধ কোম্পানি কোন পরিবেশে ওষুধ উৎপাদন করবে, শ্রমিকের মজুরি কাঠামো কি হবে, তাদের অধিকার কোন উপায়ে নিশ্চিত রাখা হবে সব বিষয়ই সর্বশেষ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে ওষুধের দোকানের লাইসেন্স দেয়ার বিষয়টি যেমন নিয়ন্ত্রণে আসবে তেমনি শৃঙ্খলায় আনা হবে ব্যবহারবিধিও। ওষুধের মান পরীা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ পরীাগার স্থাপন এবং দ টেকনিশিয়ান নিয়োগ, ভেজাল ও নকল ওষুধ উৎপাদনকারীদের শাস্তি, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত বাজার মনিটরিং- সব বিষয়ই আছে এই খসড়া নীতিমালায়।

>