সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > অভিবাসী নারী যৌনকর্মীরা চরম অত্যাচারিত

অভিবাসী নারী যৌনকর্মীরা চরম অত্যাচারিত

শেয়ার করুন

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ উনিশ শতকের মাঝামাঝি । পৃথিবীতে সাম্রাজ্য বাড়াতে মরিয়া ব্রিটেন । এদিকে তাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থাও খুব একটা সুবিধের নয় । ইংল্যান্ডে হু হু করে ঢুকছে আইরিশ অনুপ্রবেশকারী । জার শাসিত রাশিয়া আর পূর্ব ইউরোপ থেকে আসছে ইহুদিরা । বাড়তি জনসংখ্যার জন্য নষ্ট হতে বসেছে রাজধানী লন্ডনের ভারসাম্য । শহরের পূর্ব অংশে হোয়াইট চ্যাপেল এলাকাই ছিল এই উদ্বাস্তুদের মাথা গোঁজার প্রধান জায়গা । পড়ন্ত অর্থনৈতিক অবস্থার জেরে বহু মহিলা বাধ্য হন যৌন পেশায় পা রাখতে । তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিলেন এই বাস্তুহারা অনুপ্রবেশকারীরা । ফলে বাড়তে থাকে দেহ পসারিনীর সংখ্যা । ১৮৮৮-র অক্টোবরে লন্ডনের Metropolitan Police Service বলছে Whitechape এলাকায় মোট ৬২ টি ব্রদেলে কাজ করেন ১২০০ জন যৌনকর্মী ।

ঠিক এই সামাজিক অবস্থায় গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো দেখা দেয় নতুন বিপদ । পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসে এক দুর্র্ধষ নৃশংস খুনির উপদ্রপ । যার নাম হয়ে যায় ঔধপশ ঃযব জরঢ়ঢ়বৎ । আসল নাম? কেউ জানে না । কেউ দেখেনি তাকে কেমন দেখতে । কিন্তু এমনভাবে সে খুন করত তার নামকরণ হয়ে যায় দ্য রিপার । কারণ ধারাল অস্ত্র দিয়ে সে ফালাফালা করে দিত মহিলাদের দেহ ।

কোনও এক অজ্ঞাত কারণে জ্যাক বেছে নিত যৌন কর্মীদের । ১৮৮৮-র ৩ এপ্রিল থেকে ১৮৯১-এর ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্জন্ত ১১ জন মহিলাকে নৃশংসভাবে খুন করা হয় হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় । একসঙ্গে এদের বলা হয় যিরঃবপযধঢ়বষ সঁৎফবৎং । তারমধ্যে ৫ জন দেহ পসারিণীকে খুন করা হুবহু এক কায়দায় । এদের বলা হয় পধহড়হরপধষ ভরাব । গলা এবং তলপেটে গভীর ক্ষত, যৌনাঙ্গ ফালাফালা করে দেওয়া এবং ছিন্ন শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে বিভিন্ন অঙ্গ সরিয়ে ফেলাই ছিল জ্যাকের নিজস্ব স্টাইল । পুলিশি পরিভাষায় মোডাস অপারেন্ডি ।

এই পাঁচ শিকারের মধ্যে প্রথম ছিলেন মেরি অ্যান নিকোল । ১৮৮৮-র ৩১ মে শেষ রাতে তাঁর দেহ মেলে বাকস রো-তে । এখন এই রাস্তার নাম উঁৎধিৎফ ঝঃৎববঃ । মেরির গলা ধারাল অস্ত্র দিয়ে দু টুকরো করা ছিল । পেট এবং তলপেট প্রায় কুচি কুচি করে ফেলা হয়েছিল তীক্ষ্ণ অস্ত্র দিয়ে ।

দু সপ্তাহ পরে খুন হন অ্যানি চ্যাপম্যান । ৮ সেপ্টেম্বর পাওয়া গেল তাঁর নিথর দেহ । হ্যানবেরি স্ট্রিটে । মেরির মতো অ্যানেরও গলা আর তলপেটে ধারাল ছুরির অতল ক্ষত । শরীর থেকে বের করে নেওয়া হয়েছিল ইউটেরাস ।

দিন ২০-২২ পরে একসঙ্গে দুটো খুন । তখনকার বার্নার স্ত্রিট, আজকের হেনরিক স্ট্রিটে পড়েছিল এলিজাবেথ স্ট্রাইড-এর দেহ । ঘাড়ের বাঁদিকে আর্টারির মোক্ষম আঘাত । তাঁরও তলপেটে আছড়ে পড়েছিল একের পর এক শাণিত অস্ত্রের ছোবল ।

এরপর এক নতুন আতঙ্ক । এক ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে পাওয়া গেল মেরি জেন কেলির ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত দেহ । লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে । আগের তিনজনের মতো এই যৌনকর্মীরও গলা আর তলপেট খণ্ডিত । শরীরে নেই ইউটেরাসের অনেকটা আর বাঁদিকের কিডনি ।

এরপর মাসখানেকের নীরবতা । সবাই স্বস্তি পেল । বোধহয় বন্ধ হল খুন । ভুল ভাঙল । আবার শিকার করল জ্যাক দ্য রিপার । এবার তার থাবা এড়াতে পারল না ক্যাথরিন এডোজ । নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে পড়েছিএন তিনি । মিলারস কোর্টে । গলকে চিরে আঘাত চলে গিয়েছিল মেরুদণ্ড অবধি । আক্ষরিক অর্থেই মৃতদেহের পেট ছিল কার্যত ফাঁকা । প্রায় সব অঙ্গই বের করে নিয়ে গিয়েছিল খুনি । ছিল না হৃদপিণ্ড্টাও ।

এই পাঁচজনের পরেও হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় চলতে থাকে হত্যালীলা । বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার হয় যৌনকর্মীদের দেহ; বলা ভাল দেহের টুকরো । অনেক সময় পড়ে থাকত মুণ্ডহীন দেহ । কখনও হাত পা পড়ে থাকত এখানে ওখানে । কিন্তু এদের সঙ্গে রিপার জ্যাকের আদৌ সম্পর্ক আছে কি না জানতে পারেনি পুলিশ ।

নৃশংস এই হত্যালীলার তদন্তে খামতি ছিল না । মেট্রোপলিটন পুলিশের ঈওউ-র বাঘা বাঘা অফিসাররা নেমেছিলেন তদন্তে । জেরা করা হয়েছিল দু হাজরের বেশি জনকে । তদন্তের আতসকাচের তলায় ছিল ৩০০ জনের বেশি । আটক করা হয়েছিল ৮০ জনকে ।

বন্দিদের তালিকায় কে ছিল না! বিশেষ করে আটক করা হয়েছিল কসাই আর ডাক্তারদের । কারন মৃতদেহে আঘাত আর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সরিয়ে নেওয়ার নিপুণ কায়দা দেখে মনে হয়েছিল অ্যানাটমি নিয়ে সম্যক ধারনা আছে খুনির । কিন্তু কোনও লাভ হয়নি । উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে স্বাইকে ছেড়ে দিতে হয়েছে । অধরাই থেকে গেছে আসল অপরাধে; গোটা দুনিয়া যাকে চেনে জ্যাক দ্য রিপারের নামে ।

আশ্চর্যজনক ভাবে; জ্যাক শিকার করত সপ্তাহান্তের রাতে । অনেকের ধারণা কসাই টসাই নয় । সে ছিল কোনও অভিজাত বংশের সম্ভ্রান্ত পুরুষ । কিন্তু হাজারো তত্ত্ব-আলোচনার পরেও স্পষ্ট হয়নি তার পরিবার । মেলেনি তার অস্তিত্ব নিয়ে সামান্যতম হদিশও ।

ইংল্যান্ডের ইতিহাসে জ্যাক দ্য রিপারের মতো কলঙ্কজনক অধ্যায় খুব কমই আছে । আর্থ সামাজিক দিক দিয়েও এর ভূমিকা অসীম । এই ঘটনার হেরে পূর্ব লন্ডনের বস্তিগুলোর দুরবস্থা নিয়ে সোচ্চার হন শহরবাসী । ধীরে ধীরে এ নোংরা ঘিঞ্জি এলাকায় আসে উন্নয়নের আলো । আজ, এই এলাকা ভোল পাল্টে ফেলেছে । তবু বহু অদলবদলের পরেও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে উনিশ শতকের কিছু বাড়ি । আর আছে রিপার জ্যাকের গল্প । রাতের অন্ধকারে ভেসে বেড়ায় হোয়াইট চ্যাপেলের বাতাসে ।

শুধু ইংল্যান্ডে নয় । বিশ্ব জুড়ে আতঙ্ক আর ভয়ের সমার্থক হয়ে যায় জ্যাকের নাম । উপন্যাস, গল্প,কবিতা, , গেমস, গান, নাটক, টি ভি অপেরা সর্বত্র ঘাতক জ্যাকের হাতের ছাপ ।

এই সিরিয়াল খুনির সুবাদে নতুন মাত্রা আনে ক্রাইম রিপোর্টিং-এ । বলা যায়, এই হত্যালীলার খবর প্রকাশ করতে করতে সাবালক হয় ক্রাইম জার্নালিজম । বাদ থাকেনি ইংরেজি শব্দভাণ্ডারও । | Jack the Ripper এর নাম থেকে জন্ম নেয় জরঢ়ঢ়বৎড়ষড়মু, Ripperology, Ripperana, Ripperologist আর Ripper Notes । ক্রমে এরা একে একে জায়গা করে নিত থাকে অভিধানেও ।

ইইঈ-র ঐরংঃড়ৎু পত্রিকায় জ্যাক দ্য রিপার নির্বাচিত হয়েছে ইতিহাসের সবথেকে কুখ্যাত ব্রিটিশ বা ড়িৎংঃ ইৎরঃড়হ হিসেবে । ২০০৬ সালে এই পত্রিকার পাঠকরা এই রায় দেন ।

পৃথিবীর বহু অধরা রহস্যের মধ্যে জ্যাক দ্য রিপার অন্যতম । চিরকাল অন্ধকারেই ঢাকা রয়ে গেছে এর মুখ । জানা যায়নি যৌনকর্মীদের যৌনাঙ্গ ক্ষত বিক্ষত করে কী সুখ পেত এই বিকৃত-কামী?

শুধু রয়ে গেছে তার নাম । অপরাধ, খুন, হত্যা, রক্ত আর অন্ধকারের প্রতীক এবং সমার্থক হয়ে ।

>