সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > অর্থ-বাণিজ্য > “আইন মানেনি গ্রামীণ ব্যাংক”

“আইন মানেনি গ্রামীণ ব্যাংক”

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ গ্রামীণ ব্যাংকে শেয়ার বাড়িয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করছে গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন।

কমিশন মনে করে, শেয়ারের সংখ্যা বাড়ানো, ঋণ দেওয়া, গ্রামীণ অঞ্চল ছাড়িয়ে শহরেও কাজ করা, আওতার বাইরে গিয়ে ব্যবসা করার মতো কাজ গ্রামীণ ব্যাংক আইনানুযায়ী পরিচালনা করেনি। এ কারণেই গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হচ্ছে।

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে, তা স্পষ্ট নয়। কোনো সরকারের আমলেই গ্রামীণ ব্যাংককে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করা হয়নি। এসব কথা উল্লেখ করে প্রয়োজনে নতুন একটি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠনেরও সুপারিশ থাকছে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।

গঠনের ১৪ মাসের মাথায় কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরির কাজ প্রায় শেষ। মাঝখানে গত ফেব্রুয়ারিতে একই কমিশন অন্তর্র্বতীকালীন একটি প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিল। এক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে কমিশনকে ২০ জুলাই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও কমিশন তা জমা দিতে পারেনি।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রোববার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের পর প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংক ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে করা গ্রামীণ কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো হাতে পাইনি। তবে ঈদের আগে পেয়ে যাব বলে আশা করছি।’

২০১২ সালের ১২ মে সাবেক সচিব মামুন উর রশীদকে চেয়ারম্যান করে গ্রামীণ ব্যাংক কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের সদস্য আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি ও হিসাববিদ মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ।

প্রতিবেদন জমা না দিলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনই কার্যালয় গুটিয়ে নিয়েছে কমিশন। গত শনিবার প্রথম আলোকে এ তথ্য জানান সমাপ্ত কমিশনের সদস্য আজমালুল হোসেন। তিনি বলেন, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ছিল গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার দর্শন। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক সেই দর্শন থেকে সরে এসেছে।

কমিশনের পর্যবেক্ষণ: কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের পর্যবেক্ষণে এসেছে যে বর্তমানে গ্রামীণ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা আছেন নামকাওয়াস্তে। পূর্ণ অধিকার তাঁরা পান না। ভুলবশত বা বেআইনিভাবে তাঁরা শেয়ারহোল্ডার, কিন্তু তাঁদের স্বীকৃতি নেই। সেই স্বীকৃতি এখন দিতে হবে।

গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ও পরিশোধিত মূলধনের সঙ্গে শেয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি আইনানুযায়ী হয়নি বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে। কমিশনের মতে, গ্রামীণ ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ছিল সাত কোটি ২০ লাখ টাকা। ৭৫ শতাংশ শেয়ারহোল্ডার হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের থাকার কথা পাঁচ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সদস্যদের নামে ৮৩ লাখ শেয়ার দিয়ে ফেলেছে, যা আইনসম্মত হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ থাকবে, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় থেকে সব ধরনের সরকার মিলে আটটি সরকার এসেছে দেশে। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক কে, তা স্পষ্ট নয়। কোনো আমলেই গ্রামীণ ব্যাংককে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করা হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক বা যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের কার্যালয় (রেজসকো)—কেউই যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি।

গ্রামীণ ব্যাংকের ‘সদস্য’ বলতে কী বোঝায়, তা বর্তমান আইনে স্পষ্ট নয়। সদস্যের সংজ্ঞা দেওয়া হবে নতুন করে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তাঁদের অধিকারের কথাও উল্লেখ থাকবে। ভোটার হিসেবে পরিচালক নির্বাচন করা ছাড়া সদস্যরা বর্তমানে আর কোনো অধিকার ভোগ করেন না। তাঁরা মুনাফা পাবেন কি না, তা-ও স্পষ্ট নয় বর্তমান আইনে। কমিশন এর স্পষ্টতা চায়।

আওতার বাইরে গিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক ব্যবসা করছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণে এসেছে, জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া গ্রামীণ ব্যাংকের মূল ব্যবসা। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়েছে। সীমার বাইরে গিয়ে ব্যবসা করতে অন্যদের অর্থ দিয়েছে, যা বেআইনি।

গ্রামীণ পরিবারের অংশ হিসেবে কিছু প্রতিষ্ঠান গঠিত হলেও কমিশন এগুলোকে আলাদা ব্যবসা হিসেবে খুঁজে পেয়েছে, যেগুলোর সম্পর্কে গ্রামীণ ব্যাংকের কোনো সম্পর্ক নেই। গ্রামীণফোন নিয়েও কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ থাকছে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।

সুপারিশ: বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সুপারিশ করা হচ্ছে বলে জানান আজমালুল হোসেন। তিনি বলেন, আইনের বাইরে কাজ করা যাবে না—এ হলো কমিশনের বক্তব্য। সে কারণে গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো দরকার। যেভাবেই হোক না কেন, সদস্য যেহেতু হয়ে গেছে অনেক, তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ থাকবে কমিশনের প্রতিবেদনে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কয়েকটি বিকল্পের কথা বলা থাকবে বলে জানিয়ে আজমালুল হোসেন বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংক, রেজসকো, এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো, সমবায় অধিদপ্তর নাকি ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (এমআরএ) আওতায় আনা যায়, সেই সুপারিশ থাকবে। এমনও হতে পারে যে শুধু গ্রামীণ ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণের জন্যই আলাদা কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন করতে পারে।’

সদস্যদের মুনাফা দেওয়ার বিষয়ে আজমালুল হোসেন বলেন, ‘একটা জায়গায় লেখা আছে, মুনাফা কীভাবে দেওয়া হবে, তা পরিচালকেরা ঠিক করবেন। বিষয়টি ঠিক না বেঠিক জানি না, তবে বিতর্কযোগ্য।’

গ্রামীণ ব্যাংকের নিরীক্ষা বিষয়ে আজমালুল হোসেন বলেন, ‘তাজ্জবের ব্যাপার যে এত কিছু হয়েছে, কিন্তু কোনো নিরীক্ষায় তা ধরা পড়েনি।’ গ্রামীণফোন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গ্রামীণফোন স্থাপিত হয় গ্রামীণ ব্যাংকের সাহায্যে। তাই গ্রামীণ ব্যাংক তার মুনাফার ভাগ পেতে পারে কি না, দেখার চেষ্টা করেছি।’

ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক: ড. মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনে তাঁর যে মতামত দেন, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ থাকবে বলে জানান আজমালুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ড. ইউনূসের কাছে জানতে চেয়েছি, গ্রামীণ ব্যাংকের স্বার্থে কী করা যায়। ইউনূস বলেন, যত দিন দারিদ্র্য দূরীকরণ হবে না, তত দিন পৃথিবীতে শান্তি আসবে না। অবশ্যই এটা ঠিক। আমরা তাঁকে বলেছি, গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষতি করা আমাদের কাজ নয়। উনি বলেন, কীভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের ভালো করা যায়, সেই চিন্তা থাকলে সবাই আপনাদের মনে রাখবে।’ প্রতিবেদনে এ কথাগুলো থাকবে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মতো গ্রামীণ ব্যাংককে ১৯ টুকরা করে পরিচালনার সুপারিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে থাকছে। কমিশনের চেয়ারম্যান মামুন উর রশীদ একসময় পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) কাজ করেছিলেন। ওই জায়গা থেকেই তিনি গ্রামীণ ব্যাংককে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মতো পরিচালনার ধারণাটি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

ব্যক্তিগত কাজে কমিশনের চেয়ারম্যান দেশের বাইরে রয়েছেন বলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্য একটি সূত্র জানায়, কমিশনের তিনজন সদস্য আলাদা আলাদা দায়িত্ব নিয়েছেন, যা গতকাল শেষ করতে পারেননি তাঁরা। ওই কারণেই প্রতিবেদন দাখিল হতে দেরি হচ্ছে।

>