সোমবার , ২৩শে নভেম্বর, ২০২০ , ৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ৭ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > আজ বিশ্ব বাঘ দিবস- সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্বিত্ব হুমকির মুখে

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস- সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্বিত্ব হুমকির মুখে

শেয়ার করুন

খুলনা প্রতিনিধি ॥ আজ বিশ্ব বাঘ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব বাঘ দিবস-২০১৩’। দিবসটি উপলক্ষে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভায় আয়োজন করেছে। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বাঘ বাঁচান, মায়ের মতো সুন্দরবন রক্ষা করুন’।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সকাল ৯টায় খুলনা সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য পদযাত্রা শুরু হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে শেষ হবে। সাড়ে ৯টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিশ্ব বাঘ দিবস-২০১৩-এর প্রতিপাদ্য বিষয়ের ওপর আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল জলিল প্রধান অতিথি থাকবেন।

এদিকে দিবসটি সামনে রেখে আবারও সুন্দর বনে বাঘের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিশ্বের সেরা ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্বিত্ব হুমকির সম্মুখিন। বিগত ১ যুগে ৩৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যার শিকার হয়েছে। বিশ্বখ্যাত সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুরক্ষায় বনবিভাগ কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেনা। সংঘবদ্ধ বাঘ শিকারিদের লোভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গণপিটুনি ও গুপ্ত হত্যায় একের পর এক বাঘ মারা যাচ্ছে।

সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের সূত্রমতে, গত ১ যুগে সুন্দরবনসহ বিভিন্ন লোকালয়ে ৩৫টির অধিক বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ সংঘবদ্ধ বাঘ শিকারি, বনদস্যু ও লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় বাঘ হত্যার শিকার হয়েছে। পাশাপাশি বাঘের খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে বাঘ ঢুকে পড়ছে লোকালয়ে। বন বিভাগের নিরাপত্তা বিভাগের জনবল সংকট ও সরঞ্জামের অভাবে মূল্যবান এ বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে পারছেনা।

সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় এবং বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত বাঘের মৃত্যু হয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব ২টি বিভাগের ৪টি রেঞ্জ পশ্চিমে খুলনা ও সাতক্ষীরা, পূর্বে শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে বন থেকে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে। গত ১ যুগে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে ২৪টি ও পূর্ব বিভাগে ১২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি ১৪টি বাঘ গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা গেছে।

বন বিভাগ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ২৬ মার্চ শ্যামনগরের দাতনিখালী গ্রামে একটি বাঘ ঢুকে পড়লে এলাকাকাসী বাঘটিকে গুলি করে হত্যা করে। এর একদিন পরে একই এলাকায় গ্রামবাসী আবারও একটি বাঘ গণপিটুনিতে হত্যা করে। ২০০৮ সালের ২০ জুন সন্ধ্যায় শ্যামনগরের দক্ষিণ কদমতলা গ্রামে একটি বাঘ প্রবেশ করে। এ সময় বাঘের আক্রমণে এক গৃহবধূসহ ৩ জনের মৃত্যু হয় ও ২ জন আহত হয়। এ ঘটনার পরের দিন ২১ জুন এলাকাবাসী বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে। ২০০৯ সালের ২ জুন সুন্দরবনের চুনা নদী পার হয়ে শ্যামনগরের খলিশাবুনিয়া গ্রামের কালীবাড়ী নামক স্থানে একটি বাঘ ঢুকে পড়ে। এ সময়ে বাঘের অক্রমণে ৩ গ্রামবাসী আহত হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ১০ ঘন্টা পর বাঘটিকে আটক করে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। ২০১০ সালে ২২ জানুয়ারি রাতে সুন্দরবন থেকে চুনা নদী পার হয়ে বাঘটি লোকালয়ে প্রবেশ করে। নদী থেকে ৫ কিলোমিটার ভেতরে আবাদ চণ্ডিপুর গ্রামে খোরশেদ আলীর রান্নাঘরের চালের ওপর অবস্থান নেয়। এ সময় গ্রামবাসী বাঘটিকে ঘেরাও করে বনবিভাগ ও পুলিশকে খবর দেয়। কিন্তু ১২ ঘন্টা পার হলেও বনবিভাগ বাঘটিকে আটক করে বনে ছেড়ে দেওয়ার ব্যবস্থা না করায় গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। ২০১০ সালের মে মাসে চণ্ডিপুর গ্রামে লোকালয়ে আবারও একটি বাঘ প্রবেশ করলে সেটিও গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করে। ২০১১ সালের ২৫ মার্চ শ্যামনগরের ভোলাখালী গ্রামে জনগণের পিটুনিতে ১টি বাঘের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ সপ্তাহ খানেক আগে গত ২১ জুলাই কৈখালী এলাকায় একটি বাঘ মৃত অবস্থায় ভাসমান দেখতে পায় এলাকাবাসী।

সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের খুলনা রেঞ্জে ৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। ২০০৩ সালের ২২ মার্চ কয়রার জোড়শিং গ্রামে ১টি বাঘ গণপিটুনিতে মারা যায়। ২০০৫ সালের ২৮ নভেম্বর বানিয়াখালী নামক স্থান থেকে বন বিভাগ মৃত বাঘ উদ্ধার করে। ২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বর চাংমারীতে একটি মৃত বাঘ উদ্ধার করা হয়। একই বছর ১০ নভেম্বর সুন্দরবন অভ্যন্তরে ভোমরখালী এলাকায় একটি মৃত বাঘ উদ্ধার করে বন বিভাগ। এবছর ১৯ নভেম্বর দাকোপের নলিয়ান গ্রামে ১টি বাঘ ঢুকে পড়লে গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে বাঘটির মৃত্যু হয়। ২০১০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কয়রা উপজেলার জোড়শিং গ্রামে ১টি বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়লে বাঘটিকে গ্রামের জনগণ পিটিয়ে হত্যা করে।

সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত ১ যুগে ১২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শরণখোলায় ৬টি ও চাঁদপাইতে ৬টি। ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর চাঁদপাই গ্রামে গণপিটুনিতে একটি বাঘ মারা যায়। ২০০২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ডাকাতের গুলিতে একটি বাঘ মারা যায়। ২০০৩ সালের ২৮ মে ধানসাগর নামক স্থানে গ্রামবাসীর গণপিটুনিতে একটি বাঘ মারা যায়। ২০০৪ সালের ২৫ আগস্ট চরদোয়ানি কাঁঠালতলি থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়। ২০০৭ সালের ২ মে হাড়বাড়িয়া পুকুর পাড়ে ১টি মৃত বাঘ উদ্ধার করা হয়। ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর শরণখোলা কচিখালীতে একটি বাঘের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৩ সালের ১৯ অক্টোবর চালতিবুনিয়া গ্রামে ১টি বাঘ ও ২ ডিসেম্বর আমুবিনা গ্রামে ১টি বাঘকে গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করে। ২০০৫ সালের ২৬ অক্টোবর বলেশ্বর নদীর তীরে ১টি বাঘের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর শরণখোলার সোনাবাড়ীয়া থেকে ১টি বাঘের চামড়া উদ্ধার করা হয়।

গত ১০ বছরে সরকারি হিসেবে গণপিটুনিতে সুন্দরবনের ২০টি বাঘ মারা গেছে। পরিবেশবীদদের মতে মৃত বাঘের সংখ্যা ৩০টির কম নয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মতে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে সুন্দরবনের ১২০টি বাঘ মারা গেছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায় ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে ৫৩টি বাঘ হত্যার শিকার হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান’র বিভাগীয় প্রধান ডঃ দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, আইলা ও সিডরের আঘাতে সুন্দরবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। যে কারণে হিংস্র বাঘগুলো খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং গ্রামবাসীর গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। নাম না প্রকাশের শর্তে বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বাঘ সুরক্ষায় সুন্দরবনে ২টি ট্যাংকুলাইজার গান রয়েছে। তবে গান দুটি ব্যবহারের দক্ষ কোন লোক নেই। তেমনি নেই পর্যাপ্ত পরিমাণ চেতনানাশক ওষুধ। সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে প্রবেশ করা এসব বাঘগুলো সুন্দরবনে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হত, যদি ট্যাংকুলাইজার গানের গুলি ব্যবহার করা যেত। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনে দুর্যোগ, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাঘ হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে উঠেছে। বনের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। যে কারণে খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ গণপিটুনিতে বেশি মারা পড়ছে। পরিবেশবীদদের মতে, এভাবে বাঘ নিধন হতে থাকলে আগামী ২০২০ সাল নাগাদ সুন্দরবন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্বিস্ত বিলীন হওয়ার আশংকা রয়েছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও প্রকৃতি বিভাগের ডি,এফ,ও আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত বলেন, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার মানুষের বন্যপ্রাণী নিধন না করার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।

>