সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > আরও ৫৫ ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য বরখাস্ত

আরও ৫৫ ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য বরখাস্ত

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইউনিয়ন পরিষদের ৫৫ জন চেয়ারম্যান ও সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তের আদেশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে তাঁদের দায়িত্ব হস্তান্তর করতে বলা হয়েছে। এঁদের বেশির ভাগই বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-সমর্থক।

এর আগে গত জুনে একই অভিযোগে আরও ৩১ জন ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ নিয়ে মোট ৮৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

গতকাল সোমবার স্থানীয় সরকার বিভাগের ইউনিয়ন পরিষদ শাখা থেকে বরখাস্ত-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের আদেশে সই করেন। তিনি চিঠি পাঠানোর কথা নিশ্চিত করেছেন। ৮৬ জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে দ্রুত বিচার আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন ধারায় ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে বরখাস্তের আদেশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে প্যানেল চেয়ারম্যানের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর গত মার্চে জামায়াত-শিবির দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালায়। রাজশাহী, ঝিনাইদহ, সাতীরা, মানিকগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, পিরোজপুর, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, যশোর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলা হয়। কোথাও কোথাও বিএনপি ও জাতীয় পার্টিও হামলায় অংশ নেয় বলে অভিযোগ আছে।

জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারসচিব আবু আলম মো. শহিদ খান বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ের তদন্তে ওই তাণ্ডবে জনপ্রতিনিধিদের প্রত্য ও পরোভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ জন্যই তাঁদের বরখাস্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব হচ্ছে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রেখে এলাকার মানুষের জানমাল রা করা। কিন্তু কিছু জনপ্রতিনিধি তা না করে হামলাকারীদের উসকে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে যেন তাঁরা দায়িত্বের প্রতি অবিচল থাকেন, সে জন্যই মদদদাতাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করা হয়েছে। এই ৫৫ জন চার জেলার ১০ উপজেলার জনপ্রতিনিধি। তাঁরা হলেন ঝিনাইদহের ৩২ জন, সাতীরার ২১, রাজশাহীর এক ও মানিকগঞ্জের একজন জনপ্রতিনিধি।

ঝিনাইদহের বরখাস্ত হওয়া প্রতিনিধিরা হলেন: আলীনুর রহমান, আকবর হুসাইন, আজগর আলী, কবির, আ. রাজ্জাক, বাবুল হোসেন, শরিফুর রহমান, জনাব শফি, শাহ আলম, আবুল কালাম, জুলফিক্কার আলী, ছাদিকুর রহমান, আবদুল আলী, আজিজুর রহমান, ফকির আহম্মদ, শাহিনুর রহমান, আকতারুজ্জামান, ওহেদ আলী, আকতার আলী, শাহ আলম, নাসির উদ্দিন, এ কে এম আনারুল ইসলাম, জাকির হোসেন, রফিকুল ইসলাম, চাঁদ মিয়া, মো. আবদুল গনি, হায়দার আলী, জহির উদ্দিন, আক্তারুজ্জামান, নাসিরউদ্দিন, হাফিজুর রহমান, সাইফুল ইসলাম।

সাতীরার আনোয়ারুল ইসলাম, শহীদ হাসান, হাবিবুর রহমান, আবদুল আলিম, আবদুল মজিদ বিশ্বাস, খলিলুর রহমান, শেখ আমজাদ হোসেন, আবদুস সামাদ, শেখ মনিরুজ্জামান, ইসমাইল হোসেন, শহীদুল ইসলাম, আবদুল কাদের, রফিকুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, জামিরুল আলম, আনোয়ার হোসেন, মিজানুর রহমান, আবদুল খালেক তরফদার, ময়নুদ্দিন, আবু তাহের। অপর দুজন হলেন রাজশাহীর আবুল কালাম আজাদ ও মানিকগঞ্জের মাহবুব রহমান।

এসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট, পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে হামলা, বাজারের দোকানপাট ভাঙচুর, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।

এসব জনপ্রতিনিধির কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা বলেন, সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না। তবে এ রকম সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে বুঝতে হবে রাজনৈতিক কারণেই তা করা হয়েছে। কারণ, তাঁদের অপরাধ, তাঁরা বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

ঝিনাইদহে জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত নয়জন ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৩২ জন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ দেওয়ার পর ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর ও মহেশপুরসহ অন্যান্য উপজেলায় জামায়াতের তাণ্ডব শুরু হয়। স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী জামায়াত ওই দিন শহরে বিােভ মিছিল ও ব্যাপক ভাঙচুর করে। মহেশপুর শহরে বেশ কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করে। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্য ভেঙে ফেলে। পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে জামায়াত-সমর্থকদের হামলায় গুরুতর আহত হন মহেশপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবুল কালাম আজাদ।

একইভাবে কোটচাঁদপুর উপজেলায় পুলিশের ওপর হামলা চালায় জামায়াত। এই হামলার ঘটনায় কোটচাঁদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) ১২ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। পুলিশের পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র ছিনতাই করে জামায়াত। এখানেও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের উসকে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক জনপ্রতিনিধির নামে এসব ঘটনায় মামলাও রয়েছে।

জানতে চাইলে ঝিনাইদহের কাজীরবেড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জামায়াতের জেলা সূরা সদস্য মাওলানা আবদুল আলী বলেন, ‘তাঁদের কেন বরখাস্ত করা হয়েছে, তা তাঁরা জানেন না।’ একইভাবে স্বরূপপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী জানান, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা পর্যন্ত হয়নি, অথচ বহিস্কার করা হচ্ছে।

কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বলেন, তিনি সক্রিয় রাজনীতি করেন না। দলকে সমর্থন করেন, এটাই তাঁর অপরাধ।

সাতীরা সদরের শিবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, তিনি উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি বলেই তাঁকে বরখাস্ত করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। একই জেলার লাবসার চেয়ারম্যান আবদুল আলিম বলেন, তিনি সদর উপজেলার বিএনপির সভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলার একটি হামলা করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে তিনি দোষী নন বলা হলেও কেন বরখাস্ত করা হয়েছে তিনি তা জানেন না। আগরদাড়ীর ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, তিনি বিএনপিকে সমর্থন করেন বলেই তাঁর বিরুদ্ধে হয়তো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার হড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জামায়াত সমর্থক আবুল কালাম আজাদকে গত ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৩ মার্চ নগরের রাজপাড়া থানায় দায়ের করা পুলিশের ওপর হামলা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। এরপর চার মাস ১০ দিন হাজত বাসের পর তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে তাঁর নামে নয়টি মামলা হয়েছে।

আবুল কালাম আজাদ বলেন, তিনি জামায়াতের সমর্থক, কোনো পদে নেই। তিনি বলেন, শত্রুতামূলকভাবে তাঁর নামে মামলা দেওয়া হয়েছে।

মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের ইউপি চেয়ারম্যান দেওয়ান মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তা ছাড়া চেয়ারম্যান পদ থেকে বহিস্কারাদেশের কোনো কাগজপত্র পাইনি। সহিংসতার ঘটনায় আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যদি কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কাজ করেন, তাহলে অবশ্যই তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে একসঙ্গে এত জনপ্রতিনধিকে বরখাস্ত করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। কেননা, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের অধিকার সবার রয়ে়ছে, তা কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব নয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন বলেই আমার মনে হচ্ছে।’

>