শনিবার , ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১২ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > অর্থ-বাণিজ্য > ইলিশ রায় ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের অভিযান

ইলিশ রায় ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের অভিযান

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ইলিশ রায় সরকারের জাটকা নিধন বন্ধের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। এখন অবাধে চলছে জাটকা নিধন। ফলে ভরা মৌসুমেও মির্জাগঞ্জের পায়রা নদীসহ অন্যান্য নদীতে জাল ফেলে ইলিশ পাচ্ছে না জেলেরা। বিস্তারিত খবর পাঠিয়েছেন প্রতিনিধিরা :
বাগেরহাট : রুপালি ইলিশ রা ও জাটকা নিধন বন্ধে বছরের তিন মাস ভিজিডি কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক জেলে পরিবারকে দেয়া হচ্ছে ৩০ কেজি করে চাল। এজন্য সরকারকে প্রতি বছর গচ্চা দিতে হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মত্স্য বিভাগ, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডকে। উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে টাস্কফোর্স কমিটি। এসব বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা না থাকার সুযোগে একশ্রেণীর জেলে অবাধে জাটকা নিধন করে চলেছে। বাগেরহাটের শরণখোলাসহ উপকূলীয় এলাকার হাট-বাজার ও মত্স্য আড়তগুলোতে জাটকা ইলিশে সয়লাব হয়ে গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসনের চোখের সামনেই প্রতিদিন এ অঞ্চলে হাজার হাজার মণ জাটকা কেনাবেচা হচ্ছে। উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর অভিযান না থাকায় ভেস্তে যেতে বসেছে সরকারের এ উদ্যোগ।
মত্স্য বিভাগ জানায়, নভেম্বর থেকে মে—এই ছয় মাস জাটকা আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। নিষিদ্ধ সময়ের মধ্য থেকে তিন মাস ইলিশ আহরণে নিয়োজিত উপকূলীয় এসব বেকার জেলে পরিবারকে ৩০ কেজি করে খাদ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। শরণখোলা উপজেলার ২ হাজার ২৮৫টি জেলে পরিবার ভোগ করছে সরকারের দেয়া এই সুবিধা। কিন্তু জাটকা নিধন বন্ধ হচ্ছে না। এছাড়া জাটকা মৌসুমের পরে বছরের বাকি সময়টায় জাটকা ধরা জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধেও কোনো অভিযান চালানো হচ্ছে না।
জানা গেছে, শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা, তাফালবাড়ী, আমড়াগাছিয়া, রাজাপুর, খোন্তাকাটাসহ এ অঞ্চলের হাট-বাজারগুলোতে প্রতিদিন হাজার মণেরও বেশি জাটকা ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে উপজেলা সদর রায়েন্দা বাজারের পূর্ব মাথা মাছ বাজার, পশ্চিম মাথা মাছ বাজার ও পাঁচরাস্তা মাছ বাজারে প্রশাসনের চোখের সামনে প্রকাশ্যে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ২-৩শ’ মণ জাটকা বিক্রি হয়। এছাড়া এসব বাজারের ডিপো মালিকরা জাটকা কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চালান করছেন। ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে বলেশ্বর নদ ও বঙ্গোপসাগর থেকে এসব জাটকা আহরণ করা হচ্ছে। একইভাবে বরগুনার পাথরঘাটা, মহিপুর, চরদুয়ানী, জ্ঞানপাড়া, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, তুষখালী, মাছুয়া, জিয়ানগর এবং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলাসহ উপকূলীয় হাট-বাজার ও মত্স্য আড়তে অবাধে জাটকা বিক্রি হচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। রায়েন্দা বাজারের মাছ বিক্রেতা আউয়াল ফরাজী, কালাম ফরাজী, আবদুল হালিমসহ অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, নদীতে যারা ছোট ফাঁসের জাল দিয়ে জাটকা ধরে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। আগে জাটকা ধরা বন্ধ করতে হবে, তাহলে বিক্রিও বন্ধ হয়ে যাবে।
গতবার কোস্টগার্ডের শরণখোলা কন্টিনজেন্ট কমান্ডার আনিসুর রহমান থাকাকালে জাটকা ও জালের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে চলতি বছর একটি অভিযানও পরিচালনা করা হয়নি। এদিকে শরণখোলা উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা মো. ফেরদৌস আনসারী জানান, জাটকা রায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) : ইলিশের ভরা মৌসুমেও মির্জাগঞ্জের পায়রা নদীতে ইলিশের আকাল চলছে। দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও কাঙ্তি ইলিশ পাচ্ছে না জেলেরা। যে পরিমাণ ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে তাতে সংসার চালানোই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। উপরন্তু তাদের ঋণ পরিশোধ হচ্ছে না। এ অবস্থায় অনেক জেলে ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এবং ধারদেনা করছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি মাছ ধরার নৌকা ঘাটে বাঁধা রয়েছে। ভরা মৌসুমেও পায়রা নদীতে দেখা যাচ্ছে না রুপালি ইলিশের। তাই জেলেরা অলস সময় পার করছেন।
এদিকে জেলেরা চড়া সুদে মহাজন ও এনজিওর কাছ থেকে টাকা ধার আনে নদীতে মাছ পেয়ে বিক্রি করে পরিশোধ করতে পারার আশায়। কিন্তু নদীতে মাছ না পেয়ে শূন্যহাতে বাড়ি ফিরছে তারা। ঋণের টাকা পরিশোধ করবে, না অভাব-অনটন গোছাবেন—এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
এক জেলে বলেন, জেলে পরিবারকে সরকারিভাবে যে সাহায্য দেয়া হয় তা পরিবারের সদস্যদের চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। আর এ সমস্যার কারণে অনেক জেলেই মাছ ধরা বাদ দিয়ে অন্য কাজ করার চেষ্টা করছে। উপজেলা মত্স্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ উপজেলায় প্রায় ৩ হাজার জেলে পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে ৯০০ পরিবারকে ফেব্রুয়ারি-মে মাস পর্যন্ত মাথাপিছু ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হলেও বাকি পরিবারগুলো কিছুই পাচ্ছে না। ভরা মৌসুমে নদীতে ইলিশ না পাওয়ায় জেলেপল্লীর পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। বাংলাদেশ ুদ্র মত্স্য জেলে সমিতির উপজেলা সহ-সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর মৃধা বলেন, চলতি মাসে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে বলেই একে ইলিশের ভরা মৌসুম বলা হয়। কিন্তু এই ভরা মৌসুমে নদীতে মাছ ধরা না পড়ায় এখানে যারা নিয়মিত মাছ বিক্রি করত, তারাও এখন আর এখানে আসে না। জেলেরা অর্থসংকটে পড়েছে। তবে তারা মনে করছেন, বৃষ্টির পরিমাণ বাড়লে ইলিশের পরিমাণ বাড়বে। কারণ বৃষ্টির পানিতে নদীর পানিতে লবণের পরিমাণ কমে যায়। তখন মিষ্টিপানির স্রোতে ডিম ছাড়তে আসে ইলিশ। উপজেলা সহকারী মত্স্য কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম বলেন, নদীতে ইলিশ কম পাওয়ায় জেলেদের দুর্দিন চলছে। তিগ্রস্ত জেলেদের পুনর্বাসনে সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে প্রতি বছর। তবে এ সাহায্য পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে নদীতে পূর্ণিমার প্রভাবে জোয়ারের পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে তিন-চারদিনের মধ্যে জেলেদের জালে ইলিশ ধরা পড়বে।

>