সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > অর্থ-বাণিজ্য > ওয়াটার বাস নিয়ে বিপাকে বিআইডব্লিউটিসি

ওয়াটার বাস নিয়ে বিপাকে বিআইডব্লিউটিসি

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথে পরিচালনার জন্য গত ৪ জুলাই আবার চালু হয়েছে ওয়াটার বাস। নিম্নমানের সেবায় যাত্রী টানতে ব্যর্থ হওয়ায় আগেরবার ১১ মাসেই বন্ধ হয় এ সেবা। এবারো বাংলাদেশ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চার ওয়াটার বাসে দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা।
ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শব্দে অতিষ্ঠ হচ্ছেন এসব ওয়াটার বাসের যাত্রী। এগুলোর চলার গতিও কম। তাছাড়া এগুলো সময়মতো চলাচল করছে না। ফলে সপ্তাহ না পেরোতেই নতুন চার ওয়াটার বাসের সেবার মান নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছেন যাত্রীরা। আর আশানুরূপ যাত্রী না পাওয়ায় সেবাটি চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সন্দেহে রয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।
জানা গেছে, প্রতিটি ওয়াটার বাস তৈরিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। এগুলো নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ইউচাই চায়না কোম্পানি লিমিটেডের অত্যন্ত নিম্নমানের ইঞ্জিন। এতে চলার সময় ইঞ্জিনগুলোয় প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে। ইঞ্জিনের গতিও তুলনামূলক কম। ফলে ৪০ মিনিটে গাবতলী থেকে সদরঘাট পৌঁছার কথা থাকলেও সময় লাগছে প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া কোনো ওয়ারেন্টি না থাকায় ইঞ্জিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিক্রয়োত্তর সেবাও পাবে না বিআইডব্লিউটিসি।
প্রসঙ্গে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মজিবর রহমান বলেন, ‘ওয়ারেন্টিযুক্ত ইউরোপীয় একেকটি ইঞ্জিনের দাম ৭০-৮০ লাখ টাকা। আর আমাদের একেকটি ওয়াটার বাস তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। ফলে দাম কম হওয়ায় এক্ষেত্রে কিছু সমস্যা থাকবেই। পরীক্ষামূলক পরিচালনার সময়ই ওয়াটার বাসগুলোয় কিছু সমস্যা ধরা পড়ে। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া অতিরিক্ত শব্দ কমিয়ে আনতে ইঞ্জিনে তেল ও ঘষা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ডকইয়ার্ড এ বিষয়ে চেষ্টা করছে।’
তবে তেল বা ঘষা দিয়ে ইঞ্জিনের অতিরিক্ত শব্দ কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্র্র প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. এহসান। তিনি বলেন, সাধারণত ইঞ্জিনে কারিগরি ত্রুটি থাকলে এ ধরনের শব্দ হয়। এছাড়া নিম্নমানের ইঞ্জিনেও অত্যধিক শব্দ হতে পারে। এক্ষেত্রে ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন করতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া উচিত।
গত ১০ ও ১১ এপ্রিল ওয়াটার বাসে ভ্রমণ করে দেখা গেছে, গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ওয়াটার বাস চলার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এটা গাবতলী থেকে বাবুবাজার (বাদামতলী ঘাট) পর্যন্ত চলাচল করছে। এক্ষেত্রে সময় লাগছে ১ ঘণ্টা ১০-২০ মিনিট। তবে উদ্বোধনের আগে গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ৪০ মিনিটে যাতায়াত করা যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল বিআইডব্লিউটিসি।
এছাড়া সময়মতো চলছে না ওয়াটার বাস। প্রতিদিন সকাল ৮টায় শুরু করে ৪৫ মিনিট পর পর সদরঘাট ও গাবতলী থেকে ওয়াটার বাস ছাড়ার কথা থাকলেও প্রথম দিন থেকেই তা মানা হচ্ছে না। কখনো ১ ঘণ্টা, কখনো দেড় ঘণ্টা পর ছাড়ছে ওয়াটার বাস। এ অবস্থায় এবারো যাত্রী টানতে পারছে না ওয়াটার বাস। নতুন চার বাসে ৮১টি আসন থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অর্ধেক আসন খালি থাকছে।
এদিকে ওয়াটার বাসের ইঞ্জিনের ব্যাক গিয়ারে সমস্যা রয়েছে বলে জানান ওয়াটার বাস-৪-এর চালক মো. আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, ব্যাক গিয়ার খুব কম কাজ করে। ফলে ওয়াটার বাস পেছনে নেয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়া ইঞ্জিনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ ও টুলবক্স সরবরাহ করেনি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।
ওয়াটার বাস প্রকল্পের পরিচালক ও চিফ মেরিন কনস্ট্রাকশন খন্দকার এ মান্নান বলেন, সস্তায় ইঞ্জিন কেনায় নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এগুলো সমাধানেরও চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। তবে পরবর্তী সময়ে আরো চারটি ওয়াটার বাস তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বিআইডব্লিউটিসির। তখন বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হবে।
ওয়াটার বাসে এখনো চালু হয়নি টিকিট ব্যবস্থা। ফলে ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কর্মীদের নিয়মিতই বচসা হয়। এছাড়া ভাড়ার অর্থও নিয়মিত জমা পড়ছে না বিআইডব্লিউটিসির তহবিলে। গত ১১ জুন সাড়ে ১২টার ট্রিপে ৩৭ জন যাত্রী বাদামতলী থেকে গাবতলী যাতায়াত করেন। কিন্তু বিআইডব্লিউটিসির তহবিলে ২৯ জনের ভাড়া জমা করা হয়। প্রতি ট্রিপেই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মজিবর রহমান বলেন, দ্রুত উদ্বোধনের লক্ষ্যে টিকিট ছাড়াই ওয়াটার বাস চালু করা হয়েছে। এখন টিকিট ছাপানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া টিকিটের অর্থ আত্মসাৎ প্রতিরোধে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। শিগগিরই সমস্যাগুলো সমাধান করা যাবে।
আশানুরূপ যাত্রী না পাওয়ায় ওয়াটার বাসের রুটের দৈর্ঘ্য কমিয়ে সদরঘাট থেকে আশুলিয়ার পরিবর্তে গাবতলী পর্যন্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্টপেজ রাখা হয়েছে পাঁচটি। বাদামতলী থেকে গাবতলী পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ টাকা। আর এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটের ন্যূনতম ভাড়া ধরা হয়েছে ১০ টাকা।

>