সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > ক্লাস চলছে খোলা আকাশের নীচে

ক্লাস চলছে খোলা আকাশের নীচে

শেয়ার করুন

জেলা প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা ॥ এক সময়কার প্রমত্তা বেতনা নদী এখন মৃতপ্রায়। স্রোত হারিয়ে খালে পরিণত হওয়া এ নদীর দু’ তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা বর্ষার শুরুতেই প্লাবিত হয়। জলাবদ্ধতার করাল গ্রাসে পাঁচ থেকে ছয় মাস বন্দি হয়ে পড়ে এলাকার মানুষ, প্রাণীকুল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বাড়ি থেকে গামছা পরে রাস্তায় উঠে পোশাক পরিবর্তণের পর যেতে হয় স্কুলে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে জীবন বাঁচাতে খোলা আকাশের নীচে করতে হচ্ছে ক্লাস। এরপরও পড়াশুনায় ঘাটতি নেই।

সরেজমিনে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বল্লী ইউনিয়নের আমতলা বাসাবাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে এভাবেই কথা বলে চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র শঙ্কর কুমার সরকার। বাড়ির উঠানে পানি থৈ থৈ করছে। এরপর বাবাকে মজুরি খেটে সংসার চালাতে হয়। নুন আনতে পানতা ফুরানোর অবস্থা। এরমধ্য দিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছি। স্কুলের ছাদ ও পিলার ফেটে যাওয়ায় খোলা আকাশের নীচে ক্লাস করতে হচ্ছে। ফলে মনোবলের কিছুটা চিড় ধরেছে।

এসব কথা বলে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র আরিফ হোসেন। তার সঙ্গে একই সুরে কথা বলে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী নাজনিন আক্তার, একই শ্রেণীর মাসুদ পারভেজ, দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী আনন্যা সরকারসহ কয়েকজন। তারা বলে রোদ, ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নীচে বা ত্রিপল টানিয়ে দীর্ঘদিন ক্লাস করা সম্ভব নয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেকেই এ স্কুল ছেলে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে। অবিলম্বে ভবন সংস্কার বা নতুন ভবন তৈরি করে বিদ্যালয়ে পড়াশুনার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানায় তারা।

আমতলা বাসাবাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী অভিভাবক খায়রুল বাসার, নিমাই চন্দ্র সরকার, মাজেদা খাতুন ও মুজিবর রহমানসহ কয়েকজন জানান, বিদ্যালয়ের ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার কারণে খোলা আকাশের নীচে ক্লাস চালাতে হচ্ছে এটা দুর্ভাগ্যজনক। তবে এতে ছাত্র ছাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি নেই।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাসিমা খাতুন জানান, এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ২০০ জন ছাত্র ছাত্রী রয়েছে। ছয়জন শিক্ষকের মধ্যে নাজনিন আক্তার ডেপুটেশনে রয়েছেন।২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত পাশের হার শতভাগ। ২০১১ সালে সঞ্চিতা শর্মা ট্যালেন্টপুলে, সুমাইয়া খাতুন সাধারন বৃত্তি পেয়েছে। গত বছর হাবিবুর রহমান সাধারন গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। বর্তমানে ছাত্র ছাত্রীরা পড়াশুনার প্রতি বেশ অনুরাগী। ভাল পরিবেশ পেলে তারা আরো ভাল ফল করতে পারবে।

বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি দুলাল চন্দ্র রায় বলেন, ১৯৬৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও ভবন নির্মান করা হয় ১৯৯৩ সালে। বেসরকারি সংস্থা আইডিয়াল এর দু’টি ঘর নিয়ে তারা অফিসের কাজ কর্ম চালাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে। জলছাদ না দিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর ভবন ভাল থাকার কথা নয়। তাতে বেতনা নদীর পানি চুঁইয়ে বিদ্যালয়ের নীচের মাটির স্তরকে অপেক্ষাকৃত দুর্বল করে ফেলেছে। ওই পানির স্রোতে বিভিন্ন জায়গা থেকে মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছে।

এমতাবস্থায় ছাদ ও পিলার ফেটে গেছে। বিষয়টি বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সদস্য ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করেই গত ১৮ জুলাই উপজেলা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাগনকে প্রধান শিক্ষক অবহিত করেছেন। ৩ সেপ্টেম্বর সদর প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ, সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তা লাবন্য সরকার বিদ্যালয় পরিদর্শণ করেছেন। উপজেলা প্রকৌশলী জাহানারা বেগম ও বল্লী ইউপি চেয়াম্যান হাবিবুর রহমান বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন গত ১০ সেপ্টেম্বর। উপজেলা প্রকৌশলী ও সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ভবনের চারটি ঘরই ব্যবহার অনুপযোগি বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ইউপি চেয়ারম্যান পড়াশুনার সুবিধার্থে একটি ত্রিপল দিয়েছেন। বৃহষ্পতিবার খোলা আকাশের নীচে প্রথম ক্লাস শুরু হলেও ত্রিপল টানানোর জন্য বাঁশ সংগ্রহ করে শনিবার থেকে রাস্তার পাশে ক্লাস শুরু করা হবে।

সদর উপজেলা প্রকৌশলী জাহানারা বেগম ও সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লাবন্য সরকার জানান, বিদ্যালয়ের ভবনগুলো ঝুঁকির মধ্যে থাকায় বিকল্প ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত রাস্তার পাশে ক্লাস করানোর জন্য আমতলা বাসাবাটী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সমস্যা সমাধানের জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

>