মঙ্গলবার , ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ , ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > গণজাগরণ মঞ্চ ও হেফাজত

গণজাগরণ মঞ্চ ও হেফাজত

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ ও মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের উত্থান ঘটে এ বছরেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে নতুন প্রজন্ম রাজপথে নেমে আসে গত ৫ ফেব্রুয়ারি। তাদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারসহ দেশপ্রেমী সর্বস্তরের মানুষ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সমর্থন পায় গণজাগরণ মঞ্চ। নতুন করে শাহবাগে ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী স্লোগান— ‘জয় বাংলা’। ফিরে আসেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম— যার নেতৃত্বে ১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি উঠেছিল রাজপথে। গঠিত হয়েছিল গণ আদালত। গণজাগরণ মঞ্চের দাবির মুখে সরকার সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুইব্যুনাল অ্যাক্টস সংশোধন করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংশোধিত আইনে আসামি পক্ষের সাজা মওকুফের আপিলের সঙ্গে, কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তির কামনায়ও রাষ্ট্রপক্ষও আপিল করে সুপ্রিম কোর্টে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় নাকচ করে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। ‘

এদিকে গণজাগরণ মঞ্চের প্রায় কাছাকাছি সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, নারীর স্বাধীনতা হরণকারী ১৩ দফা নিয়ে নব উত্থান ঘটে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী জোটের।

আওয়ামী লীগের সমর্থন হারিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ এখন ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে ক্রমশ। অন্যদিকে বিএনপি ও স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির সমর্থন আর মদদে হেফাজত নতুন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। স্থানীয় থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়-পরাজয়ে এখন বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে হেফাজত। মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্য আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে রাজপথে থাকা মানুষ বলছে, গণজাগরণ মঞ্চের মতো একটি গণশক্তিকে কাজে লাগাতে পারেনি আওয়ামী লীগ। আর হেফাজতের নব উত্থানকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছে বিএনপি। ৫ সিটি করপোরেশনে বিএনপির জয় তারই সাক্ষ্য দেয়। আগামী জাতীয় নির্বাচনেও বিএনপি হেফাজতকে কাজে লাগানোর ছক কেটে রেখেছে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী ‘মিরপুরের কসাই’খ্যাত জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ৫ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের অসম্মতিতে ওই দিনই পথে নেমে আসেন অনলাইনে সক্রিয় কজন তরুণ। তাদের ডাকে শত-শত নারী-পুরুষ জড়ো হয় শাহবাগে। সেই থেকে রাত-দিন জেগে থাকে শাহবাগ। কখনও প্রজন্ম চত্বর, কখনও গণজাগরণ মঞ্চ নাম নিয়ে তরুণদের এই মিছিল ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ গোটা দুনিয়ায় সাড়া ফেলে ওই আন্দোলন। ১০ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে আবেগময় কণ্ঠে বলেন, ‘মন চায় শাহবাগে ছুটে যেতে’। বিএনপি প্রথমে শাহবাগ আন্দোলনে সমর্থন দিয়েও পরে তা তুলে নেয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শাহবাগে গিয়ে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দিলে দিকে-দিকে তরুণদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় সারা দেশে আলোকশিখা প্রজ্জ্বলন করা হয় শাহবাগ আন্দোলনের সমর্থনে। ২০ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের নামে আকাশের ঠিকানায় প্রেরণ করা হয় চিঠি। তখন শাহবাগ মানে বাংলাদেশ। জাতীয় দৈনিকের পাতাজুড়ে ছিল শাহবাগ। আমাদের আন্দোলন নিয়ে কলকাতার গায়ক সুমন লিখলেন নতুন নতুন গান। সেই গণজাগরণের মধ্যেই শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা রাজীবকে ১৬ ফেব্রুয়ারি নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তার বাড়ির সামনে।

অন্যদিকে সরকারের আসকারা, আপ্যায়নে এপ্রিলের ৫ তারিখে ঢাকার মতিঝিলে সমাবেশ করে হেফাজত। ১৩ দফা মেনে না নিলে ওই দিনই ৫ তারিখে ঢাকা দখল করার কর্মসূচিও সেদিন ঘোষণা করে হেফাজত।

একমাস পর ৫ মে নির্বিঘ্নে সারা দেশ থেকে ঢাকায় আসে হেফাজতের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে তারা ফিরে যাবে, সরকারের সঙ্গে এমন বোঝাপড়া ছিল বলে দাবি করা হয় সরকার পক্ষ থেকে। কিন্তু হেফাজত সে কথা রাখেনি। তারা ৫ মে দিনভর তাণ্ডব চালায় মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম আর পল্টন এলাকায়। আগুন ধরিয়ে দেয় কোরআন শরিফে। সড়ক বিভাজন আর ফুটপাতের গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে। ফুটপাতের দোকান, সিপিবি কার্যালয়সহ অনেক সরকারি-বেসরকারি অফিসে আগুন দেয় হেফাজতকর্মীরা। শত-শত সরকারি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় ওই সময়। রেহায় পাননি সংবাদকর্মীরাও। সাংবাদিক নাদিয়ার ওপর বর্বর আক্রমণ চালায় তারা। মতিঝিল শাপলা চত্বর থেকে সেদিন ঘোষণা দেওয়া হয় সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাবে না হেফাজতের নেতা-কর্মীরা। তাদের ওই অবস্থানের পক্ষে সমর্থন দেয় বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া ওই দিন তার দলের নেতা-কর্মীদের হেফাজতের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। ৫ তারিখ রাতে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়ে হেফাজতকে অবস্থান মঞ্চ থেকে সরিয়ে দেয়। এ নিয়েও শুরু হয় বিতর্ক। পুলিশ আর সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় অভিযানে একজনেরও প্রাণহানি ঘটেনি। অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াত আর হেফাজতের পক্ষ থেকে এখন দাবি করা হচ্ছে, কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে মেরে লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেদিন লাখ-লাখ রাউন্ড গুলি ছোঁড়া হয়েছে। বিরোধী পক্ষ এখন পর্যন্ত তাদের দাবির পক্ষে কোনও প্রমাণ দাঁড় করাতে পারেনি। দেশে-বিদেশে এ নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছে। সর্বশেষ গাজীপুর সিটি নির্বাচনে শাপলা চত্বরকে ইস্যু করে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক ডাকাতি করেছে হেফাজত এমন অভিযোগ আওয়ামী লীগের। এই ইস্যু ধরে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ অপপ্রচার অব্যাহত রাখবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে আওয়ামী লীগ।

যে রাতে মতিঝিল থেকে হেফাজতকে তাড়িয়ে দেয় আইন-শৃঙ্খলারক্ষা বাহিনী সে রাতেই গণজাগরণমঞ্চের প্রাণকেন্দ্র শাহবাগের সব স্থাপনা ভেঙে দেয় পুলিশ। এরপরও বিছিন্নভাবে সক্রিয় থেকেছে এই মঞ্চ। এর উদ্যেক্তাদের প্রাণ দিতে হয়েছে মৌলবাদীদের ছুরিতে। কয়েক জনকে জেল খাটতে হয়েছে। সরকারের সমর্থন হারানোর পর শক্তভাবে দাঁড়াতেই পারছে না এই মঞ্চ। অন্যদিকে বিএনপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে আগামীতে ক্ষমতার ভাগিদার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে হেফাজতে ইসলাম।

এদিকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করায় গণজাগরণ মঞ্চে তারুণ্যের উল্লাস ফিরে আসে। বিজয় সূচিত হয় আন্দোলনের। মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত মানুষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। তারা দ্রুত বিচারের রায় কার্যকরের দাবি জানায়। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে নিজেদের সমর্থন তুলে নিলেও আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাদের মোল্লার রায়ের দিন সিলেটের জনসভায় বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেউ বন্ধ করতে পারবে না। বাংলার মাটিতে তাদের বিচার হবেই।

রায়ে সন্তুষ্ট না হলেও তা মেনে নিয়েছে জামায়াত। তবে এই রায়কে ভুল বলেছেন জামায়াত নেতা ও কাদের মোল্লার আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। রায়ের অসম্মতিতে বুধ ও বৃস্পতিবার টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডেকেছে দলটি। হরতালকে ঘিরে দেশব্যাপী জামায়াত-শিবির ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে।

কাদের মোল্লার রায় নিয়ে জামায়াতের জোটবন্ধু বিএনপি কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে সরকারবিরোধী আন্দোলন আর ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত আর হেফাজতকে এখনপর্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে বিএনপি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, মহাজোট সরকার গণজাগরণ মঞ্চের চেতনা থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।

১৯৫২ সালের ভাষা সৈনিক আহমদ রফিক গণজাগরণ মঞ্চ নিয়ে সরকারের ভূমিকায় প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, তরুণরা একটি যৌক্তিক দাবি নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে তোলে। এদেশে স্বাধীনতায় যারা বিরোধিতা করেছে, যারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে রাজপথে নেমেছিল তরুণরা। তাদের সেই দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মানুষ জড়ো হয় শাহবাগে। কে যায়নি তখন ওখানে? যুদ্ধপরাধীদের দল ছাড়া সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই গণজাগরণ মঞ্চে গিয়ে ঐকমত্য দেখিয়েছেন। সরকার কেন তাদের সমর্থন তুলে নিল জানি না।

গণজাগরণ মঞ্চ থেকে সরকারের সমর্থন তুলে নেওয়াকে নিজের পায়ে কুড়াল মারার সঙ্গে তুলনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের উপ-অধিনায়ক, সাবেক সেনা প্রধান কেএম সফিউল্লাহ বীর উত্তম। বলেছেন, আমরা নতুন করে ৭১ দেখেছিলাম। যুদ্ধাপরাধীরা যেখানে একের পর এক তাণ্ডব চালাচ্ছে, আমাদের স্বাধীনতা, দেশ, সংবিধান, আদালতকে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে, সেখানে গণজাগরণ মঞ্চের অহিংস আন্দোলনের প্রতি সরকার কেন খড়্গহস্ত হল?

শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী বলেন, হেফাজতে ইসলাম দেশদ্রোহী, রাষ্ট্রদ্রোহী, অন্ধকারের শক্তি। তারা নারীকে ঘরে আটকে রাখতে চায়। সেই হেফাজতের আন্দোলন দমাতে গিয়ে আমাদের আলোর পথের যাত্রী গণজাগরণ মঞ্চকে ধ্বংস করা মোটেও উচিত কাজ হয়নি। এর মাশুল সরকারকে দিতে হবে।

>