সোমবার , ১লা মার্চ, ২০২১ , ১৬ই ফাল্গুন, ১৪২৭ , ১৬ই রজব, ১৪৪২

হোম > শীর্ষ খবর > গাজীপুর বদলে দিলো রাজনীতি

গাজীপুর বদলে দিলো রাজনীতি

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ গাজীপুরে জয়ের ব্যাপারে গভীর আস্থাশীল ছিল ক্ষমতাসীন দল। চার সিটি নির্বাচনে শোচনীয় ভরাডুবির গ্লানি কিছুটা হলেও গোছানোর প্রত্যয় ছিল তাদের। কিন্তু গাজীপুরেও বিশাল ব্যবধানে পরাজয় যেন নৌকার মাস্তুলেই আঘাত করে বসেছে। গাজীপুরসহ সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের ফল বলতে গেলে জাতীয় রাজনীতির মোড়ই পাল্টে দিয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাব কি করে সামাল দেয়া হবে তাই নিয়ে চিন্তিত ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, সিটি নির্বাচনের ফল আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। এদিকে গাজীপুরের নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর হতাশ-বিমর্ষ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রতিক্রিয়াহীন। নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা গতকাল তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, গাজীপুরে বিএনপি’র অপপ্রচার জয়ী হয়েছে। তবে প্রমাণ হয়েছে বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তবে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুরের ফল এবং সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ করে এ নেতা চোখের পানিও ফেলেছেন। আপসোস করে তিনি বলেছেন, সারা জীবন আওয়ামী লীগের জন্য কাজ করেছি। জীবনের শেষ সময়ে দলকে এমন অবস্থায় দেখে যাবো তা কখনও ভাবিনি।
শনিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এমএ মান্নান পেয়েছেন তিন লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৪ ভোট। আর আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এডভোকেট আজমত উল্লা খান পেয়েছেন, দুই লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৭ ভোট। মান্নান এক লাখ ছয় হাজার ৫৭৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের পর গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকারি দলের জন্য ছিল জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় তারা পরাজিত হয়েছেন। তবে সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার প্রমাণ হয়েছে বলে তারা পরাজয়ের গ্লানি ঢাকার চেষ্টা করেন। চার সিটির মতো গাজীপুরেও তারা একই কথা বলে আত্মপ্রবোধ নিচ্ছেন। সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকারের নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে না বলেও মনে করছে। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল রোববার বিজয়ী মেয়র ও কাউন্সিলরদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন আলাদা বিষয়। তবে পরাজয় থেকে শিক্ষা নেয়ার তাগিদ বোধ করেন তিনি।
চার সিটি করপোরেশন এবং সর্বশেষ গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন হলেও এসব নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যুগুলো যত না স্থান পেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুসমূহ। সরকারি দল ও মহাজোট প্রার্থী যার সন্তোষজনক জবাব ভোটার সাধারণকে দিতে পারেননি। প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ তৎকালীন বিএনপির সরকারের শেষ সময়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। তার প্রভাব পড়ে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে। যাতে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। সিটি করপোরেশনভুক্ত জেলা ও তার পার্শ্ববর্তী জেলার নির্বাচনী এলাকাগুলোতেও সিটি নির্বাচনের প্রভাব পড়ে থাকে। পাঁচ সিটি করপোরেশনভুক্ত জেলাসমূহের নির্বাচনী এলাকায়ও প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক।
বিরোধী দল মনে করে জাতীয় নির্বাচনে সিটি নির্বাচনের ব্যাপক প্রভাব পড়বে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা, সরকারের মন্ত্রীদের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনায় জনমন বিষিয়ে গেছে। তারা পরিবর্তনের অপেক্ষায়। পাঁচ সিটি করপোরেশনে জনসাধারণ সে সুযোগ পেয়ে তাদের অসন্তোষ, হতাশা, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনেও এরই প্রতিফলন ঘটবে বলে তারা দৃঢ়ভাবে আস্থাশীল। বিএনপি চাইছে সকল বিরোধী দলকে সরকারবিরোধী অভিন্ন অবস্থানে আনতে। ১৮ দলীয় জোট সমপ্রসারণের মাধ্যমে অথবা ন্যূনতম সমঝোতায় সমান্তরাল পৃথক দলগত বা জোটগত অবস্থান থেকেও তা হতে পারে। এরশাদের জাতীয় পার্টি, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জেপি, প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, ড. কর্নেল অলি আহমদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আ.স.ম রবের জাসদসহ অন্যান্য দলকেও এক শিবিরে আনার জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেবে বিএনপি। এদের মধ্যে জামায়াত বিরোধী নীতিগত অবস্থান থেকে জেপি, জাসদ (রব), গণফোরামের বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাচন সামনে রেখে আসন ভাগাভাগির প্রশ্ন মুখ্য হওয়ায় বিএনপির পক্ষে কতটা ছাড় দেয়া সম্ভব নির্বাচনী জোট বা বৃহত্তর সমঝোতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তা বড় প্রশ্ন হয়ে আসবে। সাড়ে চার বছর ধরে সংগ্রামরত বিএনপির ত্যাগী, সম্ভাবনাময় প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রশ্নে ছাড় দেবেন না। মনোনয়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রেখে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিএনপির সমঝোতার বিষয়ও অনিশ্চয়তার দোলাচলে থেকে যেতে পারে।
নাটকীয় ঘটনা প্রবাহের পরও এরশাদই রাজনীতির কেন্দ্রে থেকে যাচ্ছেন। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরিবর্তিত অবস্থান তাকে দলের ভিতরে, বাইরে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। মহাজোটে না থাকার ঘোষণা দেয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরুতেই তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে সমর্থনের ঘোষণা দেন। এতে এই প্রথম এরশাদের নেতৃত্ব মাঠ পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ হয়েছে। তার নির্দেশ অমান্য করে মাঠের নেতাকর্মীরা বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। সংসদ নির্বাচনেও এরশাদ পার্টির নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করলে তার নেতৃত্ব বড় রকমের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। কেন্দ্র থেকে নিয়ে মাঠ পর্যায়ে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এতটাই বঞ্চনা, অবহেলার শিকার যে, পূর্ববর্তী সংসদ নির্বাচনগুলোর মতো এবারে তারা নির্দ্বিধায় এরশাদের নির্দেশ মেনে নেবেন বলে অনেক নেতাই মনে করছেন না। এরশাদ শেষ পর্যন্ত মহাজোটে থেকে নির্বাচন করলে তা পার্টির বিভক্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।
সরকারের প্রতি জনসাধারণের আস্থা হারানোর বিষয় সরকারের শীর্ষ মহল এ পর্যন্ত আমলে না নিলেও চার সিটির পর গাজীপুরের পরাজয় তাদের টনক নড়িয়ে দিয়েছে। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথা, আস্থা হারিয়ে ফেললে জনগণ যে কোন দুর্গই ভেঙে ফেলতে পারে। জনগণের কাছে দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে কিছু নেই। গাজীপুরে জনগণ আমাদের ভোট দেয়নি, আমরা হেরেছি।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল নিতে যাচ্ছে সরকার। তবে স্বল্প সময়ে তা কতটা সম্ভব হবে তা-ও প্রশ্নসাপেক্ষ। সাড়ে চার বছরে বিভিন্ন স্পর্শকাতর, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের অনমনীয়, অস্পষ্ট অবস্থান, ব্যাপক জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের মন্ত্রীদের জনস্বার্থ বিরোধী বক্তব্য, সিদ্ধান্তসহ ব্যাপক দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, চাঁদাবাজি, দখলবাজি সহ বেশ কিছু বিষয় সরকারের জনপ্রিয়তায় আঘাত করেছে। স্বল্প সময়ে সে ক্ষত পূরণ করা সম্ভব নয়। জনমনে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়ে গেছে সরকার ও দল তা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সাধারণের চোখে পড়ে এবং তাদের প্রভাবিত করে জরুরিভিত্তিক এমন কিছু পদক্ষেপ নেবে। সাংগঠনিকভাবে অনাদৃত অভিজ্ঞ নেতাদের পুনঃমূল্যায়নের কথাও ভাবা হচ্ছে।
সরকারের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ, প্রভাবমুক্তভাবে সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠানকে সরকারি মহল তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুকে দুর্বল করেছে বলে মনে করছে। তারা মনে করেন এই সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অপরদিকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে। ঈদের পর এ দাবিতে তারা জোরালো আন্দোলনে নামবেন।
একই সঙ্গে দলের এমপি, সাবেক এমপি, সম্ভাবনাময় প্রার্থীরাসহ নেতৃবৃন্দের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে এ ধারণাও দৃঢ় হয়েছে যে, বিএনপি তার জোট নিয়ে যে কোন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে গেলে সরকারি দলের ভরাডুবি হবে। পাঁচ সিটিতে বিশাল বিজয়ের পর তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে বিরোধী শিবিরে মতামত থাকলেও শীর্ষ নেতৃত্ব এ ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানেই রয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা থেকে সরে আসার কোন লক্ষণ নেই। সরকারেরও পূর্ববর্তী অনমনীয় অবস্থানে কোন পরিবর্তন আভাস নেই। এমনি অবস্থায় সকল দলের অংশগ্রহণে সংসদ নির্বাচনের অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

>