শুক্রবার , ২৭শে নভেম্বর, ২০২০ , ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১১ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > শীর্ষ খবর > চরম বিপর্যয়ে পড়বে বাংলাদেশ

চরম বিপর্যয়ে পড়বে বাংলাদেশ

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বহুল আলোচিত টিকফা চুক্তি নিয়ে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কথাবার্তা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের দাবি এই চুক্তি স্বারিত হলে দু’দেশের মধ্যে যে কোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি হবে। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আরও উন্নয়ন হবে। অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির ম্ধ্যামে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরতি হবে। নানা কৌশলে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের শোষণের শিকার হবে বাংলাদেশ।

গত ১৭ জুন মন্ত্রিসভায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত কাঠামোগত সমঝোতা (টিকফা) চুক্তির খসড়া অনুমোদিত হয়। এর পরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন একটি সুবিধাজনক সময়ে এই চুক্তি সারিত হবে। যদিও কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে হলে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সরকার চুক্তিটির বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রেখেছে যা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ তিগ্রস্ত হবে। অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখিন হবে দেশীয় শিল্প। যদিও সরকার বলছে, এই চুক্তির ফলে লাভ বাংলাদেশেরই হবে। এমনকি বাণিজ্যন্ত্রী জিএম কাদের বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। সেই বন্ধুত্বের জায়গা থেকে তারা টিকফা চুক্তি করছে।’ কিন্তু দেশের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ সরকারের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন।

এই চুক্তির খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয় ২০০১ সালে। ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা সম্বলিত চুক্তিটির প্রথম খসড়া রচিত হয় ২০০২ সালে। পরে ২০০৪ সালে এবং তারও পরে আবার ২০০৫ সালে খসড়াটিকে সংশোধিত রূপ দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প চুক্তিটির বিরোধিতা করে আসছে।

এমন কি সদ্য সাবেক হওয়া পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েস এক ঘরোয়া বৈঠকে বলেছিলেন, তিনি এই পদে থাকা অবস্থায় কোনভাবেই টিকফা চুক্তি হতে দিবেন না। তবে সরকারের শেষ সময়ে এসে বেশ কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এই চুক্তি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুক্তিটি আমেরিকার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের। এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র এর আগে অন্যান্য বেশকিছু রাষ্ট্রের সঙ্গেও করেছে। চুক্তির ধারা উপধারাও আমেরিকার তৈরি। আমেরিকা চুক্তি স্বারের বিষয়ে নাছোড়বান্দা এবং তারা হাল ছেড়ে না দিয়ে বছরের পর বছর ধরে এজন্য বাংলাদেশের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে চলেছে। যেহেতু বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উভয় েেত্রই বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য, আধিপত্য প্রশ্নাতীত এবং এই েেত্র অসামঞ্জস্য পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই বাণিজ্য ও বিনিয়োগের স্বার্থ রার উদ্দেশ্যে করা চুক্তিটি দিয়ে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরণের একতরফা সুবিধাপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হবে। সমালোচকদের এই সমালোচনা নিরসনের জন্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-এর সঙ্গে সহযোগিতা শব্দ যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু চুক্তিতে যে সব প্রস্তাবনা ও ধারা রয়েছে সেগুলোর জন্য চুক্তিটি অসম ও মার্কিন স্বার্থবাহী।

চুক্তির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, উভয় রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য উদারনৈতিক নীতি গ্রহণ করবে। বেসরকারি খাতের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল ও পরামর্শ সরবরাহ করবে। এখানে লণীয় হলো দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের েেত্র শুধু সার্ভিস সেক্টরের বা সেবা খাতের কথা উল্লেখ রয়েছে, পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি সংযুক্ত রাখা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যে বিনিয়োগ করবে, তা শুধু সেবা খাতেই। তারা কোনো পণ্য এ দেশে উৎপাদন করবে না। চুক্তির এসব ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য দেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিবে এবং বিদ্যমান শুল্ক এবং অশুল্ক বাধাসমুহ দূর করতে বাধ্য থাকবে। বাংলাদেশকে দেশীয় শিল্পের/কোম্পানির প্রতি সুবিধা প্রদানকারী বাণিজ্য সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংরণ নীতি প্রত্যাহার করতে হবে।

টিকফা চুক্তিতে বলা আছে, বাংলাদেশ ১৯৮৬ সালে স্বারিত দ্বিপীয় বিনিয়োগ চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির উপর কোনো কর আরোপ করতে পারবে না এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলে তাদের তিপূরণ দিতে হবে। এই চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগের বিশেষ সুরাসহ মার্কিন কোম্পানিগুলোকে সেবাখাতে বাণিজ্যের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধা দিয়ে দেশের জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, টেলিযোগাযোগ, শিা, স্বাস্থ্য, পরিবহন ইত্যাদি সেক্টরকে বহুজাতিক কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। চুক্তির প্রস্তাবনা অনুযায়ী বাংলাদেশকে দোহা ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডা অনুসারে কৃষিতে ভর্তুকি হ্রাসকরণ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া টিকফা চুক্তির অন্যতম দিক হচ্ছে মেধাসত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন।

চুক্তিটি স্বারিত হলে দেশের সেবাখাতসমূহ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানির দখলে চলে যাবে। এতে করে দেশীয় কোম্পানিগুলোর স্বার্থও বিঘ্নিত হবে। অবাধ মুনাফা অর্জনের জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলোর সেবা যেমন টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, চিকিৎসা, শিা, বন্দর প্রভৃতি ও পণ্যের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি করবে। সেবাখাতে বিদেশি প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর অবাধ বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ প্রদান করলে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে যে কর্মসূচি নিয়ে থাকে তা সঙ্কুচিত হবে অথবা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনধারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজে সুকৌশলে বাণিজ্য সংরণ নীতি গ্রহণ করে অনুন্নত দেশকে বাণিজ্য সুবিধা প্রদান থেকে বিরত থাকছে।

এ বিষয়ে কথা বলেন তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রা কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘প্রথমত এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের কি লাভ হচ্ছে সেটি সরকার বলছে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য টিকফা চুক্তি করার দরকার কেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে সে নিজে বাধা না দিলে অন্য কেউতো বাধা দিবে না। আবার বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে কোনো বাধা নেই। ফলে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য নতুন চুক্তির প্রয়োজন নেই। মূল কথা হলো বিনিয়োগের বিষয়টি বেশি আসবে জ্বালানি খাতে। তবে এই খাতে মার্কিন কোম্পানির বিনিয়োগের ফলে আমরা ইতোমধ্যেই বড় ধরনের তির সম্মুখিন হয়েছি। মাগুরছড়ায় যে পরিমাণ গ্যাস সম্পদ নষ্ট হয়েছে তা দিয়ে এক বছরের বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব ছিল। এই দুর্ঘটনার তিপূরণ নিয়েও কোন আলোচনা নেই। সুতরাং টিকফা চুক্তির প্রক্রিয়াতে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। এটি সম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ, উদ্যোগ এবং স্বার্থে করা হচ্ছে। চুক্তিটিতে দুর্নীতি আর শ্রমঅধিকার নিয়ে কথা আছে। তবে এগুলো অলঙ্কার হিসেবে রাখা হয়েছে।’

অন্যদিকে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) প্রেসিডেন্ট সবুর খান টিকফা চুক্তিতে বাংলাদেশের লাভই দেখছেন। তিনি বলেন, ‘টিকফা দুই দেশের মধ্যে আলোচনার জন্য একটি প্লাটফর্ম তৈরি করবে। দুই দেশের যে কোনো বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে। এটি দুই দেশের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক। মেধাস্বত্ব আইনের বাস্তবায়নের বিষয়ে সবুর খান বলেন, আমাদের দেশের অনেক মেধাবী তরুণ বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে। কিন্তু এগুলো প্যাটেন্ট করিয়ে নিচ্ছে অন্যরা। এমনিতেই আমরা ২০২১ সালের পর মেধাস্বত্ব আইন পরিপালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সেই দিক থেকে আমি এখানে তেমন কোনো তির কারণ দেখছি না। সব থেকে বড় বিষয়টি হলো, যে কোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে টিকফা চুক্তির মাধ্যমে।’

টিকফার প্রস্তাবনায় মানবাধিকার, শ্রমের মান এবং শ্রমজীবীদের অধিকার ও পরিবেশগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তার ল্য শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা নয় বরং এগুলোকে নন-ট্যারিফ (অশুল্ক) বাধা হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র তার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রফতানি ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

মেধাস্বত্ব : একবিংশ শতাব্দীর শোষণ হাতিয়ার

মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন হলে তা উন্নত দেশগুলোর মালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করবে। তারা উন্নত প্রযুক্তি এবং উৎপাদন পদ্ধতির অধিকারী হবার পর তারা এই জ্ঞানকে কুগিত করে রাখতে চায়। টিকফা চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই মেধাস্বত্ত্ব আইন মানতে বাধ্য করছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে।

আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘গোটা বিশ্বে দুর্নীতিবাজদের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের সখ্যতা বেশি। তাদের আগ্রহের জায়গাটি হলো মেধাস্বত্ব আইনের বাস্তবায়ন। এটি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন ত্রে তিগ্রস্ত হবে। মার্কিন কোম্পানিগুলো খুবই বড় ধরনের সুবিধাজনক একটি জায়গাতে আসতে পারবে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ওষুধ শিল্প এমন কি কৃষিখাতের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি বাধাগ্রস্ত হবে।’

টিকফা চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের আগেই মেধাস্বত্ব আইন মেনে চলতে হবে, কেননা চুক্তির ৮ নম্বর প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধাস্বত্ব অধিকার এবং অন্যান্য প্রচলিত মেধাস্বত্ব আইনের যথাযথ এবং কার্যকরী রণাবেণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প, কম্পিউটার সফটওয়্যারসহ গোটা তথ্যপ্রযুক্তি খাত আমেরিকার কোম্পানিগুলোর পেটেন্ট, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক ইত্যাদির লাইসেন্স খরচ বহন করতে গিয়ে অভূতপূর্ব লোকসানের কবলে পড়বে। ফলে বিভিন্ন পণ্য এবং প্রযুক্তির দাম অভাবনীয়ভাবে বেড়ে যাবে। দোহা ঘোষণা ২০০০ অনুযায়ী বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় বাণিজ্যবিষয়ক মেধাসম্পদ স্বত্ব চুক্তি অনুসারে স্বল্পোন্নত সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় এবং ওষুধের েেত্র মেধাস্বত্ববিষয়ক বিধিনিষেধ থেকে ছাড় পেয়েছে এবং এই সুবিধা গ্রহণ করে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পেটেন্ট করা ওষুধ উৎপাদন এবং রফতানি করতে পারছে। মেধাস্বত্ত্ব আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক ওষুধ তৈরি করতে পারবে না, আমাদেরকে কয়েক গুণ বেশি দামে বিদেশি কোম্পানির পেটেন্ট করা ওষুধ খেতে হবে। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্পে রফতানি সম্ভাবনা হারাবে। দরিদ্ররা ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাবে। ফলে অনেক মাঝারি ও ুদ্র শিল্প ধংস হয়ে যাবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই দেশকে সফটওয়্যার লাইসেন্স ফি বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকা তির সম্মুখীন হতে হবে।

পেটেন্ট আইন বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য এবং কৃষিতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট আইনে বলা আছে, ‘কোন কিছুর পেটেন্টের বেলায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অলিখিত উৎসের অনুসন্ধানের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’ এর মানে হচ্ছে হাজার হাজার বছর ধরে উন্নয়নশীল দেশের প্রচলিত উৎপাদন প্রণালি, জীববৈচিত্র্য, কৃষকদের নিজস্ব শস্যবীজ ইত্যাদি শুধুমাত্র প্রযুক্তি এবং অর্থের জোরে পেটেন্ট করে নিতে পারবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। বাংলাদেশ, ভারত, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশের নিজস্ব জীববৈচিত্র্যের অনেক জীব-অণুজীব এবং উদ্ভিদ প্রজাতি এখন বহুজাতিক কোম্পানির পেটেন্টের দখলে। ভারতীয় উপমহাদেশের শতাধিক গাছগাছড়া যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট অফিসে রেজিস্ট্রেশনের অপোয় রয়েছে।

নিম, হলুদ, মসলা, থানকুনি, চিরতার রস, ট্রাইফোলিয়েট অরেঞ্জসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন ফলদ এবং ওষুধি গাছ যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের কোম্পানির পেটেন্ট আগ্রাসনের শিকার হতে চলেছে। এেেত্র কোম্পানিগুলো তাদের উন্নত জেনেটিক টেকনোলজির মাধ্যমে ডিএনএ ফিঙ্গার প্রিন্ট নির্ণয় করে অন্য দেশের জীববৈচিত্র্য এবং কৃষিজ সম্পদকে নিজের বলে পেটেন্ট করিয়ে নিচ্ছে।

কৃষিতে পেটেন্ট বাস্তবায়ন হলে কৃষকদের শস্যবীজ উৎপাদন, সংরণ, পুনরুৎপাদন এবং রণাবেণের অধিকার থাকবে না। মেধাস্বত্ব আইন অনুযায়ী রয়্যালিটি পাবে আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আর ধ্বংস হবে দেশি প্রজাতি, পরিবেশ এবং কৃষি উৎপাদন কাঠামো। বীজ এবং কৃষি পণ্যের দাম অনেকগুণ বেড়ে যাবে বলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হলে কৃষিতে ভর্তুকি ব্যাপকহারে বাড়াতে হবে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কারণে তা বাংলাদেশ কখনোই পারবে না। কারণ বাংলাদেশকে দোহা ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডা অনুসারে কৃষিতে ভর্তুকি কমাতেই হবে।

দোহা এজেন্ডা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষিতে ৫% এর বেশি ভর্তুকি দিতে পারছে না অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই কৃষিতে ৩০% এর বেশি ভর্তুকি দিয়ে তাদের কৃষি ব্যবস্থাকে সুরা দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের কৃষিজ পণ্যের দাম ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজে কিন্তু বাণিজ্য সংরণ নীতি গ্রহণ করছে অথচ বাংলাদেশের মত অনুন্নত দেশগুলোকে বাণিজ্য উদারনীতি গ্রহণে নানা চুক্তির মাধ্যমে বাধ্য করছে।

রফতানি বৃদ্ধি অনিশ্চিত

টিকফা চুক্তির পে সরকারের যুক্তি হচ্ছে এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রফতানি বাড়বে । অথচ এশিয়ার দুটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি চীন এবং ভারত তার রফতানির যথাক্রমে ২১% এবং ১৯% পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করলেও তারা এ চুক্তি স্বার করেনি। অর্থাৎ টিকফা চুক্তি স্বারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানির সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রফতানিতে প্রধান বাধা হচ্ছে শুল্ক। বর্তমানে বাংলাদেশি পোশাক রফতানিকারকদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১৫.৩% শুল্ক দিতে হয়। অন্যদিকে চীনকে পরিশোধ করতে হয় মাত্র ৩%। তাহলে দেখা যাচ্ছে চীন টিকফা চুক্তি স্বার না করেও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম শুল্কে পণ্য রফতানি করতে পারছে। তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের লোভ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তি স্বারের জন্য এদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে কিন্তু টিকফা চুক্তিতে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কোন নিশ্চয়তা রাখা হয়নি।

এ বিষয়ে আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘এই চুক্তি করে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হবে এই কথাটি অতিচাতুর্যপূর্ণ কথা। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্য দেশের পণ্য যেখানে এক থেকে তিন ভাগ শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করে সেখানে বাংলাদেশকে প্রবেশ করতে হয় ১৫ ভাগ শুল্ক দিয়ে। সেটি নিয়ে সরকার কোনো কথা বলছে না এবং টিকফা চুক্তির মধ্যেও এ বিষয়ে কোনো কথা নেই।’

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কর্তৃত্ব খর্

টিকফার আরো একটি কালো দিক হলো বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের কর্তৃত্ব খর্ব হওয়া। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বাইরে স্বল্পোন্নত দেশের উপর আধিপত্য বিস্তারের জন্যই আমেরিকা সহযোগিতামূলক উদ্যোগের ছদ্মাবরণে টিকফার মত দ্বিপাকি চুক্তিগুলো করার চেষ্টা করছে। যদি স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দ্বিপাকি চুক্তির বেড়াজালে আবদ্ধ করা যায় তবে আন্তর্জাতিক বহুপাকি ফোরাম ডব্লিউ.টি.ও এ আমেরিকা তার আধিপত্যবাদী বাণিজ্য নীতি বাধাহীনভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে। এই ল্েযই পাকিস্তান, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ইরাক, উরুগুয়েসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই টিকফা চুক্তি সার করেছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতা হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তৃতীয় বিশ্বের পে প্রতিনিধিত্ব করছে। বিশ্বব্যাপী পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্যের বিপরীতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ রার জন্য এসব ফোরামে বাংলাদেশ যাতে কোনো ভূমিকা না রাখতে পারে সেজন্য বাংলাদেশকেও টিকফা চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে যুক্তরাষ্ট্র। কেননা টিকফা স্বার হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়া আর সম্ভব হবে না।

এ প্রসঙ্গে আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘বড় রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পে বাংলাদেশের মত ছোট রাষ্ট্রের সঙ্গে বহুদেশীয় ফোরামে সবসময় আলোচনা করা যায় না। কারণ সেখানে বিভিন্ন প থাকে। ফলে তারা ছোট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দ্বিপাকি চুক্তি করে। যাতে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় থাকে। টিকফা চুক্তির ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রাধিকার নির্ধারণ, আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যসহ বেশ কিছু বিষয়ের উপর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব আরও বাড়বে। একই সঙ্গে তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তার অজুহাতে বঙ্গোপসাগরে সেনা মোতায়েন সহজ হবে। এর ফলে বাংলাদেশ তার কর্তৃত্ব হারাবে।’

>