বুধবার , ২০শে জানুয়ারি, ২০২১ , ৬ই মাঘ, ১৪২৭ , ৬ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২

হোম > আন্তর্জাতিক > চাঁদে চীনের সফল অভিযানের পেছনে কে এই নারী?

চাঁদে চীনের সফল অভিযানের পেছনে কে এই নারী?

শেয়ার করুন

অনলাইন ডেস্ক ॥
অল্প কিছুদিন আগেই সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করেছে চীনের চ্যাং’ই-৫ চন্দ্রযান। এই অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এমন একজন নারীকে নিয়ে দেশটির সামাজিক মাধ্যমে রীতিমত আলোড়ন তৈরি হয়েছে। ২৪ বছর বয়সী ঝৌ চেংয়ু এই চন্দ্রাভিযানের একজন ‘স্পেস কমান্ডার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওয়েনচ্যাং স্পেসক্রাফট উৎক্ষেপণ এলাকায় যারা স্পেস কমান্ডার হিসেবে কাজ করছেন তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে ছোট ঝৌ। কিন্তু সেখানে তাকে শ্রদ্ধা করে সবাই ডাকেন ‘বিগ সিস্টার’ বলে। তার কাজ আর দায়িত্বই তাকে এই সম্মাননা এনে দিয়েছে।

চ্যাং’ই-৫ চন্দ্রাভিযান গত সাত বছরে চীনের তৃতীয় সফল অভিযান। নমুনা সংগ্রহ করতে গত ১ ডিসেম্বরে চাঁদের অদেখা পৃষ্ঠে নামে চীনের চ্যাং’ই-৫ মহাকাশযান। ঝৌ এই অভিযানে ‘রকেট-সংযোগ সিস্টেমের’ দায়িত্বে ছিলেন। পুরো অভিযানের সাফল্যের জন্য এই বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

চীনের সামাজিক মাধ্যম ওয়েইবোতে ঝৌকে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়ে গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে ২৩ নভেম্বর চ্যাং’ই-৫ অভিযানের সাফল্যের পেছনে তাকে গুরুত্বপূর্ণ নারীদের একজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বয়স কম হওয়ায় চীনের জনগণের মাঝে তাকে নিয়ে রীতিমত সাড়া পড়ে গেছে। সামাজিক মাধ্যমে তার মেধা ও বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করা হচ্ছে। তাকে চীনের গর্ব বলে মনে করছেন বেশির ভাগ মানুষ। অনেকেই আবার ঝৌয়ের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করে কৌতুক করে লিখছেন ‘কি করলাম জীবনে’!
চীনের গুইঝু প্রদেশের বাসিন্দা ঝৌ। তাকে নিয়ে যে এত মাতামাতি চললেও সেটা তার ওপর কোন প্রভাব ফেলেনি বলেই মনে হচ্ছে। স্থানীয় একটি নিউজ সাইটের খবর অনুযায়ী, সাক্ষাৎকারের জন্য অনেক অনুরোধ জানানো হলেও ঝৌ তাতে রাজি হননি। তার কাজের পথে এই খ্যাতি কোন বাধা হয়ে দাঁড়াক সেটা তিনি চান না।

চীনে চাঁদের এক দেবীর নামে এই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে চ্যাং’ই-৫। এই চন্দ্রযান চাঁদ থেকে পাথর এবং মাটি সংগ্রহ করে তা পৃথিবীতে পাঠাবে। এগুলো বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে চাঁদের গঠন সম্পর্কে আরও বেশি জানতে পারবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদি এই অভিযান সফল হয়, তবে সেটি হবে গত ৪০ বছরে এ ধরণের প্রথম ঘটনা। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পর চীন হবে তৃতীয় দেশ যারা এরকম অভিযানে সফল হলো।

বেইজিং এখন একটি ‘স্পেস সুপারপাওয়ার’ বা মহাকাশের পরাশক্তি হতে চাইছে। তাদের চন্দ্রাভিযান সেই উচ্চাভিলাষ পূরণের লক্ষ্যেই করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এটাকে তার দেশের ‘স্পেস-ড্রিম’ বলে বর্ণনা করেছেন। আর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এটাকে চীনের জাতীয় পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে নেয়া পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন যে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এক বড় শক্তি হয়ে উঠছে, মহাকাশ অভিযান দিয়ে তারা সেটা দেখাতে চাইছে। তারা বলতে চাইছে, বিশ্ব মঞ্চে তাদেরকে এখন এক বড় শক্তি হিসেবে সমীহ করে চলার সময় এসেছে।

চীনের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী অধ্যাপক আউইয়াং জিউয়ান দেশটির পিপলস ডেইলি পত্রিকাকে ২০০৬ সালেই বলেছিলেন, চন্দ্রাভিযান হচ্ছে একটি দেশের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ক্ষমতার একটি প্রতিফলন। গত বছর চীন চাঁদের উল্টো পিঠে একটি রোবটিক মহাকাশযান নামিয়েছিল। চাঁদের উল্টোপিঠে মহাকাশযান নামানোর ক্ষেত্রে তারাই প্রথম সাফল্য দেখিয়েছে।

আগামী কয়েক দশকে চীন চাঁদে একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনেরও পরিকল্পনা করছে। তাদের পরবর্তী পরিকল্পনা হচ্ছে মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানো।

যে পৌরাণিক চরিত্রের নামে এই অভিযানের নাম রাখা হয়েছে, তার গল্প বেশিরভাগ চীনাই জানে। গল্পটি রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েটের গল্পের চেয়ে বেশি আলাদা কিছু নয়। এক নারী অমরত্বের ওষুধ পান করেছিলেন, কিন্তু নিজের স্বামীর জন্য কোন ওষুধ রেখে দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। অমরত্বের পর চ্যাং’ই চাঁদে উড়ে যান যেন তার স্বামীর মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত কাছাকাছি থাকতে পারেন।

চীনে প্রতি বছর চন্দ্র উৎসবের সময় এই গল্প শিশুদের বলা হয়। কাজেই চ্যাং’ই বলার সঙ্গে সঙ্গেই চীনের মানুষের চোখের সামনে চাঁদের দেবীর ছবিই ভেসে ওঠে।

চীন বিষয়ক মিডিয়া বিশ্লেষক কেরি অ্যালেন বলছেন, চীনের চন্দ্রাভিযানের জন্য একজন বলিষ্ঠ নারী চরিত্রের দরকার ছিল। এ কারণেই ২৪ বছর বয়সী ঝৌয়ের ছবি সব সরকারি প্রচারমাধ্যমে এত ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। তাকে বর্ণনা করা হয়েছে মহাকাশে চীনের সামনের কাতারের সৈনিক বলে।

চীনে এখন ক্রমাগত এরকম বলিষ্ঠ নারী চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। চীনের শীর্ষ নেতৃত্বে পুরুষদের খুব বেশি প্রাধান্য। গত নভেম্বরে চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা পাঠকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল, এ বছর যে নারীদের যেসব অর্জন, সে সম্পর্কে মতামত জানাতে। সেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানী চেন ওয়েই, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইং এবং মার্শাল ফাইটার ঝাঙ ওয়েইলির নাম উঠে আসে।

তবে এখনো চীনে নারীর ভূমিকার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে মনে করেন অনেকেই। গত সেপ্টেম্বরে চীনে কোভিড-১৯ সংক্রমণে নারীদের ভূমিকাকে টেলিভিশন নাটকে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিল, তখন এটি ব্যাপক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। বলা হয়েছিল, এই নাটকে নারীর ভূমিকাকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, তা খুবই নারী-বিদ্বেষী।

>