শনিবার , ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ , ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৯শে রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > জাহাজ ভাঙা শিল্পে মারাত্মক ঝুঁকি

জাহাজ ভাঙা শিল্পে মারাত্মক ঝুঁকি

শেয়ার করুন

বাংলাভূমি ডেস্ক ॥ রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সারা বিশ্ব সচকিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পের নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করাসহ অনেক বিষয়ে পশ্চিমা ক্রেতারা সোচ্চার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আরেকটি শিল্প আছে। এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে কয়েক হাজার মানুষ। বিশেষ করে তাদের মধ্যে অনেকেই শিশু। এটি হলো জাহাজ ভাঙা শিল্প। এ শিল্প থেকে প্রতিনিয়ত পরিবেশও দূষণ হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে তেমন সচেতনা সৃষ্টি হয়নি। কেউ এ নিয়ে তেমন কথাও বলে না। সুপরিচিত টাইম ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণে গত ৯ই জুলাই পোস্ট করা এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ‘আফটার রানা প্লাজা, বাংলাদেশ’জ শিপইয়ার্ড ওয়ার্কার্স ইন ডেঞ্জার অব বিং ফরগটেন’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনটি লিখেছেন ফ্রাঁসিস ওয়েড। তিনি লিখেছেন, বিশ্বের বড় বড় জাহাজ এসে নোঙর করে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম উপকূলে। সেখানেই গড়ে উঠেছে এ শিল্পের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ কোম্পানি। তারা ওইসব পরিত্যক্ত জাহাজ কেটে কেটে এনে এসব কারখানায় রিসাইকেল করে। এ খাত থেকে বাংলাদেশ বছরে আয় করে ১৩০ কোটি ডলার। দেশের ভিতরে চাহিদা মেটানোর েেত্র এখানকার পরিত্যক্ত স্টিল শতকরা ৮০ ভাগ চাহিদা মেটায়। কিন্তু বিশ্বের মধ্যে এই জাহাজ ভাঙা শিল্পকে অন্যতম প্রধান বিপদজনক সমস্যা হিসেবে গণ্য করা হয়। এ নিয়ে অনেক বিতর্কের পরও গত ২৭শে জুন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, ইউরোপের পতাকাবাহী জাহাজ বাংলাদেশ উপকূলে থাকবে। চট্টগ্রাম উপকূলে তা ভাঙা হবে। ভাঙা হবে ভারত ও পাকিস্তানেও। তারা আরও বলে, যেসব প্রতিষ্ঠান যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জাহাজ ভাঙে তারা কিভাবে বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে তা দেখতে তারা ওইসব কারখানায় যাবে। যখনই জাহাজ ভাঙা হয় তখনই তা থেকে অ্যাসবেস্টস, পিসিবি ও সিসা হয়তো বালুতে না হয় সমুদ্রের পানিতে মেশে। এতে শ্রমিকরা ভীষণ তিকর অবস্থায় পড়ছেন। যেখানে জাহাজ ভাঙা হয় সেখানে সাংবাদিকদের খুব একটা প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। এ বিষয়ে টাইম ম্যাগাজিন একটি ভাড়া করা নৌযান নিয়ে জরিপ করেছে। ওই নৌযানটি উপকূলের খুব কাছ দিয়ে গেছে। এ সময় এ শিল্পে কাজ করেন এমন কিছু শ্রমিকের সাাৎকার নেয়। তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কর্মেেত্রর পরিবেশ নিয়ে কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, জাহাজের ৩০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত চোঙ বেয়ে ওপরে উঠতে হয়। এ সময় তাদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম বলতে থাকে শুধু মাথায় একটি শক্ত হ্যাঁট। অতোটা ওপরে উঠে তারা বিশাল বিশাল ধাতব খণ্ড কেটে কেটে নিচে ফেলেন। এর একেক খণ্ড ধাতবের ওজন ২০ টন পর্যন্ত। নিচে তখন অপোয় থাকেন তার সহযোগীরা। এদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের গরিব এলাকা থেকে যাওয়া। তারা অশিতি ও যোগ্যতা সম্পন্ন নন। ২৬ বছর বয়সী তাদের একজন বললেন, চার থেকে ৫ মাস আগে আমি জাহাজের চোঙার চারতলা থেকে একজনকে পড়তে দেখেছি। তিনি নিচে এক খণ্ড ধাতব পদার্থের ওপরে পড়েছিলেন। এ সময় তার মুখ পড়ে নিচের দিকে। সামপ্রতিক গার্মেন্ট ট্র্যাজেডির পর এ খাতে নিরাপত্তা নিয়ে কথা উঠেছে। বাংলাদেশে শ্রমিকদের কম বেতন নিয়ে কথা উঠেছে। তাদের নিরাপত্তার মান নিয়ে কথা উঠেছে। কিন্তু এই জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিষয়টি সবার নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে জাহাজ ভাঙা শিল্পের পরিবেশ দেখাশোনা করে ব্রাসেলসভিত্তিক জোটের একটি গ্রুপ শিপব্রেকিং প্লাটফর্ম। তারা বলেছে, গত বছর এখানে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। তাদের একজন খোরশেদ। তার বয়স মাত্র ১৬ বছর। একটি ধাতব খণ্ড তার ওপরে পড়ায় সে নিহত হয়েছে। অন্য এক শ্রমিক বললেন ১০ বছর আগের কথা। তিনি বললেন, তখন ৪০ হাজার টন ধারণ মতার একটি তেলের ট্যাংকার উপকূলে পৌঁছে। কিন্তু তীরের কাছে আসামাত্র তা বিস্ফোরিত হয়। তখন তা থেকে মানুষগুলো ছিটকে পড়ে দূরে। তখন ১০০ মানুষ নিহত হয়। ২৩ বছর বয়সী একজন বলেছেন, তিনি এক বছর ধরে কোন কাজই পাচ্ছেন না। জাহাজ ভাঙা কারখানার মালিকরা-শ্রমিকদের ঝুঁকির কথা জানেন। তারা বলেছেন, বাইরের চাপের কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। মোহসীনের কারখানা চার বছর আগে পরিদর্শন করেছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও। এখন তিনি তার কারখানায় চিকিৎসক রাখেন। রয়েছে পানি শোধনের ব্যবস্থা। জাহাজ ভাঙার সময় যেসব বিষাক্ত পদার্থ নির্গত হয় তা পরিবেশ ও শ্রমিকের জন্য মারাত্মক তিকর। এমন সব বিপদ সত্ত্বেও এখানে কাজ করতে আসছে অপ্রাপ্ত বয়স্করা। ১২ বছর বয়সী একজন এরই মধ্যে কাটার হেলপার হিসেবে এক বছর কাজ করেছে। বিপজ্জনক সরঞ্জাম নিয়ে তাকে জাহাজের ল্যাডার বেয়ে উঠে যেতে হয় অনেক উঁচুতে। ১৩ বছর বয়সী একজন বলেছে, যখন সে কাজ নিতে যায় তখন কাজ পেতে কোন বাধা দেয়া হয়নি। সে বলেছে, আমি তাদের কাছে গিয়ে বললাম কাজ করতে চাই। আমাকে কাজ দেবেন। তারা বলল- হ্যাঁ। ব্যাস তারপর থেকে চলছে। তবে মোহসীন বলেন, তিনি কখনও তার কারখানায় শিশুদের ব্যবহার করেন না।

>