মঙ্গলবার , ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ , ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ৮ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > জিএসপি শর্তপূরণে অগ্রগতি নেই

জিএসপি শর্তপূরণে অগ্রগতি নেই

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি (শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার) সুবিধা ফিরে পাওয়ার চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ। সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতায় যেভাবে ফিকে হয়ে গেছে পদ্মা সেতুর স্বপ্ন, ঠিক একইভাবে ধোঁয়াশা হয়ে উঠছে জিএসপি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও। এরই মধ্যে দেশটিতে জিএসপি স্থগিতাদেশ কার্যকর হয়েছে। এর ওপর আবার ডিসেম্বরের মধ্যে শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে বাতিলের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ারও হুমকি দিয়েছে দেশটি। দেশটির এমন হুমকিতেও বাংলাদেশ ডিসেম্বরের মধ্যে শর্ত পূরণে সক্ষম হবে না বলে জানা গেছে। ফলে শর্ত পূরণের ব্যর্থতায় জিএসপি ফিরে পাওয়া এখন গুড়েবালি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, বাংলাদেশের জিএসপি স্থগিতের ব্যাপারে গত জুন মাসে সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু কিছু শর্ত পূরণসাপেক্ষে স্থগিতাদেশ কার্যকরের সময় দেয়া হয় দুই মাস। দুই মাসে বাংলাদেশ শর্ত পূরণে যথাযথ অগ্রগতি দেখাতে পারলে তা কার্যকর হবে না বলে জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ শর্ত পূরণের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় দুই মাস পর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্থগিতাদেশ কার্যকর হয়েছে। অর্থাত্ এই সময় থেকে দেশটিতে রফতানির ক্ষেত্রে জিএসপি সুবিধার আওতায় কোনো ধরনের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না বাংলাদেশী পণ্য। এর ফলে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সিরামিক ও প্লাস্টিক পণ্য, টেরিটাওয়েল ও তামাকসহ কয়েকটি পণ্য রফতানি। এসব পণ্য এতদিন সেখানে রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। তবে বড় রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। যদিও এ খাতের সমস্যার কারণেই এই সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতির হিসাবের চেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের ভাবমূর্তিতে। এখন যে কোনো উপায়ে স্থগিত হওয়া জিএসপি পুনরুদ্ধারই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের গাছাড়া ভাব ও নির্বাচন সমাগত হওয়ায় অনেকটা দুরূহ হয়ে যাচ্ছে জিএসপি ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা। তাদের ধারণা, জিএসপি ফেরত পেতে যুক্তরাষ্ট্রে নির্দেশিত ১৫টি কর্মপরিকল্পনা আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বাস্তবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে ডিসেম্বর নাগাদ এটি ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। পরবর্তীতে দেশে নির্বাচনী ডামাডোলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের প্রচেষ্টার ভাটা পড়তে পারে।
সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মপরিকল্পনার মধ্যে অন্যতম ছিল কারখানাগুলো পরিদর্শনের জন্য ২০০ পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া। এ বিষয়ে এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করা যায়নি। শ্রম সচিব মিকাইল শিপার সম্প্রতি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে ২৬ জন পরিদর্শক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তবে ২০০ ইন্সপেক্টর কবে নাগাদ নিয়োগ দেয়া যাবে এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, বর্তমান যে নিয়োগ কাঠামো আছে তাতে ২০০ ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়। ২০০ ইন্সপেক্টর নিয়োগ দিতে হলে কলকারখানা পরিদফতরকে অধিদফতরে রূপান্তর করতে হবে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশিত কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে দুই শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার ও বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। স্থগিত হওয়া দুটি এনজিও বিসিডব্লিউএস (বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটি) ও এসএএফই’র নিবন্ধন ফেরত দেয়ার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যার ক্লু উদঘাটনে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল দেশের শ্রম আইন সংশোধন ও ট্রেড ইউনিয়নের অবাধ নিবন্ধন দেয়া। এরই মধ্যে শ্রম আইনের সংশোধনী পাস হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া ১৫টি কর্মপরিকল্পনার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি পালন হওয়ায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি দেশটি। যার কারণে জিএসপি বিষয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দেশটির অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের শ্রমিকদের রক্তের বিনিময়ে তৈরি হওয়া পোশাক যুক্তরাষ্ট্র কিনবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা। দেশটির এক কংগ্রেসম্যানের বরাত দিয়ে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, কারখানার পরিবেশ উন্নয়ন, শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত ও নিরাপত্তা রক্ষার মাধ্যমেই পোশাক উত্পাদন করতে হবে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র রানা প্লাজার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা আর একটিও দেখতে চায় না বলে জানান তিনি। পাশাপাশি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জিএসপি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কঠিন সিদ্ধান্ত নিবে বলেও জানান তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র প্রদর্শিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে এটি বাংলাদেশ আবার ফেরত পাবে বলেও তিনি জানান।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন ওবামা প্রশাসনের কাছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শ্রমিক সংগঠনের ইউনিয়ন আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন (এএফএলসিআইও) ২০০৭ সালে বাংলাদেশকে জিএসপি-সুবিধা বাতিলের আবেদন করেছিল। ওবামা প্রশাসন সেই আবেদনটি ২০১৩ সালে গ্রহণ করে। পোশাক শ্রমিক আমিনুল হত্যা, কারখানায় একের পর এক ভাংচুর, শ্রমিক অসন্তোষ ও সরকারের বিভিন্ন ধরনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও কটাক্ষপূর্ণ উক্তি জিএসপি সুবিধা বাতিলে যুক্তরাষ্ট্রকে উসকে দিয়েছে। গত এপ্রিলে সাভারে রানা প্লাজা ভবন ধসে সহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হন। এরপরই বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) পাওয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় ওঠে। ওই ঘটনার প্রায় দুই মাস পর নয়জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ যেসব বাণিজ্য সুবিধা পেয়ে থাকে, তা স্থগিত রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতি আহ্বান জানান। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশের অগ্রগতি হওয়ার আগ পর্যন্ত এ সুবিধা স্থগিত রাখার আহ্বান জানানো হয়। ডেমোক্র্যাট সিনেটররা এ সময় বাংলাদেশের জন্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করতে এবং সে দেশের পোশাক কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বিধান করাসহ শ্রম আইন সংশোধনের জন্য রোডম্যাপ তৈরি ও এর জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে ওবামা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৭ জুন জিএসপি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি তা দুই মাস পর তা কার্যকর হবে বলে জানান। যার প্রেক্ষিতে চলতি মাসেই জিএসপি সুবিধার স্থগিতাদেশ কার্যকর হলো। জানা গেছে, বাণিজ্য সুবিধার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিনা শুল্কে প্রায় পাঁচ হাজার পণ্য রফতানি করতে পারে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের রফতানি আয়ের শতকরা ৮০ ভাগ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। পোশাক শিল্পের ভবিষ্যত্ চিন্তা করে জিএসপি সুবিধা কার্যকর রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন প্রয়োজন। কিন্তু সরকার সেদিকে না গিয়ে বরাবরই উল্টোপথে হেঁটেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ম্যানেজ করার পরিবর্তে ওই দেশের প্রতি কটাক্ষপূর্ণ বক্তৃতা অব্যাহত রেখেছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংককে যেভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়, সেভাবেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে। দুই মাস আগেও সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে হুশিয়ারি করেন। মজীনাকে হুশিয়ারি করে দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী পোশাক শিল্পে কর্মপরিবেশ সৃষ্টির জন্য গার্মেন্ট মালিকদের বাধ্য করা, আমিনুল হত্যার গ্রহণযোগ্য তদন্ত, শ্রমিকের বেতন ভাতা বৃদ্ধি কোনোটিই সুরাহা করতে পারেনি সরকার। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অব্যাহত রয়েছে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ও কারখানা ভাংচুর। এ ঘটনায় পোশাক শিল্পের প্রধান দুই বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে শ্রমিক সংগঠনগুলো বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিলের দাবিকে জোরাল করছে।
বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশটির বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের চাপে রয়েছে। এই চাপের মধ্যেই (দুই মাস আগে) ট্রেড ইউনিয়ন চালুর বিষয়ে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টির অভিযোগ এনে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনাকে ‘ট্রেড ইউনিয়ন প্রশ্নে আপনি বলার কে?’ শিরোনামে একটি চিঠি দেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। চিঠিতে এ ইস্যুতে রাষ্ট্রদূতের ভূমিকাকে অনধিকার চর্চা বলে মন্তব্য করা হয়। জিএসপি সুবিধা বাতিল হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বাংলাদেশ। মোট রফতানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশের বাজার হাতছাড়া হওয়ায় বাণিজ্য ভারসাম্যে আরও পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। প্রতিকূল অবস্থায় পড়বে দেশের লেনদেন ভারসাম্য, বর্তমানে যা অনুকূলে রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা বাতিলে কারখানার কর্মপরিবেশকে সামনে আনলেও এর পেছনে অন্য কারণও রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন, সরকারের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা, কূটনৈতিক ব্যর্থতাও এজন্য দায়ী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পদস্থ ব্যক্তিদের বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে সরকারকে বিব্রত করতে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। স্থগিত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকর করতে বলা হলে এলজিইডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে এটা বাস্তবায়ন করতে বলেন। সৈয়দ আশরাফ এক বক্তৃতায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা পরাক্রমশালী কাউকে বাংলাদেশ খবরদারি করতে দেবে না।
জিএসপি স্থগিতে ক্ষতির মুখে ১২ খাত : এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা স্থগিতে বিপদে পড়তে যাচ্ছে দেশটিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া বাংলাদেশের ১২টি শিল্পখাত। এসব খাতের পণ্যগুলোকে অতিরিক্ত শুল্ক দিয়ে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে হবে। ফলে শুল্কের এ বোঝা নিয়ে বিশ্ব রফতানি প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।
জানা গেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত উল্লেখযোগ্য কোনো জিএসপি সুবিধা পায় না। সে জন্য জিএসপি প্রত্যাহারে তৈরি পোশাক খাত সরাসরি ক্ষতির শিকার হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিরা। তবে পোশাক শিল্প উল্লেখযোগ্য শুল্ক সুবিধা না পেলেও দেশটিতে জিএসপি সুবিধা প্রাপ্তি রফতানি পণ্যের মধ্যে প্লাস্টিক, সিরামিক, তামাকজাত ও পাদুকাসহ ১২টি পণ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি বাতিলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এসব খাত। রফতানিকারকরা বলছেন, বিশ্বের ১২৭টি দেশ যুক্তরষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা পায়। জিএসপি স্থগিতে বাংলাদেশ রফতানিকারকরা সেসব দেশগুলোর সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতায় পড়বে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় হওয়া উল্লেখযোগ্য দুটি খাত হলো প্লাস্টিক ও সিরামিক। অন্য আরও পণ্যের মধ্যে রয়েছে মাছ, পাদুকা, সবজি ও ফল থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য, তামাক, শতরঞ্জি, হেডগিয়ার, পাখির চামড়া ও পালক, মানুষের চুল, ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য এবং খেলনা। জিএসপি সুবিধা পাওয়া এসব পণ্য রফতানির পরিমাণ কয়েক বছর ধরে ক্রমেই বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যারা রফতানি করেন, তারা প্রত্যেকেই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়ার কারণে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে সেসব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে কেন্দ্র করেই পণ্য উত্পাদন করে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, গত ২০১১-১২ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্লাস্টিক পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশের আয় হয় ২০ লাখ ডলার। পরবর্তী ২০১২-১৩ অর্থবছরের মাত্র ১১ মাসেই রফতানি আয়ের এ পরিমাণ বেড়ে ৩০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যায়। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, জিএসপি সুবিধা স্থগিত হওয়ায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন ও ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। কয়েক বছর হলো দেশগুলোর কয়েকটি শিল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্র অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা প্লাস্টিক রফতানির পরিসর বাড়ানোর ক্ষেত্রে যে সুযোগ সৃষ্টি করছিলেন, তা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি সুবিধা স্থগিতে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে প্লাস্টিক পণ্যের রফতানি বাজার দিন দিন ব্যাপক হারে সম্প্রসারিত হচ্ছিল। দেশটির এ সিদ্ধান্তে শিল্পটি পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বড় ধরনের হোঁচট খেল। এর ফলে দেশের রফতানি আয় কমে আসবে।
প্লাস্টিক পণ্যের পাশাপাশি সিরামিক পণ্য রফতানিরও একটা বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে ২০১২ সালে ৫৭ লাখ মার্কিন ডলারের সিরামিক পণ্য রফতানি করা হয়েছিল। এর আগের বছর এই রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬২ লাখ ডলারের। এসব পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। কিন্তু এখন থেকে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। ফলে এ খাতের উত্পাদকরা মনে করছেন, সিরামিক পণ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাবে। এরই মধ্যে মার্কিন ক্রেতারাও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হারে দাম কমিয়ে দিয়েছে বলে এ খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
একইভাবে গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১ কোটি ১০ লাখ ডলারের টোব্যাকো রফতানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই খাত জিএসপি সুবিধা সরাসরি উপকারভোগী। জিএসপি বাতিলে টোব্যাকো পণ্যকে শুল্ক কর মিলিয়ে ৩৫ শতাংশের বেশি পরিশোধ করতে হবে। এ অবস্থায় কোনোভাবেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয় বলে মনে করেন এ খাতের উদ্যোক্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে খেলনার বিশাল বাজার। বর্তমানে ৮০ শতাংশ চীনের প্রস্তুতকারকদের হাতে থাকলেও এ বাজার ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কাজ শুরু করে কয়েক বছর ধরে সাফল্যও পাচ্ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, জিএসপি স্থগিতের সিদ্ধান্তে এ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পাদুকা, মাছ, পাখির চামড়া ও পালক এবং মানুষের চুল রফতানিতে প্রবৃদ্ধিসহ ২০১২-১৩ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) ৪৮৬ কোটি ৬০ লাখ ৪৪ হাজার ৩১৫ ডলারের রফতানি আয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। গত ২০১১-১২ অর্থবছরের একই সময়ে আয়ের পরিমাণ ছিল ৪৬৩ কোটি ৬৪ লাখ ২৮ হাজার ৪১৫ ডলার।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের ‘৭৪-এর বাণিজ্য আইন অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা দিতে জিএসপি চালু হয়। ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি এটি কার্যকর হয়। জিএসপির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচ হাজার পণ্য রফতানির সুযোগ পায় উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশ। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৪০ কোটি ডলারের। এর মধ্যে বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করে ৪৯০ কোটি আর আমদানি করে ৫০ কোটি ডলারের পণ্য।

>