শনিবার , ১৬ই জানুয়ারি, ২০২১ , ২রা মাঘ, ১৪২৭ , ২রা জমাদিউস সানি, ১৪৪২

হোম > জাতীয় > ঠাকুরগাঁওয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা

ঠাকুরগাঁওয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা

শেয়ার করুন

গৌতম চন্দ্র বর্মন
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি ॥
ঠাকুরগাঁওয়ে কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ধানের গোলা। বর্তমানে মাঠের পর মাঠ ধান ক্ষেত থাকলেও অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতে নেই ধান মজুদ করে রাখার গোলাঘর।

একসময় গ্রামাঞ্চলে নামকরা গেরস্ত বললে সবাই বুঝে নিত এমন একজনকে যার মাঠ ভরা ফসল, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ ও গোলাভরা ধান আছে। অথচ এখন তা রূপকথায় পরিণত হয়েছে। সে সময় সমাজের নেতৃত্ব নির্ভর করত কার কয়টি ধানের গোলা আছে, এই হিসাব কষে। কন্যা পাত্রস্থ করতেও বর পক্ষের বাড়ির ধানের গোলার খবর নিত কনে পক্ষের লোকজন, যা এখন শুধু কল্পকাহিনী।

সে সময় ভাদ্র মাসে কাদা পানিতে ধান শুকাতে না পেরে কৃষক ভেজা আউশ ধান রেখে দিত গোলা ভর্তি করে। গোলায় শুকানো ভেজা ধানের চাল হতো শক্ত। কিন্তু বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে গ্রামীণ জীবনের চালচিত্র।

বাঁশ, বাঁশের বাতা ও কঞ্চি দিয়ে প্রথমে গোল আকৃতির গোলা তৈরি করা হতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বর্গ অথবা আয়তক্ষেত্র আকারে গোলা তৈরি করা হতো। এর মুখ বা প্রবেশপথ রাখা হতো বেশ উপরে যেন চোর-ডাকাত চুরি করতে না পারে। বর্ষার পানি ও ইঁদুর যাতে ঢুকতে না পারে, সেজন্য গোলা বসানো হতো উঁচুতে। তাই এটি দেখা যেত অনেক দূর থেকে। আর মই বেয়ে গোলায় উঠে ফসল রাখতে হতো।

একেকটা গোলা নির্মাণ খরচ পড়ত তার আকার ও শ্রমিক কত লাগবে, তার ওপর নির্ভর করে। গোলা নির্মাণ করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় আগে দক্ষ শ্রমিক ছিল। এখন আর গোলা নির্মাণ শ্রমিকদের দেখা মেলে না। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তারাও বদলেছেন পেশা।

পীরগঞ্জ উপজেলার ঘিডোব গ্রামের কৃষক প্রদিপ জানান, কৃষক পরিবারে তার জন্ম, নিজেও কৃষিকাজ করেন। গোলাগুলো তাদের পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে। দাদার আমল থেকে তিনি দেখে আসছেন এগুলো। ধান রাখার পাশাপাশি ঐতিহ্য রক্ষায় এখনও রেখে দিয়েছেন।

রাজকুমার জানান, ৪০-৪৫ মণ ধান রাখার একটি গোলা তৈরি করতে ৭-৮ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে ফসল রাখা অনেকটাই নিরাপদ। গোলার নিচের ফাঁকা স্থানে মাচা করে রাখা যায় ছাগল, হাঁস, মুরগিও। ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে কৃষকের ঘরে ঘরে একসময় গোলায় ধান রাখা হতো। এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না, বিলুপ্তির পথে গোলার সে ঐতিহ্য।

এখনো স্মৃতি হিসেবে কোনো কোনো কৃষক বাড়ির উঠানে রেখে দিয়েছেন গোলা। তবে গোলাগুলোতে ধান রাখেন না তারা। তাদেরই একজন পরেশ মন্ডল জানান, এখন আর গোলার প্রচলন বা কদর নেই। ড্রাম-বস্তায় ধান রাখেন। মূলত যে ধান পান, তা মৌসুমর শুরুতেই বিক্রি ও খেতেই ফুরিয়ে যায়। তবুও অযতœ-অবহেলায় বাড়িতে রেখে দিয়েছেন গোলা। একদিন এভাবেই শেষ হয়ে যাবে।

বয়োবৃদ্ধ কৃষক শান্ত রায় জানান, আগে গোলাতেই ধান রাখতেন। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গোলা ছিল। নাতিদের কাছে বললে তারা মনে করে এটি রুপকথার গল্প মাত্র। আর জেলার সচেতনমহল মনে করেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় ছুয়েছে কৃষক ও কৃষকের পরিবারদেরকেও। তাই হয়তো চাকচিক্য ও বিলাসী জীবন তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে ঐতিহ্যের কথা।

>