বুধবার , ৩রা মার্চ, ২০২১ , ১৮ই ফাল্গুন, ১৪২৭ , ১৮ই রজব, ১৪৪২

হোম > শীর্ষ খবর > ধরা ছাড়ার বাণিজ্যে ফেঁসে গেলেন এসআই হেলাল

ধরা ছাড়ার বাণিজ্যে ফেঁসে গেলেন এসআই হেলাল

শেয়ার করুন

এম. মতিন
চট্টগ্রাম ॥
চট্টগ্রাম মহানগরের ডবলমুরিং’র থানা এলাকায় একটি তুচ্ছ ঘটনায় একজন এসআই
এক স্কুলছাত্র ও তার মা-বোনকে মারধরসহ শারিরীক ভাবে লাঞ্চিত করেন এবং তার মা ও বোনকে আটক করে থানায় নিয়ে গেলে লজ্জা ও ঘৃণায় ওই ছাত্র আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় ওই এসআই হেলাল খান ক্লোজড হয়।

জানা গেছে, ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবারও ডবলমুরিংয়ের বাদামতলী বড় মসজিদ গলিতে মারুফ নামের এক তরুণের উপর চড়াও হয় কাশেম নামের একজনসহ হেলাল খানের দু’জন সোর্স। এ দু’জন সোর্স দশম শ্রেণি পড়ুয়া তরুণ মারুফ, তার মা রুবি আক্তার ও বোন নেহাকে মারধরসহ শারিরীকভাবে লাঞ্চিত করেন। এর মাঝে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেন কন্সটেবল থেকে ডিপার্টমেন্টল প্রমোশন পেয়ে এসআই হওয়া হেলাল খান।

সোর্সদের সাথে যোগ দিয়ে এ হেলাল খানও মারুফসহ তার মা বোনকে বেদম পিটিয়ে আহত ও লাঞ্চিত করেন। মারুফ পালাতে পারলেও পায়ে ধরেও হেলাল খানের কাছ থেকে নিস্তার পায়নি মারুফের মা বোন। তাদেরকে টেনে হিঁছড়ে সেই সাদা রংয়ের নোহা গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে মা বোনের এমন লাঞ্চিত হওয়ার ঘটনা ও থানায় নেওয়ার অপমান সহ্য করতে না পেরে পাশের করিম চাচার ঘরে ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেন ১৬ বছরের তরুণ সাদমান ইসলাম মারুফ। এ নিয়ে বাদামতলি এলাকায় এসআই হেলালের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন এলাকাবাসী।

এলাকাবাসী জানান, এসআই হেলালের দাবিকৃত ১ লাখ টাকা না দেয়ায় মারুফের মা বোনকে গাড়তে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এটি বুঝতে পেরে এবং অপমান বোধ করে মারুফ আত্মহত্যা করেছেন। তবে কেউ কেউ বলছেন- মারুফকে উপর্যুপরি মেরে পা ভেঙে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

অনুসন্ধানে করে জানা যায়, উপ-পরিদর্শক (এসআই) হেলাল খান ডবলমুরিং থানার ‘সিভিল টিম’ নৈরাজ্যের মুল হোতা। এ সিভিল টিমের মুল কাজ হলো, নিরহ মানুষকে ধরে গাড়িতে তুলে ইয়াবা দিয়ে মামলা দিবে বলে আটক করে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। হেলাল খানের অন্যতম সহযোগী এসআই রাজীব কান্তি দে বায়েজিদ থানায় থাকতে তেল চুরির ঘটনায় ক্লোজড হয়। তারও পরে বিদেশী এক নাগরিককে মদ দিয়ে ফাঁসানোর দায়ে একবার ক্লোজডও হয়েছিলেন। এ রাজিব কান্তি দে আগ্রাবাদের হাজীপাড়ার আবুল সওদাগরের নাতি বাদশার ছেলে আরিফ কাছ থেকে ২০ পিস ইয়াবা জব্দের পর ৯০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেন।

পুলিশের একটি সুত্র জানায়, হেলাল খান ছিলেন পুলিশের একজন কন্সটেবল। সেখান থেকে ডিপার্টমেন্টল প্রমোশন পেয়ে প্রথমে এএসআই এবং পরে এসআই পদ লাভ করেন। দেড় বছর আগে ডবলমুরিং থেকে বদলি হয়ে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় যোগ দিয়েও টিকতে পারেননি। কয়েকমাস পর ফের যোগ দেন ডবলমুরিং থানায়। সেই থেকে এসআই হেলাল খান ডবলমুরিং থানায় আছেন এবং ‘সিভিল টিম’ নিয়ে ডবলমুরিং জুড়ে চষে বেড়ান।
গতকাল শুক্রবার ১৭ জুলাই এদিকে বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাইয়ের মারুফের আত্মহত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই হেলাল খান সিভয়েসকে বলেন, ‘ঘটনাস্থলে যাওয়া মাত্র আমার উপর মারুফ ও তার মা বোন হামলা চালায়। পরে থানা থেকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আসলে তাদের উপরেও হামলা চালানো হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির মধ্যে মারুফের মা বোন আঘাতপ্রাপ্ত হলে তাদেরকে চিকিৎসা দিতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এরমধ্যে খবর পাই মারুফ নামের ছেলেটি আত্মহত্যা করেছে। এখন পুরো বিষয়টি স্যাররা দেখছেন। এ বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে চাইনা। আমি আর কিছু জানি না।’

গতকাল শুক্রবার ১৭ জুলাই সকালে সরেজমিনে বাদামতলি মসজিদ গলিতে গিয়ে দেখা যায়, মারুফের মা বোন বারবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন। কারো কোনো হুঁশ নেই। ছেলের শোকে কাতর হয়ে পাগল প্রায় মারুফের মা। আত্মীয় স্বজনরা মারুফের মা বোনকে শান্তনা দিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছেন। আত্মীয় স্বজন ও পাড়ার লোকজনও কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। সবার একটিই কথা। মারুফ কোনো খারাপ ছেলে ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি লাকি প্লাজায় থাকা প্রতিবেশীর ক্রোকারিজের দোকানে কাজ করতো। তার সাথে কেন এমন হলো? এ দায় কে নিবে? মারুফের মা বোনের এখন কি হবে?

ঘটনাস্থলে থাকা মারুফদের প্রতিবেশী রুবিনা আক্তার, রোকসানা আক্তার, জাহিদ ফজল, মামা তাহের ও নানা মুক্তিযুদ্ধা শফিক আহমেদ মুন্সী জানান, দুজন সোর্স গলিতে উঁকিঝুঁকি মারলে মারুফ তাদের লক্ষ করেন এবং তাদের সাথে মারুফের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে সোর্সদের সাথে মারুফের মারামারি হয়। এরমধ্যেই হেলাল খান সাদা পোশাকে এসে মারুফকে মারধর করেন এবং মারুফকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে মারুফের মা বোনসহ গলির লোকজন বাধা দিলে তাদেরকে মারধর করেন হেলাল খান।

সোর্সের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে আসামি ধরা-ছাড়ার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম মহানগরের ডবলমুরিং’র থানার এসআই (ক্লোজড) হেলাল খানের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি চিহ্নিত মাদক কারবারিদের মদদ দেওয়া, সাধারণ মানুষকে বিনা ওয়ারেন্টে আটক করে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে জেলে পাঠানোর ভয় দেখানো এবং পরবর্তাতীতে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে ‘ডিপার্টমেন্টাল এসআই’ হিসেবে পরিচিত হেলাল খানের বিরুদ্ধে।

তার এসব অপকর্মে ছায়ার মতো পাশে থাকতেন রাজিব কান্তি দে ও সবুজ নামের ডবলমুরিংয়ের অপর দুইজন এসআই ও তার পোষ্য সোর্সরা। চট্টমেট্টো-হ সিরিয়ালের ৫১০৬৪৯ নম্বরের একটি সাদা নোহা গাড়ি ব্যবহার করে হেলাল খান তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ডবলমুরিং এলাকা চষে বেড়াতেন।

জাহিদ ফজল নামে এক যুবক বলেন, ‘ঘটনার একপর্যায়ে মারুফ মাটিতে লুকিয়ে পড়লে এসআই হেলাল খান আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন। মারুফকে ক্ষমা করতে ১ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অপারগতা জানালে মারুফের মা বোনকে টেনে হিছড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এদিকে মারুফ সেটি শুনে রাগে ক্ষোভে অপমানিত হয়ে ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে ডবলমুরিং থানার ওসি সদীপ কুমার দাস ও পরিদর্শক (তদন্ত) জহির হোসেনকে পাওয়া যায়নি। সদীপ কুমার দাস অসুস্থতার দোহাই আর জহির হোসেন ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে কথা বলেনি।

এদিকে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (ডবলমুরিং জোন) ও ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য সীমা চাকমা বলেন, ‘ঘটনার রহস্য বের করার জন্যই আমাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা তদন্ত পূর্বক একটি প্রতিবেদন নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম জোন) স্যার বরাবর পাঠাবো। এরপর স্যাররাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।’

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম জোন) ফারুক-উল হক বলেন, ‘তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে যদি কারো দোষত্রুটি পাওয়া যায় তাহলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ যদিওবা ঘটনার পরপরই এসআই হেলাল খানকে ক্লোজড করা হয়।’

উল্লেখ্য, মারুফের আত্মহত্যার পর এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়ায় নগর পুলিশ হেলাল খানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। হেলাল খানকে সাময়িকভাবে ক্লোজড করা হয়। এবং ডবলমুরিংয়ের এসি শ্রীমা চাকমা ও ডবলমুরিংয়ের পরিদর্শক জহির হোসেনকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই সাথে ১২ ঘন্টার মধ্যে মারুফের আত্মহত্যা বিষয়ে তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

>