সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > জাতীয় > নির্বাচন নিয়ে সরকারেই ধূম্রজাল

নির্বাচন নিয়ে সরকারেই ধূম্রজাল

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ধূম্রজাল রয়েছে খোদ সরকারেই। এ পর্যন্ত নির্বাচনের দিনক্ষণ বা পদ্ধতি নিয়ে সরকারের কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেই। সরকারের মন্ত্রীরা এ বিষয়ে যার যার মতামত দিয়ে যাচ্ছেন। একই ভাবে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যেও নির্বাচন প্রশ্নে স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী অনুযায়ী নির্বাচন হলে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে নির্বাচনকালীন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই তার পদে থাকবেন। আর সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচন হলে ২৪শে জানুয়ারি সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তবে এই সময়ে নির্বাচন করার বিষয়ে সংবিধানে কোন নির্দেশনা নেই। এতদিন আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলে আসছিলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও নির্বাচন প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, সংবিধান থেকে এক চুলও নড়া হবে না। যদিও আগে একবার তিনি এ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম এক অনুষ্ঠানে জানান, সংসদের আসন্ন অধিবেশনে আইনমন্ত্রী অন্তর্র্বতী সরকারের রূপরেখা তুলে ধরবেন। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি বিরোধী দলের প্রতিও আহ্বান জানান। তবে গতকাল আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জানিয়েছেন, নির্বাচনের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই। এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপও নেয়া হবে না। তিনি বলেন, সংবিধানেই বলা আছে যে নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের কাজ হলো নির্বাচন পরিচালনা করা। আর নির্বাচনকালীন সরকারের কাজ হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ করা, তারা কোন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানে কোন সংশোধনীর প্রয়োজন নেই। আর এরকম কোন পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে না। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে না পরে নির্বাচন হবে এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, এটি সময়ই বলে দেবে। এ বিষয়ে শনিবার এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক, বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, অন্তর্র্বতী সরকারের রূপরেখা নিয়ে নির্বাচনের আগে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে এই দিন অন্য এক আলোচনা অনুষ্ঠানে দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, অন্তর্র্বতী সরকারের বিষয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই।
সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার একটি চিন্তা রয়েছে। এ নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনাও হচ্ছে। সূত্রটির দাবি, দলীয় সরকারের বাইরে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হলে সরকারের মেয়াদ পূর্তি করা প্রয়োজন। এছাড়া সরকারের মেয়াদ তিন মাস বাড়লে সরকারের অসমাপ্ত বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ শেষ হবে এবং তা নির্বাচনী প্রচারণায় ইতিবাচক ফল নিয়ে আসবে। যদিও সরকারি দলের নেতাদের একটি অংশ এমনটি মনে করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন করতে হলে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সংসদ ভেঙে দিতে হবে। বর্তমান সংসদের কার্যকালেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, তত্ত্বাবাধায়ক বিধান থাকার সময় সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের বিধান ছিল। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে তা বাতিল করা হয়েছে। বর্তমান সংশোধনী অনুযায়ী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। তিনি বলেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে নির্বাচন করতে হলে এখনই সংবিধান সংশোধন করতে হবে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন করতে হবে। আর মেয়াদ বাড়াতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তবে তিন সপ্তাহ বা তিন মাস বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার জন্য যদি সংবিধান সংশোধনের মতো ছেলেমানুষি চিন্তাভাবনা হয়ে থাকে তাহলে তা সংবিধান অবমাননার শামিল। তিনি বলেন, সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালে প্রথম সংসদের মেয়াদ প্রায় দু’বছর বাড়ানো হয়েছিল। এ মেয়াদ বাড়ানোর অভিজ্ঞতা আওয়ামী লীগের জন্য নিশ্চয়ই পুনরাবৃত্তি করার মতো সফলতা বয়ে আনেনি।
নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের ১২৩ নম্বর অনুচ্ছেদের ৩(ক)-তে বলা হয়েছে- ‘সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে। একই অনুচ্ছেদের ৩(খ)-তে বলা হয়েছে- মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ বর্তমান সংসদের মেয়াদ আগামী বছরের ২৪শে জানুয়ারি পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যেই নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বাধ্যবাধকতা থাকার কারণেই সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে নির্বাচন নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। এতদিন রাজনৈতিক কারণে নির্বাচন নিয়ে কথাবার্তা বললেও এখন কার্যতই একটি রূপরেখার প্রয়োজন পড়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করতে হলেও এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিষয়টি সংবিধানে পুরো স্পষ্ট নয় বলে দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাতে আইনমন্ত্রীর ইন্দিরা রোডের বাসায় একটি অনির্ধারিত বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা। সূত্রমতে প্রধানমন্ত্রীর গোচরেই এই বৈঠকটি হয়। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ও এবং সংবিধান সংশোধন বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় আলাদাভাবে কাজ করছে বলেও সূত্র জানিয়েছে। তবে দলীয় ও সরকারি পর্যবেক্ষণে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে এ পর্যন্ত জোরালো কোন মত পাওয়া যায়নি। নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন করার বিষয়ে মতামত দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা। যদিও নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামোর বিষয়ে তাদের কাছে স্পষ্ট কোন ধারণা নেই। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য নির্বাচন কমিশন বা প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। এদিকে নির্বাচনের তারিখের বিষয়ে গতকাল নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ জানিয়েছেন, নির্বাচন দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই। তবে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারবে কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।

>