মঙ্গলবার , ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ , ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ৮ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > পথে পথেই জীবন !! রাতের পাপিয়া

পথে পথেই জীবন !! রাতের পাপিয়া

শেয়ার করুন

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ যৌনতাকে পুঁজি করে ব্যবসা রাজধানীতে নতুন কোনো কিছু নয়। অমর্যাদাকর এই যৌন বাণিজ্য বন্ধে বহু বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এই বাণিজ্য। ফলে এর সঙ্গে জড়িত নারী ও শিশুরা অবহেলিত থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে যৌন বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে, তেমনি বদলে যাচ্ছে ব্যবসার কৌশলও। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যসহ নামধারী কিছু সাংবাদিকও নিয়ন্ত্রণ করছে যৌন বাণিজ্য। নারী ও শিশুর শরীরকে পণ্য করে রাজধানীতে এই খাত থেকে সপ্তাহে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট করা হচ্ছে। যৌন বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক নিয়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে নানা চমকপ্রদ তথ্য।

সরেজমিন

রাত সাড়ে ১১টা। স্থান বিজয়নগর। রাস্তার ওপর যানবাহনের সংখ্যা কম, কারণ পরদিনই বিরোধীদলের হরতাল। শহর জুড়ে নিরাপত্তা ছিল চোখে পড়ার মতো। ফুটপাতের ওপর কারও উপস্থিতি তেমন নেই। কিছুণ পানির ট্যাঙ্কের সামনে অপো, কথা হয় এক নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। বলছিলেন, “এদিকে রাত ১২ টার আগে কারও দেখা পাওয়া যায় না। রাত গভীর হলে দুই-একজন এদিকে আসে।” কথা বলতেই বলতেই দূরে কারও আনাগোনা চোখে পড়ে।

একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কথা হয় সীমা নামের প্রায় পঁচিশ বয়সী সেই যৌনকর্মীর সঙ্গে। শুরুতে আপত্তি করলেও পরে সহজভাবে কথা বলেন। তিনি জানালেন, “আইজক্যা তিন বছর ধরে এই কাম করি। প্রত্যেকটি কামের জন্য ৫০ টাকা পাই, কেউ খুশি হলে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দেয়। রাইতে ১১ টায় আসি, ভোরের আগেই চলে যাই। পরতেক দিন (দৈনিক) সাড়ে ৭শ’ টাকা থেকে ১ হাজার টাকাও পাই। যাওয়া-আসা খরচ আর খাওয়া বাদ দিলে ৫শ’ টাকার বেশি থাকে না। মাঝে মইধ্যে শরীর খারাপ হলে কামে আইতে পারি না।” অপর এক প্রশ্নের জবাবে সীমা আরও জানায়, “রাস্তায় অনেক ঝামেলা। এলাকার মাস্তান আছে, তারা কাম করলে টাকা দেয় না। টাকা না দিলে এলাকা থেকে মাইরা বের কইরা দেয়। পুলিশ সবসময় ধরে না, ধরলে দুই-একদিন থাকা লাগে। গতর-খাটার ট্যাকা পুলিশরে না দিয়া দুইদিন জেলখানায় থাকা ভাল।”

শুধু পল্টন-বিজয়নগর নয়, রাজধানীজুড়েই রয়েছে ‘সীমা’দের আনাগোনা। রাতভর এই রাজধানীতে ‘সম্ভ্রম’ হাতের মুঠোয় নিয়ে ‘পরপুরুষ’-এর অপোয় থাকে প্রায় দেড় হাজার যৌনকর্মী, জীবিকার প্রয়োজনে। নগরীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা, বাস-ট্রাক স্ট্যাণ্ড, নৌ ঘাট, রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় রাতভর তাদের দেখা মেলে। সন্ধ্যার আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাতভর যে যার মত করে ‘খদ্দের’ ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অর্থ উপাজনের জন্য। দিনের আলোয় ব্যস্ততম যেখানে পা রাখার জায়গা থাকে না, অন্ধকারে সেখানে ভীড় জমায় যৌনকর্মীরা। আবাসিক এলাকার গলি থেকে ব্যস্ততম সড়ক-দ্বীপ সবখানেই তাদের দেখা মেলে।

সরকারি-বেসরকারি একাধিক সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্যানুযায়ী, নগরীজুড়ে ভাসমান প্রায় ৫ হাজার যৌনকর্মী রয়েছে। কারও কারও মতে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

অনুসন্ধানে মিলেছে, ভাসমান যৌনকর্মীরা গড়ে ৫ দিন পথে দাঁড়ায়। বাকি দুইদিন অসুস্থতায় কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটে। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ভাসমান যৌনকর্মী পথে নামে জীবিকার জন্য। একজন যৌনকর্মী একবার মিলিত হওয়ার জন্য ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকা পর্যন্ত পেয়ে থাকে। দৈনিক গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পর রাত শেষে আয় দাঁড়ায় এক হাজার টাকা পর্যন্ত। সপ্তাহান্তে এক-দুইদিন রোজগার বেশি বা কম হয়। আর প্রতি ১৫ দিনে একবার পুলিশ কিংবা সন্ত্রাসীর হাতে ছোট-বড় হামলার শিকার হতে হয়। নগরীর ভাসমান যৌনকর্মীদের প্রায় অর্ধেক কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। যৌনরোগ তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। অন্যদিকে কমপে ৩৫ শতাংশ যৌনকর্মী বিভিন্ন প্রতারণা-ধর্ষণ ও সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে এ পথে পা বাড়ায়। এছাড়া এই ভাসমান যৌনকর্মীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ‘হিজড়া’ রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় আড়ালে-আবডালে রুটিরুজির ধান্ধা করে অনেকেই।

রাত সোয়া একটা। হাইকোর্ট চত্ত্বরের প্রধান ফটকের সামনে। চারপাশে কয়েকটি রিকশা, আর দুই একটি খাবারের দোকান। বেশ কয়েকজন শুয়ে আছেন ফুটপাতের ওপর। খাবারের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক যৌনকর্মী, নাম পারুল। জাতীয় ঈদগাহ মাঠের সামনে গাছের নিচে ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করে প্রায় ৩০ বছর বয়সী এই নারী। সাবলীলভাবে শুরু করলেও তার কণ্ঠ থেমে আসে একসময়, “ছেলেবেলায় বাড়ি থেকে বের আসার পর একটি এতিমখানায় আশ্রয় হয়েছিল। কিছুদিন থাকার পর সেখানকার কিছু মানুষ যৌতুকবিহীন বিয়ের কথা বলে আমাকে ৩৫ বছর বয়সী একজনের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। আমার বয়স তখন ১২ থেকে ১৩ বছর। আমি সেখান থেকে পালিয়ে আসি।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে ঘামছিলেন শ্যামবর্ণের এই ময়েটি। ধাতস্থ হয়ে আবার শুরু করলেন, “আরও ৭-৮ বছর পর, তখন একা থাকতাম। একদিন এক সন্ত্রাসী আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে ধর্ষণ করে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, রক্তাক্ত অবস্থায় একটি কিনিকে সেই আমার চিকিৎসা করায়। পরে আমার সম্পর্কে বাজে কথা ছড়ায়, পরিবার থেকেও আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। কিছুদিন পর এক মাদকাসক্তের সঙ্গে বিয়ে হয়, সে ঘরে খারাপ লোকদের নিতো। আমি রাজি না হলে মারধর করতো। প্রায় ৬ মাস পর আমি প্রায় ৬ বছর আগে এই পথে নামি। গতর খাটাইয়্যা যদি খাইতে হয়, তাইলে স্বামী দিয়া কী করবো? এখন সারাদিন কাজ করি, সন্ধ্যার এইহানে আসি। রাতভর রাস্তায় থেকে ১২শ’-১৫শ’ যা পাই ভালভাবে চলতে পারি। সপ্তাহে একদিন স্বামীর কাছে যাই।”

এ প্রসঙ্গে রাত দেড়টার দিকে হাইকোর্টের সামনে দায়িত্বরত এক টহল পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলছিলেন, ‘যৌনকর্মীদের আনাগোনা থাকে। আমরা বাধ্য না হলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করি না। আবার সবসময় তাদের ছাড় দেয়ারও সুযোগ থাকে না। কারণ এই যৌনকর্মীদের কায়েন্টরা অধিকাংশই মাদকাসক্ত কিংবা ছিঁচকে অপরাধী। তাদের ধরার জন্য অনেক সময় রেইড দিলে যৌনকর্মীরা সেখানে পড়ে যায়।”

>