মঙ্গলবার , ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ , ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > প্রকৌশলী প্রীতির স্বপ্ন চুরমার

প্রকৌশলী প্রীতির স্বপ্ন চুরমার

শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ॥ ‘আমি যাচ্ছি বাবা। আমার জন্য টেনশন করো না। প্রার্থনা করো। শরীরের দিকে খেয়াল রেখো। মাকে বলো আশীর্বাদ করতে।’ মোবাইল ফোনে বাবা দিলীপ কুমার দাশের সঙ্গে শেষ কথা বলেছিলেন প্রীতি দাশ (২৪)। রাত তখন ১১টা। চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে নিজের মোবাইলে ফোন করেছিলেন পরিবারকে। পাশে ছিলেন স্বামী ও তাদের দুই ঘনিষ্ঠজন। ঈদের ছুটিতে হাসিমুখে ঢাকায় ফিরছিলেন তারা। কিন্তু কে জানতো শুভযাত্রার পথেই হয়তো তাদের ওপর নেমে আসবে কোন দুর্ঘটনা।
যেখানে প্রাণ হারাতে হবে একজন তরুণ প্রকৌশলীকে। স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে দুটি পরিবারের। নেমে আসবে শোকের ছায়া। বাবার আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠবে বাড়ির পরিবেশ। ঈদের পরদিন গত শনিবার রাতে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে দুর্বৃত্তদের ছোঁড়া ইটের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন তরুণ সম্ভাবনাময়ী প্রকৌশলী প্রীতি দাশ। এই সময় তিনি স্বামীর সঙ্গে তার কর্মস্থল ঢাকায় যাচ্ছিলেন। রাতের তূর্ণা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ওই এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার সময় হঠাৎ করে জানালার বাইর থেকে জোরে তাকে লক্ষ্য করে ইট ছুঁড়ে মারে বখাটে-দুবৃর্ত্তরা। মুহূর্তেই সেই ইট এসে তার মাথায় লাগে। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে ট্রেন থামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সীতাকুন্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। এরপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রীতি দাশের এমন মৃত্যুর খবর চট্টগ্রাম শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়লে সচেতন মহলে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। তারা জানান, এমন মৃত্যু কখনই কাম্য নয়। যারা কাজটি করেছে তারা ঘৃণ্য হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে। তরুণ প্রকৌশলী প্রীতির মৃত্যুতে তার নিজের ও স্বামীর বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গতকাল বিকালে কর্ণফুলী থানার জামতল বাজার এলাকায় বাবার বাড়িতে গিয়ে চোখে পড়েছে আহাজারির চিত্র। শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছেন তার পিতা-মাতা, ভাইসহ পরিবারের সবাই।
মেয়ের মৃত্যুর খবর সবার আগে জেনেছেন বাবা দিলীপ কুমার দাশ। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে মানবজমিনকে বলেন, ‘ঘটনার দিন রাত ১১টায় চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে উঠার আগে আমার মেয়ে ফোন করেছিল। বলেছিল ঢাকায় পৌঁছে সে ফোন করবে। তার জন্য যেন কোন টেনশন না করি। বারবারই বলেছিল তার মায়ের দিকে খেয়াল রাখতে। তার জন্য প্রার্থনা করতে। শেষবারের মতো সবার জন্য খোঁজ নিয়েছিল আদরের মেয়েটি।’
খবর পাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বাবা দিলীপ কুমার বলেন, ‘সীতাকুন্ডের ভাটিয়ারিতে দুর্ঘটনা ঘটার পর পথে ট্রেন থামিয়ে ফেলে তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেন কর্তৃপক্ষ। এরপর তাকে মাথায় জখম নিয়ে সীতাকুণ্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেয়ের অবস্থা খারাপ দেখে আমাকে মোবাইল করা হয়। কিন্তু তার স্বামী এই সময় কথাই বলতে পারছিলেন না। পরে তাদের সঙ্গে থাকা মামুন নামের একজন ফোন করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেলে আসতে বলেন। এরপর গতকাল সকালে ডাক্তাররা প্রীতিকে মৃত ঘোষণা করেন।’
প্রীতি দাশের পরিবারের লোকজন জানান, বাবা দিলীপ কুমার দাশের ৪ ছেলের পর একমাত্র মেয়েটির জন্ম হয়। তাই তাকে ঘিরে ছোটবেলা থেকে আগ্রহের কমতি ছিল না। চট্টগ্রামের একটি কারিগরি ইনস্টিটিউট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর পড়ালেখা শেষ হলে তাকে আনন্দের সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের ১৬ মাসের মাথায় অকালে মৃত্যুবরণ করলো মেয়েটি। প্রীতির মায়ের নাম সবিতা দাশ। মেয়ের মৃত্যুর খবর শোনার পর পর একটু পরপরই তিনি জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। গতকাল সকাল থেকেই তাকে দেখা গেলো মেয়ের জন্য বুকফাটা আহাজারি করতে। বলছিলেন, ‘মা আমাকে ছেড়ে কেন চলে গেলি। এমন মৃত্যু আর যেন না হয়।’ একমাত্র বোনকে হারিয়ে চোখের জল ফেলছিলেন ভাই শফিক দাশ। তিনিও একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। বোনকে হারিয়ে তাই তার কষ্টের শেষ নেই। বারবারই বোনের ভেসে উঠা মুখ দেখে তিনি কাঁদছিলেন আড়ালে।
তিনি বলেন, ‘রাতের আঁধারে যারা এমন ঘৃণ্য ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের কাছে বোনহারা একজন ভাইয়ের প্রশ্ন তারা কি আনন্দ পেয়েছেন। বখাটের দল বাইর থেকে ইট ছোড়ার আগে এতটুকু চিন্তা করেনি যে তাদের এমন ন্যক্কারজনক ঘটনায় কারো বিপদ ডেকে আসতে পারে। আমি রেল কর্তৃপক্ষের কাছে এমন ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’
ভাই রাজীব দাশেরও একই দাবি। তিনি বলেন, ‘প্রীতির এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমরা চাই মানুষের মধ্যে বিবেকবোধ জেগে উঠুক। যারা হাসতে হাসতে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঢেলে দেয় তাদের কঠিন শাস্তি চাই। আজ আমরা বোনকে হারিয়ে শোকের সাগরে। বিশ্বাসই করতে পারছি না সে আর বেঁচে নেই। এমন ঘটনার কি কোন প্রতিকার নেই। মৃত্যু কি এতোই শস্তা?’ বোন প্রীতির সঙ্গে মৃত্যুর আগে খুনসুঁটি ছিল ভাই প্রদীপ দাশের। বোন নেই এই কথা মানতে পারছেন না তিনি। আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি হওয়ায় খুব খুশি হয়েছিলেন তার বোনটি। ছোটবেলা থেকেই তার সঙ্গে অন্যরকম এক পারিবারিক সম্পর্ক ছিল বোন প্রীতির। তাই বারবারই বোনের হাসিমাখা মুখটি স্মরণ করে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তা মানুষকে কেন এমন পরীক্ষা দেন জানি না। তার চলে যাওয়া আমাদেরকে ভীষণ একা করে গেছে। তাকে সহজে ভুলতে পারব না। জানিনা পুরো পরিবার তাকে ভুলতে পারবে কিনা। প্রার্থনা করছি বোনটির জন্য। সে জন্য ভাল থাকে।’ প্রীতির স্বামী মিন্টু দাশ চাকরি করছেন বেসরকারি ব্যাংক ডাচবাংলার মতিঝিল শাখায়। স্বামীর উৎসাহে প্রীতি ইঞ্জিনিয়ারিং এর ওপর উচ্চতর শিক্ষা নেয়ার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে। এর আগে দুই বছর চাকরি করেছেন তিনি। দুইজনের বিয়ের বয়স হয়েছিল মাত্র ১৬ মাস। স্ত্রীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্বামী মিন্টু দাশ।
তিনি বলেন, ‘দুবৃর্ত্তদের ছোড়া ইটের আঘাত সরাসরি এসে তার মাথায় লাগে। এতে সে মাগো বলে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। এরপর তূর্ণা নিশীথার লোকজন মাঝপথে ট্রেন থামিয়ে আমাদেরকে সীতাকুন্ড স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। রাতে তার অবস্থার কোন উন্নতি না হলে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে আসি। পরে ডাক্তার তার মৃত্যুর খবর জানান। আমরা চারজন মিলে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় যাচ্ছিলাম। প্রীতি ছাড়াও আমার সঙ্গে আরও দুইজন বন্ধু ছিলেন। দুর্ঘটনার আগে সে একটু ক্লান্ত বোধ করায় ঘুমিয়ে পড়েছিল।’ মিন্টু জানান, বিয়ের পর তারা নগরীর আগ্রাবাদ এলাকার বাসায় থাকতেন। ঈদের ছুটিতে সবাই চট্টগ্রাম এসেছিলেন। মিন্টুর বন্ধু আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছেড়ে ভাটিয়ারি ব্রিজ পার হওয়ার পর ঘটনাটি ঘটেছে। বাইরে অন্ধকার থাকায় কাউকে চিনতে পারিনি। আমরা কেউই প্রীতির মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না।’
জানতে চাইলে রেলওয়ে থানার এসআই ওমর ফারুক বলেন, ‘পারিবারিকভাবে লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘটনাটি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত আকারে জানিয়েছে। একটি বখাটে চক্র রাতের বেলায় ভাটিয়ারি থেকে সীতাকুন্ড রেললাইনের ওই জায়গায় এমন ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। তারা রেললাইনের পাশে থাকা শক্ত পাথর যাত্রীদের ছুঁড়ে মারছে। পাথর মেরে আবার মুহূর্তেই তারা সটকে পড়ে।

>