সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > অর্থ-বাণিজ্য > বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াচ্ছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াচ্ছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল

শেয়ার করুন

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ত্রিপুরা এখন আর পুরোপুরি কৃষিনির্ভর নয়। গত এক দশকে ত্রিপুরায় শিল্পের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের বেশি। ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র মোতাবেক ২০০৪-০৫ থেকে ২০০৮-০৯ এ সময়ে ত্রিপুরার শিল্প খাতে গড়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। শুধু ত্রিপুরা নয়, দারিদ্র্য ও বৈষম্যের শিকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় শিল্পায়ন ও বৈভব বাড়ছে দ্রুত গতিতে।

বিশ্বখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস (পিডব্লিউসি) মনে করে, বিলম্বে হলেও ভারত পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে নজর দিয়েছে। এ অঞ্চলের বাঁশ, রাবার, চা, ফল কৃষিশিল্পের বিপুল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এছাড়া অরুণাচলের ৫০ হাজার মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা, পেট্রল ও গ্যাসের মতো প্রাথমিক জ্বালানির বিপুল উপস্থিতি বাংলাদেশ-মিয়ানমারসহ আসিয়ানভুক্ত দেশের জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়াচ্ছে। এখানকার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও উদীয়মান বাজারে বাংলাদেশী বিনিয়োগকারী ও রফতানিকারকদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা গেলেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে লাধিক কোটি রুপি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে শুধু সড়ক উন্নয়নে রাখা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি ও রেল উন্নয়নে ১৭ হাজার কোটি রুপি। এছাড়া বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যথাসময়ে শেষ করা বাংলাদেশের অবকাঠামো ও সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব নয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যের সরকার এরই মধ্যে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, রেল, সড়ক, নদী ও বন্দর ব্যবহারের আবেদন জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় যে অবকাঠামো সুবিধা গড়ে উঠছে, তার মাধ্যমে এর প্রাকৃতিক সম্পদে বিনিয়োগ ও ব্যবহারের আবেদন জানাতে পারে বাংলাদেশ। গত এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ত্রিপুরা সফরের সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহার করে সেখানে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেন। ভারত সরকার এ প্রস্তাব নিয়ে বর্তমানে পর্যালোচনা করছে।

এসব বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয়। এসব রাজ্যের উন্নতি হলে তাদের আয় বাড়বে, বাড়বে ক্রয়মতা। এটা বাংলাদেশের জন্য সুখবর। এ অঞ্চলের মানুষ বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করবে। কারণ যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি তাদের জন্য সহজ হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে পণ্য রফতানিরও সুযোগ নিতে পারে সেভেন সিস্টার্স।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারতের বাইরেও পণ্য রফতানির সুযোগ নিতে পারে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো। এেেত্র বন্দর সুবিধাসহ পণ্য পরিবহনের সেবা দিয়ে বাংলাদেশও লাভবান হতে পারে।

সেভেন সিস্টার্স— আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, মিজোরাম ও অরুণাচল ভারতের মোট ভূখণ্ডের ৮ শতাংশের অধিকারী হলেও অর্থনীতিতে রাজ্যগুলোর অবদান মাত্র ৩ শতাংশ। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ও সাতটি রাজ্য একই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমল থেকে এ অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে সব ধরনের ব্যবসায়িক ও সামাজিক যোগাযোগ। বিশেষ করে আসাম ও ত্রিপুরার সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ কয়েকশ বছরের পুরনো। আসাম-বেঙ্গল রেল নেটওয়ার্কের আওতায় বাংলাদেশের পুরনো সব বিভাগের সঙ্গে সেভেন সিস্টার্সের রেলওয়ে যোগাযোগ ছিল; যার মাধ্যমে অবাধে পণ্য পরিবহন হতো। ভারত ভাগের পর বাংলাদেশ সেভেন সিস্টার্স থেকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পরও  রাজনৈতিক কারণে এটি আর পুনরুজ্জীবিত হয়নি। বাংলাদেশের সঙ্গে সেভেন সিস্টার্সের বাণিজ্য বাড়াতে হলে আগের সেই যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভারত সরকারও এখন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সড়ক ও নৌপথে  বাণিজ্য সুবিধার প্রত্যাশা করে ভারত। এরই মধ্যে নয়টি স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে দেশটি।

এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশী পণ্যের সর্বপ্রথম গন্তব্য হওয়া উচিদ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো। কারণ এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছের অঞ্চল। এর সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে রেল, সড়ক ও নৌযোগাযোগব্যবস্থা। ভৌগোলিক কারণে স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করা তাদের জন্যও সাশ্রয়ী। ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য দুই দেশই আন্তরিক। উভয় দেশই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়। তবে দুই দেশকেই সংকীর্ণ মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে।

পিডব্লিউসি বলছে, ভারতের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের অসম বাণিজ্য। বাংলাদেশে আমদানিকৃত পণের ১৫ শতাংশ ভারত থেকে এলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যবৈষম্য এখনো প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। এ বৈষম্য কমিয়ে বাণিজ্যিক ভারসাম্য আনতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই সেভেন সিস্টার্সে বাণিজ্য বাড়াতে হবে। এ অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৮০ কিলোমিটারের সীমান্ত এলাকা। ফলে এ ভৌগোলিক নৈকট্য উভয় অঞ্চলের উন্নয়ন অংশীদার হতে সহায়তা করবে।

এরই মধ্যে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চুনাপাথর ব্যবহার করে সিলেটের ছাতকে গড়ে উঠেছে লাফার্জ সিমেন্ট করখানা। রাবারের দ্বিতীয় রাজধানী ত্রিপুরায় যৌথভাবে বিনিয়োগের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের নিটোল-নিলয় গ্রুপ। মিজোরাম বাঁশ উত্পাদনের জন্য বিশ্বখ্যাত। পিডব্লিউসির তথ্য মোতাবেক পৃথিবীর মোট বাঁশের ২০ শতাংশ এবং ভারতের বাজারের ৬৫ শতাংশ মিজোরামের দখলে। এভাবে আসাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল ও মনিপুরের শিল্পের কাঁচামাল ব্যবহার করেও বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা লাভবান হতে পারেন।

এ বিষয়ে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত সিএম শফি সামী বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের অপার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কিছু বাধাও রয়েছে। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বারবার এসব বাধা দূর করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ দিয়ে আসছেন।  ভারতের অভ্যন্তরীণ এ চাপকে বাংলাদেশের পে নিতে হবে। ২০০৭ সালে ভারত সরকার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় বিনিয়োগের জন্য যেসব প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তা বাংলাদেশের জন্যও সম্প্রসারণ করতে হবে। আবার বাংলাদেশ সরকারকেও এসব অঞ্চলে বিনিয়োগের নীতিমালা শিথিল করতে হবে। এরই মধ্যে প্রাণ গ্রুপকে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এভাবে আরো বাংলাদেশী করপোরেট যাদের বিনিয়োগ সমতা আছে, তাদেরও সেখানে যাওয়ার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। তাহলেই বাংলাদেশ এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও কৃষিসম্পদকে  কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের অংশীদার হতে পারবে।

>