বৃহস্পতিবার , ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ , ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৭ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > বানভাসি মানুষের কান্না কেউ শোনে না

বানভাসি মানুষের কান্না কেউ শোনে না

শেয়ার করুন

জেলা প্রতিনিধি, (কুড়িগ্রাম) ॥ বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে, পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ তাদের কান্না কেউ শোনে না।
এমনই কষ্টের কথা জানিয়েছেন কুড়িগ্রামের রাজিবপুরের বন্যার্ত ও নদীভাঙনের শিকার মানুষ।
‘বানের মধ্যে কোটে যাম। সারা দিন নৌকায়। রাইতে ঘরের মধ্যে মাচা করি থাকি। পানি বাড়বাড় নাগছে। আল্লায় জানে আর কত দিন থাকপার পাম।’
কথাগুলো কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের বড়বেড় গ্রামের বেবিরানীর। গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় ব্রহ্মপুত্র নদের ওই চরে গিয়ে দেখা যায়, বেবি রানী নৌকায় বসে কচুর মুখী পরিষ্কার করছেন। পাশে ছোট একটি মেয়ে সুবারানী, ৯ বছর বয়স। স্বামী সুভালাল পেশায় জেলে। মাছ ধরতে গেছেন। সারা দিন মাছ ধরে যা আয় করেন তা-ই দিয়ে তাদের সংসার চলে। পরিবারে আছে আরও এক মেয়ে সোহাগী রানী (২), ছেলে বিপুল (৬) ও লক্ষ্মণ (৪) বছর।
বেবিরানী জানান, গত বুধবার রাতে ঘরে পানি উঠলে চৌকি উঁচু করেন। সারা রাত ঘুম হয়নি। তাদের বাড়ি ছিল ধলাগাছার চরে। কয়েক বছর আগে বসতভিটা নদে ভেঙে গেলে এখানে এসে অবস্থান নেন। একই চরের সুকলালের বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, তারা ৩ সন্তান নিয়ে নৌকায় অবস্থান করছেন। হালগৃহস্থের কাজ করেন তার স্বামী। এ সময় কোনো কাজ না থাকায় জাল নিয়ে মাছ ধরতে নদীতে গেছেন। মাছ ধরতে পারলে সংসার চলে আর না ধরতে পারলে উপোস থাকতে হবে। তার ছেলে রতন জানায়, আমি বড়বেড়চরের লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ালেখা করি। অবসর সময়ে বাবাকে দিনমজুরির কাজে সহযোগিতা করি। বাবার বয়স হয়েছে। এখন আর কেউ তাকে কাজে নিতে চায় না। এ প্রতিনিধিকে রতন জানায়, স্যার, আমার লেখাপড়া শেখার খুব ইচ্ছা।
কির্তনটারীচরে সুরুজ আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী বুচি বিবি সন্তান নিয়ে নৌকায় অবস্থান করছেন। স্বামী সুরুজ আলী রিকশা চালাতে ঢাকায় গেছেন। তিনি বলেন, ‘পানির মধ্যে ছাওয়ালটাক নিয়া ঘরের মধ্যে মাচা করি থাকি। ভয় নাগে। পানি বাড়লে কোটে যাম, কী করম বুঝবার পারছি না। বানের পানিতে ১০টা হাঁস-মুরগি ভাসি গেছে। গরু-ছাগলের খাবার নাই। বড় বিপদে আছি গো, ভাই।’
পাশের বড়বেড়চরে গিয়ে দেখা যায়, প্রবল স্রোতে আ. আজিজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন ভেঙে যাচ্ছে। লোকজন বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছে। চরের আমন ধান ডুবে গেছে। চরের সব বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় সেগুলো বন্ধ রয়েছে। বাড়ি সরিয়ে নেয়ার সময় আজম আলী, বাচ্চু, শাজামাল, খলিল, আনছার আলী বলেন, চারদিকে পানি, কোথায় যাবেন বুঝতে পারছেন না। রাজিবপুর থেকে বড়বেড়চরে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে যাওয়ার পথে দেখা যায়, কাঁচা সড়কের দুই পাশের গ্রামগুলোতে পানি উঠেছে।
লোকজন কলাগাছের ভেলায় চলাচল করছে। গবাদিপশু সড়কে আশ্রয় নিয়েছে। এলাকার বাসিন্দারা জানান, মানুষের চেয়ে গবাদিপশুর সমস্যা বেশি। সর্বত্র পানিতে ডুবে থাকায় ঘাস পাওয়া যায় না।
মোহনগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আনু জানান, বহ্মপুত্র, সোনাভরি, হলহলিয়া, যমুনা নদনদী ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী হয়ে রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে এসে ব্রহ্মপুত্র নদে মিশেছে। প্রতিবছর বর্ষায় বন্যা ও ভাঙন দেখা দেয়। এবারও একই অবস্থা। তার ইউনিয়নের নয়টি ওয়ার্ডের সবগুলোতে পানি উঠেছে। অপরদিকে কোদালকাটি ইউনিয়নের বল্লভপাড়া, শংকরমাধবপুর, উত্তর কোদালকাটির প্রায় ১০০ পরিবারের বসতভিটা পানির স্রোতে ভেসে গেছে। রাজিবপুর উপজেলা ত্রাণ কর্মকর্তা সিরাজুদ্দৌলা জানান, এ পর্যন্ত সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেছে নগদ ২০ হাজার টাকা আর ১০ টন চাল।

>