বুধবার , ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ , ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ৯ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > বিচারকদের জন্য মহিউদ্দিনের ‘ঈদ উপহার’!

বিচারকদের জন্য মহিউদ্দিনের ‘ঈদ উপহার’!

শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ॥ চট্টগ্রাম আদালতে কর্মরত বিচারকদের জন্য ঈদের উপহার হিসেবে ‘সেমাই’ পাঠিয়েছেন সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। সঙ্গে একটি করে ঈদকার্ড।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম আদালতে কর্মরত কমপক্ষে ৭০ জন বিচারকের মধ্যে কাউকে সরাসরি আবার কাউকে কর্মচারীর মাধ্যমে চেম্বারে পৌঁছে দেয়া হয়েছে এ উপহার। তবে চট্টগ্রাম মুখ্য মহানগর হাকিম মো.মশিউর রহমানসহ সাতজন ম্যাজিস্ট্রেট এ উপহার গ্রহণ না করে ফেরত পাঠিয়েছেন।

বিচারকদের জন্য একজন রাজনীতিকের ঈদ উপহার পাঠানোর ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে আইনজীবীদের মধ্যে।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন বলেন, ‘বিচারকদের জন্য ঈদের উপহার পাঠানো এবং সেই উপহার গ্রহণ করা দুটোই দু:খজনক। আমরা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে আগামীকাল (সোমবার) পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। বিচারকদের মধ্যে কারা সেই উপহার গ্রহণ করেছেন সমিতি তা খতিয়ে দেখবে।’

প্রবীণ আইনজীবী, মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘একজন সাধারণ মানুষ আরেকজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন উৎসবে শুভেচ্ছা, উপহার বিনিময় করতেই পারেন। কিন্তু বিচারকদের তো সাধারণ মানুষের বাইরের কেউ ভাবতে হবে। যারা রাজনীতি করেন তাদের উপলব্ধি করা উচিৎ সমাজের ঊর্ধ্বে বিচারকদের স্থান। বিচারকদের সঙ্গে সামাজিকতার কোনো সুযোগ নেই।’

আদালত সূত্রে জানা গেছে, রোববার এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পক্ষ থেকে জেলা ও দায়রা জজ এবং অধ:স্তন আদালত, মহানগর দায়রা জজ ও অধ:স্তন আদালত, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত, মহানগর হাকিম আদালত, বিশেষ জজ আদালত এবং বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের কার্যালয়ে গিয়ে সেমাই ও ঈদ কার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়। এসব উপহার আদালতে নিয়ে যান মহিউদ্দিনের ব্যক্তিগত সহকারী মো.ওসমান।

আদালতে ঈদ উপহার নিয়ে যাবার বিষয়টি কাছে স্বীকার করেছেন ওসমান। তিনি বলেন, ‘এটা নতুন কিছু নয়। সাবেক মেয়রের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই ঈদ উপহার পাঠানো হয়।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিচারকদের কাছে পাঠানো ঈদ কার্ডে সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে ‘শুভেচ্ছা’র কথা উল্লেখ আছে। আর সেমাইয়ের প্যাকেটের উপর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পারিবারিক মালিকানাধীন রয়েল হোটেলের সিল আছে। প্রত্যেক বিচারককে একটি করে কার্ড এবং বড় দু’প্যাকেট (প্রতি প্যাকেটে আবার ছোট দু’প্যাকেট করে) করে সেমাই দেয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের অধীন এক আদালতের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, দুপুরের দিকে অধীনস্থ ওই আদালতের বেঞ্চ সহকারীর হাতে ঈদ কার্ড ও সেমাই পৌঁছে দেয়া হয়। এসময় বিচারক এজলাসেই ছিলেন। এজলাস থেকে নেমে উপহারগুলো দেখেও তিনি সেগুলো নেননি। সেগুলো কার্যালয়েই পড়েছিল।

জেলার এক আদালতের বিচারক সরাসরি গ্রহণ করেছেন ঈদ উপহার। তবে কিছুক্ষণ পরেই বেঞ্চ সহকারীকে ডেকে সেমাইয়ের প্যাকেটগুলো দিয়ে দেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ্ বিচারককে চেম্বারে গিয়ে সরাসরি মহিউদ্দিনের ঈদ উপহার পৌঁছে দেয়ার পর মো.ওসমান যান মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) মো.মশিউর রহমানের চেম্বারে। এসময় মশিউর রহমান উপহারগুলো গ্রহণ না করে তাকে ফেরত নিয়ে যাবার জন্য বলেন। ওসমান সাবেক মেয়রের অনুরোধের কথা বললেও মত পাল্টান নি সিএমএম।

এরপর ওসমান সিএমএম’র অধীনস্থ ৬ জন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপহার নিয়ে যাবার পর তারাও সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।

সিএমএম আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) আবিদুর রহমান বলেন, ‘আমি যতটুকু শুনেছি, সিএমএম স্যার এবং মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটরা কোনো উপহার গ্রহণ করেননি।’

মো.ওসমান বলেন, ‘আমি সিএমএম সাহেবের কাছে ঈদ উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি নেবেন না বলে জানালে আমি বের হয়ে আসি।’

তবে বিচারকদের কাছে ঈদ উপহার পাঠানোর বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট কামালউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর মহিউদ্দিন ভাই জজদের জন্য সেমাই পাঠান। এবার পাঠিয়েছেন কিনা জানি না।’

সূত্র জানায়, অন্যান্য বছর এসব উপহার সামগ্রী বিতরণ তদারকির দায়িত্বে থাকতেন  প্রভাবশালী আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী। কিন্তু এবার তার বদলে অ্যাডভোকেট মো. এজহার নামে এক আইনজীবীকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, ‘মহিউদ্দিন ভাই ২৫ বছর ধরে বিচারকদের জন্য সেমাই পাঠাচ্ছেন। শুধু বিচারক নন, নিজের ঘরে তৈরি এসব সেমাই তিনি বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসন, পুলিশ কমিশনার, পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কর্মকতাদের জন্যও পাঠান। উপহার পাঠানোর এ সংস্কৃতি মহিউদ্দিন ভাই নিজে তৈরি করেছেন। এ উপহার না নেয়াটা এক ধরনের অসৌজন্য বলে আমি মনে করি।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মোবাইলে ফোন করা হলে তিনি প্রথমে ব্যস্ত আছেন বলে জানান। পরে আরও কয়েক দফা ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

>