সোমবার , ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ , ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > মন্ত্রীর খেয়ালে বন্ধ ৪০ কোটি টাকার বিদেশি তহবিল

মন্ত্রীর খেয়ালে বন্ধ ৪০ কোটি টাকার বিদেশি তহবিল

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঢাকা: মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির খেয়ালে বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি’র (এফপিএবি) বিদেশি তহবিলের প্রায় ৪০ কোটি টাকার অনুদান বন্ধ হয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ৬২ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে পরিচালিত বেসরকারি সংস্থা এফপিএবি’র কেন্দ্রীয় কমিটি ‘জাতীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ’ ভেঙে গ্রামীণ ব্যাংকের মতো প্রশাসক নিয়োগের কারণেই এমন দুর্গতি। এ কারণেই আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্লান্ট প্যারেন্টহুড ফেডারেশন (আইপিপিএফ) এ তহবিল বন্ধ করে দিয়েছে।
এফপিএবি’র মহাসচিব নাসির আহমেদ বাবুল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেছেন, প্রতিমন্ত্রীর একগুঁয়েমির কারণেই প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের বার্ষিক বরাদ্দের প্রায় ৪০ কোটি টাকা গত ১২ আগস্ট বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। সেইসঙ্গে আগের পাঠানো প্রায় ১৪ কোটি টাকা খরচ না করারও নির্দেশ দেয়।
এতে দেশের ৩২ জেলার প্রায় ৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও এফপিএবি’র বিভিন্ন কর্মসূচি বন্ধ হয়ে যায়।
তবে অভিযোগের বিষয়টি অস্বীকার করে চুমকি বলেন, বিষয়টি আমার মন্ত্রণালয়ের নয়।
এফপিএবি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর কমিটি ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করেছে সমাজসেবা অধিদফতর। আর এ কারণে যদি ফান্ড বন্ধ হয়ে যায় তাহলে এর দায়-দায়িত্ব আমার না।
তিনি বলেন, আমি দীর্ঘদিন এফপিএবি’র সঙ্গে ছিলাম। আমার বাবাও এই প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে শ্রম দিয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানের কোনো ক্ষতি হোক আমি তা চাই না। তাছাড়া আমি সভাপতি থাকার সময় ডোনাররা এভাবে প্রশ্রয় পায়নি। দেশের নিয়ম-কানুন এবং এফপিএবি’র গঠনতন্ত্র মেনেই কাজ করেছি। আমার বিরুদ্ধে আইপিপিএফ কোনো অভিযোগ তুলতে পারেনি।পযঁসশর
এফপিএবি’র তিন কর্মকর্তার চাকরি যাওয়া প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমার জানা মতে কোনো কারণ ছাড়াই অন্যয়ভাবে তিন জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এদিকে এফপিএবি থেকে জানানো হয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর একগুঁয়েমির কারণে এর আগেও একবার তহবিল বন্ধ করে আন্তর্জাতিক এই দাতা সংস্থাটি। ওই সময় চুমকি সংসদীয় কমিটির সভাপতির পাশাপাশি এফপিএবি’র জাতীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি ছিলেন। জাতীয় নির্বাহী পরিষদ নির্বাচনের মেয়াদ দুই বছর পার হয়ে যাওয়া এবং তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় গত বছর সাময়িকভাবে তহবিল বন্ধ করে দেয় আইপিপিএফ।
তবে কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাচন ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার শর্তে অনুদানের অর্থ ছাড় করবে দাতা সংস্থাটি।
দুই বছরের বেশি সময় গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে পরিষদের কার্যক্রম চালানোর পর অবশেষে গত বছর নির্বাচন দিতে বাধ্য হন চুমকি। তিন বছর মেয়াদের এই পরিষদ পাঁচ বছর পর গত বছর ২৪ নভেম্বর গঠিত হয়। নির্বাচনে চুমকির প্যানেলভুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ অধ্যাপক খালেদা খানম সভাপতি নির্বাচিত হন।
সভাপতি হিসেবে তার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে চুমকির এলাকার দুইজন সহকারী পরিচালক (স্টোর) মো. আবুল বাশার ও প্রোগ্রাম অফিসার মো. এনামুল হক এবং অপর একজন ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা কো-অর্ডিনেটর (প্রশাসন) মো. কবির হোসেনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার পক্ষে ২৭ জুন দিল্লীর আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে অঞ্জলি সেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে এফপিএবি’র কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করে তহবিল ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়।
তবে এ ঘটনার পর এফপিএবি’র বিরুদ্ধে বে-নামে কে বা কারা সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।
এই অভিযোগ তদন্তে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব হোসেন মোল্লাকে গত বছর ১৩ মে তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা হয়। হোসেন মোল্লা অভিযোগ তদন্তের জন্য ৩ জুন আনুষ্ঠানিক দিন নির্ধারণ করে ২৭ মে চিঠি দেন এফপিএবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. এ.এফ.এম মতিউর রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের।
ওই সময় এফপিএবি’র সভাপতি খালেদা খানমের মা মারা যাওয়ার কারণে ঢাকার বাইরে থাকায় তদন্তের সময় পেছানোর জন্য এফপিএবি’র পক্ষ থেকে পরদিন ২৮ মে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি কোনো সময় না দিয়েই নির্ধারিত দিনে তদন্ত করার কথা উল্লেখ করে গত ২৯ মে চিঠি দেন নির্বাহী পরিচালককে। ওই চিঠিতে বেনামী অভিযোগের ছায়ালিপিও সংযুক্ত করা হয়।
বেনামী অভিযোগের ছায়ালিপিতে বলা হয়েছে, এফপিএবির মহাসচিব নাসির আহমেদ আইপিপিএফ’র নিয়ম নীতি উপেক্ষা করে দফতরে অবস্থান করেন। দিন-রাত দফতরে অবস্থান করে দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি ও প্রভাব বিস্তার করেন। ত্রিশ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করলেও তিন কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক স্বার্থে চাকরিচ্যুত করে পছন্দের লোকজনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এসব অভিযোগ তদন্ত করেন তদন্ত কর্মকর্তা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব হোসেন মোল্লা।
এফপিএবি থেকে জানানো হয়, তদন্তের পর নিয়ম না মেনেই তড়িঘড়ি করে প্রশাসক নিয়োগের সুপারিশ করেন তিনি। এফপিএবি তদন্তের যথাযথ জবাব দিলেও তা আমলে নেননি হোসেন মোল্লা। এক পর্যায়ে গত ৭ আগস্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। নতুন প্রশাসক নিয়েগের চিঠিতে বলা হয়, তদন্তের জবাব দেয়নি এফপিএবি।
অবশ্য এফপিএবি জানায়, তথ্য প্রমাণসহ তদন্ত কর্মকর্তাকে মতামত জমা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে তা গ্রহণও করা হয়েছে।

এরপর গত ১৬ জুন এফপিএবির নির্বাহী পরিষদ না ভাঙার জন্য সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ডা. মোজাম্মেল হোসেন তার প্যাডে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মোস্তফা শহীদ এনামুল হককে ডিও লেটার দেন। ওই ডিও লেটারে তিনি মন্ত্রীকে জানান, আপনার মন্ত্রণালয়ে বেনামী দরখাস্তের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত তদন্তে বর্তমান কমিটি সংক্রান্ত যে কোনো বিরূপ সিদ্ধান্ত নিলে দাতাগোষ্ঠী সব তহবিল বন্ধ করে দেবে। অনাকাঙ্খিত কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকারও অনুরোধ করেন মোজাম্মেল হোসেন।
কিন্তু এতো কিছুর পরেও গত ১২ আগস্ট সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুশেণ চন্দ্র রায়কে প্রশাসন নিয়োগ করে সরকার।
এ ঘটনায় এফপিএবি’র পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রশাসক নিয়োগের পর এফপিএবি’র গঠনতন্ত্র বহির্ভূতভাবে অর্থিক বিষয়ে নির্দেশনা দেন প্রশাসক।
এর জবাবে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে অনুদান তহবিলটি বন্ধ করে।
প্রসঙ্গত, প্রতিবছর এফপিএবিকে দেওয়া ৪০ কোটি টাকা অনুদানের মধ্যে মাত্র অর্ধকোটির টাকার কিছু বেশি দেয় সরকার। অনুদানের বাকি টাকা দেয় আন্তর্জাতিক সংস্থা আইপিপিএফ।
সরকারের নিয়োগ করা এফপিএবি’র প্রশাসক সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুশেণ চন্দ্র রায়ের কাছে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ছুটিতে আছি। এ বিষয়ে কোনো কথা জানতে হলে অফিসিয়ালি জানতে হবে।

>