মঙ্গলবার , ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ , ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > মুম্বাইয়ে গণধর্ষণের ঘটনাটি ভারতীয় জনগণকে ফের জাগিয়ে তুলেছে

মুম্বাইয়ে গণধর্ষণের ঘটনাটি ভারতীয় জনগণকে ফের জাগিয়ে তুলেছে

শেয়ার করুন

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ একজন তরুণী ফটোগ্রাফারের উপর নির্যাতনের ঘটনায় সারা দেশের মানুষ সংহতি প্রকাশ করেছে, এবং সেইসাথে আরো বেশি কিছু করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।

আট মাসের মধ্যে দ্বিতীয় বারের মত, দেশে ব্যাপকভাবে ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে মর্মাহত ও বিুদ্ধ ভারতীয়রা আবারো ঐক্যবদ্ধ হয়েছে৷ নারীদের জন্য আরো ভালো সুরা ব্যবস্থা বলবৎ করার দাবিতে সমাজের সর্বস্তরের ও সব ধরনের আর্থ-সামাজিক পটভূমির পুরুষ ও নারীরা ভারতের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে মিছিল করেছে।

সর্ব-সাম্প্রতিক এই সাড়া-জাগানো ঘটনায়, একটি নিবন্ধের জন্য ছবি তোলার সময় ২২ আগস্টে একজন তরুণী ফটোগ্রাফার ধর্ষণের শিকার হলে দেশজুড়ে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে, যা এই বিােভগুলোকে চালিত করছে।

২৩-বছর-বয়সী এই ভিকটিমের সাথে তার একজন পুরুষ সহকর্মী ছিলেন, তিনি মুম্বাইয়ের একটি পুরাতন কারখানায় ছবি তোলার সময় পাঁচজন ব্যক্তি তাদের উপর হামলা চালায়। তারা ফটোগ্রাফারের সহকর্মীকে বেঁধে ফেলে এবং পালাক্রমে এই নারীকে ধর্ষণ করে।

তারপর, তারা তাদের মোবাইল ফোন দিয়ে সেই নারীর ছবি তুলে রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে এবং তারা এই দু’জনকে হুমকি দিয়েছিল যে এই অপরাধ সম্পর্কে পুলিশকে জানালে তাদেরকে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।

এই ফটোগ্রাফারের দুঃস্বপ্ন অনেককেই ২০১২ সালের ডিসেম্বরের নৃশংস ধর্ষণের ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যখন দিল্লির একটি বাসে কয়েকজন লোক একজন মেডিকেল শিার্থী তরুণীকে ধর্ষণ করেছিল। আগের ঘটনায় হামলাকারীরা ভিকটিমের দেহের ভেতরে লোহার রড ঢুকিয়ে দেয়ার ফলে তৈরি হওয়া তের কারণে দুই সপ্তাহ পরে তিনি মারা গিয়েছিলেন, কিন্তু এবার এই হামলা থেকে ফটোগ্রাফার প্রাণে বেঁচে গেছেন।

দেশব্যাপী ব্যাপক অনুসন্ধানের মাধ্যমে পাঁচজন অপরাধীর সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হলেন বিজয় যাদব, চান্দ বাবু সাত্তার শাইখ, মোহাম্মদ কাশিম হাফিজ শাইখ ও সিরাজ রহমান। এদের সবার বয়স বিশের ঘরে এবং তাদের বিরুদ্ধে নতুন ধর্ষণ-বিরোধী আইনে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, যেখানে ভিকটিমের মৃত্যু হলে ধর্ষণের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যথায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক : বর্তমানে অধিবেশনরত থাকা ভারতীয় সংসদের ২৩ অগাস্টের অধিবেশনের বেশিরভাগটাই মুম্বাইয়ের ঘটনার আলোচনায় নিবেদিত ছিল। সব দলের নেতারাই দ্রুত বিচার শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সুশীলকুমার সিন্ধে সংসদকে নিশ্চিত করেছেন যে মুম্বাইয়ের পুলিশ অপরাধীদের বিরুদ্ধে আদালতে দভাবে মামলা দায়ের করবে যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।

লোকসভায় বিরোধী দলীয় নেতা সুষমা স্বরাজ বলেন, আরো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। তিনি সাংসদের উদ্দেশ্যে বলেন, “নতুন আইন পাস করা হলেও তা মানুষকে ধর্ষণ থেকে বিরত রাখছে না। আমার পরামর্শ হলো এই আইনে আরেকটি সংশোধনী আনা হোক, যাতে ভিকটিম বেঁচে থাকুক বা মারা যাক ধর্ষকদেরকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে”৷

তবে, অনেক সক্রিয় কর্মী ও ধর্ষণ-বিরোধী প্রচারণাকারী সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে কেবলমাত্র মৃত্যুদণ্ড দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বরং, তারা বলেছেন, ভারতের পুলিশি ও আইনী প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের উন্নয়ন দরকার।

“ধর্ষকদেরকে ফাঁসি দিলে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো,” বলেছেন হক-এর পরিচালক ভারতী আলী, এই সংগঠনটি ধর্ষণের শিকার শিশুদের পে ওকালতি করে থাকে।

তিনি খবরকে বলেন, “২০% এরও কম ধর্ষণের মামলায় অপরাধীদের সাজা হয় কারণ পুলিশ গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়”৷

মনোভাবে পরিবর্তন আনা দরকার : ১৯৯৫ সালে সরকারের কাছ থেকে সাহিত্যে সবচেয়ে বড় পুরষ্কার পাওয়া বাঙালি লেখিকা মহেশ্বেতা দেবী বলেন, মনোভাবে মৌলিক পরিবর্তন আনা দরকার।

“সমাজ ও সরকার ধর্ষণকে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সময় এসেছে,” বলেছেন তিনি। “ধর্ষকদেরকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মাধ্যমে এর অবসান ঘটবে না, বরং সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। ভারতে এমন অনেকগুলো রাজ্য আছে যেখানে ধর্ষণ খুব কম হয়ে থাকে, যেমন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে, অন্যদিকে বড় বড় শহরগুলোতে এটা প্রতিদিনই ঘটছে।

কেন এটা ঘটছে সে সম্পর্কে আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে – হয়তো ভারতের এক অংশে বসবাসকারী মানুষরা অপর অংশে বসবাসকারী মানুষদেরকে শেখাতে পারেন যে কিভাবে নারীদের প্রতি আরো ভালোভাবে সম্মান দেখাতে হয়”৷

১৬ ডিসেম্বরের ঘটনা ও সর্বশেষ ঘটনার মাঝখানে আরো কয়েকটি ঘটনায় মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছিল, যদিও আরো ছোটখাটভাবে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে, পূর্ব দিল্লির পাঁচ-বছর-বয়সী একটি মেয়েকে দুই দিন ধরে একটি তালাবদ্ধ ঘরে আটকে রেখে গণ-ধর্ষণ করা হয়েছিল। যদিও অপরাধীদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি ধীরগতিতে চলছে। পরের মাসে, অন্ধ্রপ্রদেশের ১১-বছর-বয়সী একটি মেয়ে তার পরিবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ানোর সময় ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা গেছে।

তারপর জুন মাসে, কলকাতা-এলাকার কামদুনি গ্রামের ১৯-বছর-বয়সী একটি মেয়েকে চারজন পুরুষ ধর্ষণের পর হত্যা করে। অভিযুক্ত এক ব্যক্তি এখনো পলাতক রয়েছে এবং বাকি তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা এখনো শুরু হয়নি।

একজন মনবাধিকারকর্মী রাজ পাটবর্ধন খবরকে বলেন, “যারা ধর্ষণ করে তারা মনে করে পুলিশের অদতার কারণে তারা কোনো না কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে যাবে। আইনের ভয় তাদেরকে এখনো ভীত করে না। এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক,” বলেছেন তিনি।

জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি) প্রকাশিত ‘২০১২ সালে ভারতে অপরাধ’ শীর্ষক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন আনুযায়ী, ভারতে সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা অপরাধ হলো ধর্ষণ এবং ১৯৭১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে এই অপরাধ ৯০২% বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে, কেউ কেউ বলছেন যে এই তথ্য ধর্ষণের প্রকৃত সংখ্যা বৃদ্ধিকে নির্দেশ করে না, বরং যে সব ধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কে রিপোর্ট করা হয়েছে সেগুলো সম্পর্কে জানায়। তারা বলেন, নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে আরো বেশি করে সচেতন হয়ে ওঠায় ভিকটিমরা পুলিশের কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি, অতীতে তারা এই অপরাধকে লুকিয়ে রাখতো।

“১৯৯০ এর দশকের ভারতীয় নারীদের তুলনায় বর্তমানের ভারতীয় নারীরা ভিন্ন,” খবরকে বলেছেন দিল্লি পুলিশের সাবেক প্রধান নীরাজ কুমার। “তখন, সমাজে কলঙ্কিত হওয়ার ভয়ে একটি মেয়ে ও তার পরিবার অনেক দেরি করে ধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কে রিপোর্ট করতো। কিন্তু এখন সমাজ ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে সহায়তা করে এবং তার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে রিপোর্ট করার জন্য তাকে সাহস দিয়ে থাকে”৷

>