সোমবার , ১লা মার্চ, ২০২১ , ১৬ই ফাল্গুন, ১৪২৭ , ১৬ই রজব, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > যানজট যেখানে দুরারোগ্য ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ

যানজট যেখানে দুরারোগ্য ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাস্তার ভগ্নদশা এবং একটি বেসরকারি আবাসিক এলাকার যানবাহনকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে প্রতিদিন ভয়াবহ যানজটের কবলে পড়ছে রাজধানীর প্রগতি সরণি। যানজটের এ যন্ত্রণা থেকে রেহাই নেই ছুটির দিনেও। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত লেগে থাকছে দুঃসহ এ যানজট। ট্রাফিক পুলিশের একতরফা কার্যক্রম ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের চরম অবহেলায় সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। কুড়িল ফ্লাইওভার চালু হলে যানজটে স্থবির হয়ে যেতে পারে প্রগতি সরণি- এমন আশংকা খোদ ট্রাফিক পুলিশের।
রামপুরা ব্রিজ থেকে কুড়িল রেলগেট পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ প্রগতি সরণির অন্তত চারটি পয়েন্টে প্রতিদিন যানজট হচ্ছে। এসব পয়েন্টের মধ্যে রয়েছে রামপুরা ব্রিজের গোড়ায় বনশ্রী আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখ, বাড্ডা-গুলশান লিংক রোডের পূর্বপ্রান্ত, নতুন বাজার এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখ। এই পয়েন্টগুলোর মধ্যে সবচাইতে খারাপ অবস্থা বারিধারা সংলগ্ন বসুন্ধরা মোড়ের। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বসুন্ধরা মোড় হয়ে প্রগতি সরণির কোনো গাড়িই যেন এগোয় না। একবার দাঁড়ালে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়েই থাকতে হয়। অন্যদিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গাড়ি ঠিকই কিছুক্ষণ পরপর চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে। এ জন্য প্রগতি সরণির ডিভাইডারের পশ্চিম অংশের দুই লেনজুড়ে ব্যারিকেড বসিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। ব্যারিকেডের ভেতর দিয়ে বাড্ডা থেকে আসা গাড়ি বসুন্ধরায় প্রবেশ করে। আর, ব্যারিকেডের বাইরে মাত্র একটি লেন (একটি গাড়ি চলার জায়গা) দিয়ে চলে প্রগতি সরণির মতো অতি ব্যস্ত সড়কের হাজার হাজার যানবাহন।
প্রগতি সরণির নতুনবাজার থেকে তিনটি লেন দিয়ে বিপুলসংখ্যক গাড়ি নর্দা বাস স্ট্যান্ড পার হয়ে বসুন্ধরা মোড়ে আসে। এ মোড়ে এসে বৈষম্যের শিকার হয় কুড়িল-এয়ারপোর্টগামী গাড়িগুলো। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা গাড়িগুলোর জন্য দুই লেন বরাদ্দ থাকলেও কুড়িল হয়ে এয়ারপোর্টগামী গাড়ির জন্য বরাদ্দ মাত্র একটি লেন! এই লেনটির অবস্থাও ভালো নেই। সিরাজ গার্ডেন্স নামক বাড়ির সামনে এই লেনে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব গর্তের কারণে এয়ারপোর্টগামী লেন দিয়ে অত্যন্ত মন্থরগতিতে গাড়ি চলাচল করছে। প্রতি মিনিটে বসুন্ধরা মোড় পার হচ্ছে এয়ারপোর্টগামী ১২টি গাড়ি। অথচ একই সময়ে বিপরীতমুখী গাড়ি চলছে ৫০টি। স্থানীয় মোটরপার্টস ব্যবসায়ী সোলায়মান জানান, প্রায় এক মাস আগে শুরু হওয়া গর্তগুলোর সংস্কার না হওয়ায় সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে তা অনেক বড় হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটু পানি জমে ওইসব গর্তে। কোনো গাড়ি স্বচ্ছন্দে চলতে পারে না। তিনি বলেন, প্রগতি সরণির সিংহভাগ গাড়ি এয়ারপোর্টগামী। একটি মাত্র লেন বরাদ্দ থাকা এবং ওই লেনের ভগ্নদশায় বসুন্ধরা মোড়কেন্দ্রিক দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। শনিবার এ যানজট পেরুতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়। তবে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় রোববারের যানজট তুলনামূলক কম ছিল বলে তিনি জানান। এয়ারপোর্টগামী লেনটির দুরবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মারুফ বলেন, গত চারদিন ধরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনকে বহুবার অনুরোধ জানাচ্ছি যাতে সড়কটি দ্রুত মেরামত করে দেয়। কিন্তু তারা কিছু করছে না। যোগাযোগ করা হলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী মোঃ মফিজুর রহমান বলেন, শুক্র ও শনিবার বৃষ্টির কারণে বসুন্ধরা মোড়ের মেরামত করা যায়নি। রোববারও সকালে তারা মেরামত করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গর্ত হওয়ায় তা মেরামত করতে দিন চলে যায়। সোমবার তারা বসুন্ধরা মোড় মেরামত করে দেবেন বলে জানান।
রোববার বেলা ২টায় দেখা যায়, এয়ারপোর্ট রোড থেকে কুড়িল হয়ে শতাধিক গাড়ি বসুন্ধরা মোড়ে থেমে আছে। ট্রাফিক পুলিশ ইশারা (সিগন্যাল বাতি নেই, তাই হাতের ইশারায় চলার বা থামার সংকেত দেয়া হয়) দিলে থেমে থাকা গাড়ি বাড্ডার নতুনবাজারের দিকে যেতে থাকে। দু’মিনিটে শ’খানেক গাড়ি (রিকশাসহ) বসুন্ধরা মোড় অতিক্রম করার পর হাত তোলে ট্রাফিক পুলিশ। থেমে যায় নতুনবাজারগামী গাড়ির সোত। এরপর নতুনবাজার থেকে আসা প্রায় অর্ধশত গাড়ি পুলিশের সহযোগিতায় টানা চার মিনিট বসুন্ধরার ভেতরে প্রবেশ করে। এরপর আবার নতুনবাজারগামী গাড়ি বসুন্ধরা মোড় অতিক্রম করার সুযোগ পায়। তখন কুড়িল পর্যন্ত গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। এ পর্যায়ে তিন মিনিট পর ট্রাফিক পুলিশের হাত ওঠে। এরপর চার মিনিট বসুন্ধরার জন্য। বেলা তিনটা পর্যন্ত বসুন্ধরা মোড়ে দাঁড়িয়ে একই দৃশ্য দেখা যায়। কখনই এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কুড়িল থেকে নতুনবাজার অভিমুখে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫০টি গাড়ি বসুন্ধরা মোড় অতিক্রম করে। নতুনবাজার থেকে আসা ১২টি গাড়ি বসুন্ধরা মোড় হয়ে বসুন্ধরা সড়কে প্রবেশ করে প্রতি মিনিটে। এর কারণ হল ট্রাফিক পুলিশ বসুন্ধরার গাড়ির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে দিলেও এগুলোর চলাচল সুশৃংখল নয়। কে কার আগে যাবে তা নিয়ে বিপজ্জনক প্রতিযোগিতা হয়। বসুন্ধরা সড়কের প্রবেশমুখে রিকশার জটও রয়েছে। বসুন্ধরা সড়কের দু’পাশে রয়েছে দু’শতাধিক দোকান। এগুলোর বেশিরভাগই রেস্টুরেন্ট, ফাস্টফুড, হার্ডওয়্যার ও বুটিক শপ। সড়কের পাশে জগন্নাথপুর এলাকায় কাঁচাবাজার রয়েছে। এসব স্থাপনার নিজস্ব কোনো পার্কিং স্পেস নেই। বহুতল ভবনের গাড়িও রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। তাই প্রগতি সরণির কোনো গাড়ি দ্রুত বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার দিকে যেতে পারে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী বলেন, প্রগতি সরণির গাড়িকে অবাধ চলাচলে প্রাধান্য দেয়া না হলে বসুন্ধরা মোড়ের যানজট কখনও কমবে না। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ সেটা না করে বসুন্ধরার গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত থাকে সারাক্ষণ। এ কারণে যানজট এখানে স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
বসুন্ধরা মোড়ের স্থায়ী যানজট নিয়ে আলাপকালে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মারুফ বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩০ হাজার গাড়ি চলাচল করে। এসব গাড়ির অর্ধেকই আসে আবাসিক এলাকার ভেতরে থাকা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং একটি হাসপাতালের রোগী ও আীয়-স্বজনদের নিয়ে। এত গাড়ির সুষ্ঠু যাতায়াতের জন্য বসুন্ধরা মোড়ে ব্যারিকেড দেয়া হয়েছে। তা না হলে গাড়ির লাইন নতুনবাজার পর্যন্ত চলে যেত। তিনি বলেন, বসুন্ধরা মোড়ের ব্যাপারে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। তা না হলে আগামী মাসে কুড়িল ফ্লাইওভার চালু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে বসুন্ধরা মোড় থেকে নর্দা পর্যন্ত সড়কের দু’ধারে রয়েছে শতাধিক দোকান। এসব দোকানের বেশিরভাগই গাড়ির ডেকোরেশন সংশ্লিষ্ট এবং পার্টসের। কয়েকটি ওয়ার্কশপও রয়েছে। দেখা গেছে, প্রগতি সরণিতে রেখেই গাড়ির ডেকোরেশনের কাজ চলছে। ফুটপাত দখল করে দোকানের পণ্য সাজিয়ে রাখা হয় বলে পথচারীরা স্বচ্ছন্দে চলাচল করতে পারে না।

>