বুধবার , ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ , ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ৯ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > জাতীয় > রাজনৈতিক দল ও পুলিশ সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত

রাজনৈতিক দল ও পুলিশ সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯৩ শতাংশ মানুষের ধারণা, দেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে রাজনৈতিক দল ও পুলিশ। ৮৯ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণায় দুর্নীতিতে তৃতীয় অবস্থানে আছে বিচার ব্যবস্থা।
‘গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার ২০১২’ শীর্ষক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। তবে উত্তরদাতাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা হচ্ছে, সরকারি সেবা খাতে ঘুষ দেওয়ার হার কমেছে। উত্তরদাতাদের ধারণা, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও ভূমিসেবা শীর্ষ ঘুষগ্রহীতা খাত।
গতকাল মঙ্গলবার ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার (জিসিবি) একটি বিশ্বব্যাপী জনমত জরিপ। এতে দুর্নীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা, অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরা হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ২০০৩ সাল থেকে এই জরিপ করছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়, বিশ্বব্যাপী চলমান সমস্যা।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশে ৪৬ শতাংশ উত্তরতাদার ধারণা ছিল যে দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। এখন ৬০ শতাংশ উত্তরতাদা এই ধারণা পোষণ করেন। তবে উত্তরতাদারা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, ভূমিসেবা, রেজিস্ট্রেশন ও পারমিট সেবা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিা, পরিষেবা (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) এবং কর—এই আটটি সেবা খাতে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কমেছে।
তবে উত্তরদাতাদের ধারণা, জরিপের সার্বিক পর্যবেণ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরিপে সরকারি খাতের দুর্নীতি একটি বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকার বিশেষ মহলের (রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক, বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ইত্যাদি) স্বার্থে বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত হয়।
জরিপ বলছে, রাজনৈতিক দল, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার পর দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের তালিকায় আছে সংসদ বা আইনসভা (৮৮ শতাংশ), সরকারি প্রশাসন (৮৪ শতাংশ), ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান (৮৩ শতাংশ), স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা (৮১ শতাংশ), গণমাধ্যম (৬০ শতাংশ), শিা (৫৫ শতাংশ), এনজিও (৩৯ শতাংশ), সামরিক বাহিনী (৩২ শতাংশ) এবং ধর্মীয় সংগঠন (৩২ শতাংশ)।
সংবাদ সম্মেলনে ধারণা ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য ব্যাখ্যা করার সময় টিআইবির কর্মকর্তারা বলেন, ুদ্র (পেটি) ও বৃহৎ (গ্র্যান্ড) দুর্নীতি এবং গণমাধ্যম, বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে ধারণা তৈরি হয়। এ েেত্র পদ্মা সেতু, হল-মার্ক, রেলওয়ে ও নিয়োগের বিষয়গুলো ধারণা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে সেবা পাওয়ার েেত্র ুদ্র আকারের দুর্নীতির মুখোমুখি হওয়াই উত্তরদাতার অভিজ্ঞতা।
টিআই ১০৭টি দেশের এক লাখ ১৪ হাজার ১৭০ জনের ধারণা ও অভিজ্ঞতার ওপর এই জরিপ করেছে। বাংলাদেশে টিআই ও টিআইবি যৌথভাবে এই জরিপ করে। এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চের মধ্যে ৬৪ জেলার গ্রাম ও শহরের এক হাজার ৮২২টি খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। উত্তরদাতাদের বয়স ছিল ১৮ বছর বা তার বেশি। টিআইবির গবেষণা ও নীতি বিভাগের পরিচালক রফিকুল হাসান ও কর্মসূচি ব্যবস্থাপক শাহ্নূর রহমান জরিপের বাংলাদেশের অংশ উপস্থাপন করেন।
জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, পুলিশ (৭২ শতাংশ), বিচারব্যবস্থা (৬৩ শতাংশ) ও ভূমিসেবা (৪৩ শতাংশ)—এই তিন খাতে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দেওয়ার কারণ হিসেবে ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, এটাই সেবা পাওয়ার একমাত্র পথ।
৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি খাতের দুর্নীতি খুবই গুরুতর সমস্যা। এক প্রশ্নের উত্তরে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রীয় খাতে দুর্নীতি হয় রাজনৈতিক শক্তি, প্রশাসন ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর যৌথ প্রয়াশে।
বৈশ্বিক ও প্রতিবেশী দেশগুলোর একটি তুলনা প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৭০ শতাংশ এবং আফগানিস্তানের ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণা, দুর্নীতি বেড়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক ৭২ শতাংশ, ভারতে ৮০ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারি খাতে দুর্নীতি গুরুতর সমস্যা।
জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৩২ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণা, দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি পদপে অকার্যকর। টিআইবির মতে আশার দিক হলো, শতভাগ উত্তরদাতা দুর্নীতিবিরোধী কোনো না কোনো কার্যক্রমে অংশগ্রহণে আগ্রহী।
প্রতিবেদনে সুপারিশ করে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে, একইভাবে অন্যান্য জবাবদিহি প্রতিষ্ঠান যেমন—সংসদ, সিএজি, নির্বাচন কমিশন, গণমাধ্যম ইত্যাদিকে কার্যকর করতে হবে এবং গণমাধ্যমসহ সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
রাজনৈতিক দলকে সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ বলে বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের যে প্রক্রিয়ার কথা শোনা যায়, টিআইবি সেই প্রক্রিয়াকে উসকে দিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের না সূচক উত্তর দিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অরাজনৈতিক শক্তি মাথাচাড়া দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বলতার কারণে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছে রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও জনমুখী, আরও শক্তিশালী করাই আমাদের উদ্দেশ্য।’
গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই জরিপ করা হয়। এ প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ১০৭টি দেশে জরিপের জন্য এই সময়টা আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।

>