মঙ্গলবার , ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ , ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ৮ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > গ্যালারীর খবর > রাজপ্রাসাদে সাপ-বিচ্ছুর বসবাস

রাজপ্রাসাদে সাপ-বিচ্ছুর বসবাস

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজ নর্তকীদের নূপুরের ঝংকার নেই, নেই নারী কণ্ঠে গান। নির্যাতন আর নিপীড়নের গোঙ্গানিও শোনা যায় না। কালের বিবর্তনে সবকিছু চাপা পড়ে আছে মাটির নিচে। কিন্তু এখনও রাজা হরিশ চন্দ্রের সেইসব দিনের কথা অনেকের মনে পড়ে। দুর্দান্ত এক প্রভাবশালী রাজার কর্মকাণ্ড কিভাবে থেমে গেছে তার ইতিহাস এখনও মানুষের মুখে মুখে। রাজা হরিশ চন্দ্র নেই। কিন্তু তার স্মৃতি রাজবাড়ী এখনও আছে। এখানে বাস করছে সাপ-বিচ্ছু। সাভারে তার স্মৃতি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাভারের আগের নাম ছিল সম্ভার। সম্ভার অর্থাৎ সাভার নগরীতে তান্ত্রিক বৌদ্ধ শাসকদের মধ্যে রাজা হরিশ চন্দ্রের নাম উল্লেখযোগ্য। আর রাজা হরিশ চন্দ্রের রাজধানী হচ্ছে সাভার। পৌর এলাকার রাজাশন মহল্লায় ছিল রাজা হরিশ চন্দ্রের রাজবাড়ী, যা বর্তমানে প্রতœতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষণে থাকলেও রাজার শেষকীর্তি রয়েছে অবহেলিত। যার সিংহভাগই বেদখল হয়ে গেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল হরিশ চন্দ্রের ভূ-সম্পত্তি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে রেখেছে। অনেকে নির্মাণ করছে ভবন। তাছাড়া প্রায় এক একরেরও বেশি জমির ইতিমধ্যে অন্যত্র বিক্রি করেছে প্রভাবশালী মহল। ইতিহাস থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমিদার ও তার অধীনে নায়েবরা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে রাজত্ব করতেন। সে সময় বেশিরভাগ রাজপ্রাসাদ ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে প্রচলন ছিল।

কালের বিবর্তনে সেসব রাজবংশের রাজত্বের অবসান ঘটেছে। কিন্তু আজও অনেক স্থানে সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে তাদের অনেক স্থাপত্য এবং সম্পদ। আর আমাদের দেশে হিন্দু ও বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের মধ্যে স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে এসব স্থাপত্য কিছু কিছু দেখা গেলেও পরে আর তেমন হদিস পাওয়া যায়নি। তেমন একজন ছিলেন সাভার অঞ্চলের রাজা হরিশ চন্দ্র। ময়নামতির তান্ত্রিক মহারানীর পুত্র গোপীনাথের সঙ্গে রাজা হরিশ চন্দ্রের জ্যেষ্ঠ কন্যা অনু দা’র বিয়ে এবং কনিষ্ঠ কন্যা পদুনাকে যৌতুক প্রদানের কাহিনী বিজড়িত এ হরিশ চন্দ্রের ঢিপি। তৎকালীন ভারতবর্ষে এ দেশে ঐতিহ্যের নিদর্শন খুঁজে বের করতে কিছু প্র্রতœ্নতত্ত্ববিদ অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে ছিলেন। সে সময় অনেক জায়গায় ইতিহাসের নামকরা রাজা-মহারাজাদের প্রাসাদ নির্দিষ্ট করেছিলেন। যার মধ্যে রয়েছে বার ভূঁইয়ার ঈশা খাঁর আজকের সোনারগাঁ। এরও অনেক পরে বের হয়ে আসে ঢাকার অদূরে সাভারে রাজা হরিশ চন্দ্রের প্রাসাদ। কিন্তু এরপর আর খোঁজ নেয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে সে হারানো ঐতিহ্য ও প্রতœতত্ত্ব নিদর্শন পুনরুদ্ধার করতে দেশের প্রতœতত্ত্ববিদরা তৎপর হয়ে ওঠেন।

এরই ধারাবাহিকতায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে সাভারের রাজাশন এলাকায় ১৯৮৮-১৯৯০ সালে দুটি ঢিপির সন্ধান পায়, যা ইতিহাস থেকে নির্দিষ্ট করা ‘রাজা হরিশ চন্দ্রের প্রাসাদ ঢিপি’ হিসেবে। একটি রাজাশন এলাকার মজিদপুরের আমতলায় ‘রাজা হরিশ চন্দ্রের প্রাসাদ ঢিপি’ এবং আরেকটি ডগড়মোরা এলাকায় ‘রাজা হরিশ চন্দ্রের বুরুজ’ নামে পরিচিতি পায়, যা পরে সরকার এসব জমি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। ঢিপিতে অনুসন্ধান করে স্তূপসহ একটি বিহারের ধ্বংসাবশেষ এখানে অনাবৃত রয়েছে। বিহারটি ৩৯ দশমিক ৯৭ বর্গমিটার প্রশস্ত এবং স্তূপটি ১৭ বর্গমিটার প্রশস্ত বলে সাব্যস্ত করা হয়। এর ১৫০ মিটার পূর্বদিকে রাজাশন নামে আরও একটি ঢিপি রয়েছে, যা এখনও সম্পূর্ণরূপে খনন হয়নি। এ দুটি প্রতœস্থল থেকে বেশ কয়েকটি ভাস্কর্যখচিত পোড়ামাটির টুকরো, ব্রোঞ্জের তৈরি মুদ্রাকার বৌদ্ধমূর্তি, বিভিন্ন টেরাকোটা এবং গুপ্ত অবস্থায় লুকায়িত নকল স্বর্ণমুদ্রাও আবিষ্কৃত হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- লোকেশ্বর, অবকিতেশ্বর, ভূমিস্পর্শ মুদ্রার ধ্যানি বুদ্ধ, জম্মুন, জমল ও উভয় মুদ্রার ধ্যানি বুদ্ধমূর্তি, যা পরে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানা গেছে।

রাজাশন মৌজার ৫ দশমিক ৬০ একর ভূমি ১৯২০ সালের ২০শে নভেম্বর এক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বৃটিশ সরকার সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯২৬ সালের ২০শে মার্চ বর্ণিত ভূমি পুরাকীর্তি হুকুম দখল করে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু স্থানীয় ভূমিদস্যু রাজা হরিশ চন্দ্রের এ ভূ-সম্পত্তির সিংহভাগই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করে। এমনকি কিছু অংশ বিক্রিও করে দেয়। সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও সরকারি হুকুম দখলকৃত রাজাশন ঢিপির ওপর বে-আইনিভাবে ঘরবাড়ি নির্মাণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. শফিকুল আলম স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র ২০০৭ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি উপজেলার তৎকালীন নির্বাহী অফিসারসহ একাধিক সংশ্লিষ্ট প্রশাসনে দাখিল করেন।

তিনি তখন তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছিলেন, রাজাশন মৌজার আরএস খতিয়ান নং-১৩৯, ১৪০-এর দাগ নং-১৬, ১৭, ১৮-এর ৫ দশমিক ৬০ একর ভূমিতে অবস্থিত একটি প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসবিশেষ বৃটিশ সরকার কর্তৃক ১৯২০ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে ওই ভূমি ১৯২৫ ও ১৯২৬ সালে এলএ কেসের (নং-১২) মাধ্যমে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুকূলে হুকুম দখল করা হয়। বর্তমানে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল প্রতœতত্ত্ব বিভাগের জমি দখল প্রক্রিয়া চালায়। এছাড়া সংরক্ষিত পুরাকীর্তি স্থানটি মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক দশকে এ এলাকায় জমির মূল্য বেড়ে কয়েক গুণ হয়েছে। স্থানীয় ভূমিদস্যু এসব প্রতœতত্ত্ব নিদর্শনের জমি দখল করে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে ঐতিহ্যবাহী প্রতœতত্ত্ব বিভাগের জমি দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ডগরমোড়া মৌজার জেএল নং-সিএস-৬৫২, এসএ-১৬৩, পট নং যথাক্রমে সিএস দাগ ১০ এর .০৩৬ শতাংশ এবং সিএস দাগ ১২ আংশিক .০৬ শতাংশ। মোট .৪২ শতাংশ ভূমি ‘রাজা হরিশ চন্দ্রের বুরুজ’ হিসেবে পরিচিত।

এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতœনিদর্শন ১৯৮৭ সালে সরকার সংরক্ষিত প্রাচীনকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। আর এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে সরকার তথা প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত রয়েছে। ওই আদেশের ১৯ ধারা অনুযায়ী সংরক্ষিত পুরার্কীতির কোনোরূপ ক্ষতি, পরিবর্তন, পরিবর্ধন আইনের পরিপন্থি উল্লেখ থাকলেও দখলকারীরা কোন কর্ণপাত না করে নির্দ্ধিধায় দখল প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ঐতিয্যবাহী এ নিদর্শনের চারদিকে নোংরা-আবর্জনায় এ নির্দশনগুলো যেন ডাস্টবিনের মতো মনে হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের প্রফেসর ড. এ কে এম শাহনেওয়াজ জানান, এভাবে চলতে থাকলে একসময় হারিয়ে যাবে এ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। তার মতে, সরকারি হস্তক্ষেপে এখনই ব্যবস্থা না নিলে নতুন প্রজন্মের কাছে এটা কাল্পনিক ইতিহাসে পরিণত হতে পারে রাজা হরিশ চন্দ্রের ঐতিহ্যবাহী এ প্রাসাদ। তিনি বলেন, একসময় আমরা আন্দোলন করেছি, তবে মামলা-মোকদ্দমা হওয়ার পর থেকে আমরা আর কোন খোঁজখবর রাখছি না।

ঢিপির পাশে চা দোকানি রাহেলা বেগম বলেন, প্রায় একযুগ আগে রাজা হরিশ চন্দ্রের প্রাসাদ ঢিপিতে শ্রমিকের কাজ করেছি। তিনি বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গা থেকে রাজার ঢিপি দেখার জন্য অনেক লোক আসে। আবার অনেক বিদেশীরাও রাজা হরিশ চন্দ্রের প্রাসাদ ঢিপি দেখার জন্য আসে এবং অনেক ছবি তোলে নিয়ে যায়। দেখতে আসা বিভিন্ন লোকজন রাজার ঢিপি সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন করে, আমরা ইতিহাস জানি না বলে কিছুই বলতে পারি না। তিনি আরও বলেন, ঢিপির পাশে ইতিহাস লিখে একটি সাইনবোর্ড দেয়া থাকলেও অযন্ত-অবহেলায় তা নষ্ট হয়ে গেছে। স্থানীয় আবদুর রাজ্জাকসহ এলাকার অনেকেই বলেন, শুধু যতেœর অভাবে রাজা হরিশ চন্দ্রের প্রাসাদ ঢিপির ঐতিহ্য নষ্ট হওয়ার পথে। রাজাশনের আরও একটি জমিও ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়ে গেছে।

>