মঙ্গলবার , ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ , ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ১৫ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > রাসায়নিক হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতি

রাসায়নিক হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতি

শেয়ার করুন

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ যুদ্ধের ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতোই পুরনো। যুদ্ধ সংঘাতে ধ্বংস হয়েছে অনেক সভ্যতা, তেমনি বিজিতের হাতে লেখা ইতিহাসের ফাঁক-ফোকরে গড়েও উঠেছে অনেক সভ্যতা। তাইতো যুদ্ধের ইতিহাস মানেই শৌর্যবীর্যের গল্পগাঁথা। সেখানে স্থান পায় না জয়-পরাজয়ের মাঝে মারা যাওয়া সাধারণ মানুষের রক্তের স্রোত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে বিশ্ব ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় মার্কিন সাম্রাজ্য। তখন থেকে অস্ত্র আর পুঁজিকে কেন্দ্র করে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আধিপত্যবাদী আক্রমন চলানো শুরু তাদের। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য যারপরনাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট তার নিজ দেশের জনগণের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র হামলা চালিয়েছে এমন অপ্রমাণিত সত্যের ওপর ভিত্তি করে সেখানে হামলা চালানোর জন্য কংগ্রেসের অনুমতি থেকে শুরু করে বিশ্বনেতৃবৃন্দের সমর্থন চাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

সিরিয়াতে তদন্তরত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশনের সদস্য কার্লা দেল পন্টে বলেন, ‘মানবতার বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালীন সময়ে আমরা বেশকিছু সাক্ষী এবং তথ্য হাতে পাই। সেখানে কিছু রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারেরও আলামত পাই আমরা। বিশেষত সেটা ছিল চেতনানাশক গ্যাস। আমাদের তদন্তে দেখতে পাই যে গ্যাসগুলো ব্যবহার করেছে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা। আমরা আমাদের অভিযোগের তীর কখনই সিরিয়ার সরকারের দিকে ছুড়িনি।’

অথচ যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, প্রেসিডেন্ট আসাদের নির্দেশে চালানো রাসায়নিক অস্ত্র হামলায় প্রায় ১৪০০ সাধারণ সিরীয় নাগরিক মারা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বাণিজ্যিক সুরের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বেশকিছু মিত্রশক্তি।

এবার প্রসঙ্গটা যদি সিরিয়া থেকে সরিয়ে ফিলিস্তিনের দিকে আনা হয় তাহলে ভিন্ন চিত্র দেখতে পাওয়া যায়।

২০০৯ সালে ফিলিস্তিনে বিতর্কিত সাদা ফসফরাস গ্যাস প্রয়োগ করে ইসরায়েল যখন প্রায় ১৪০০ সাধারণ মানুষ হত্যা করেছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র একটা কথাও বলেননি মানবতার খাতিরে। কেন তখন যুক্তরাষ্ট্র কিছু বলেননি এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে? ইসরায়েল মিত্র বলেই কি চুপ ছিল যুক্তরাষ্ট্র? ইসরায়েলে সঙ্গে অস্ত্র ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে বলেই কি তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র?

তৎকালীন সময়ে ফিলিস্তিনে রাসায়নিক অস্ত্র হামলার বিষয়টি বিশ্বের বিখ্যাত গণমাধ্যমগুলো এড়িয়ে গেলেও জাতিসংঘের ত্রাণ এবং উদ্ধারকারী সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) এক রিপোর্টে রাসায়নিক অস্ত্র হামলার বিষয়টি উঠে আসে। সংস্থাটি ওই হামলা চলাকালীন সময়ে গাজার ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ওপর ‘অপারেশন কাস্ট লিড’ নামে একটি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। সেসময় ইসরায়েলি রাসায়নিক অস্ত্র তাদের শিবিরেও আঘাত হানে।

২০০৮ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসরায়েল ভূমি থেকে ভূমিতে ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালানো শুরু করে এবং সে হামলা শেষ হয় ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসের ১৮ তারিখে। এই হামলায় প্রায় ১৪০০ ফিলিস্তিনি মারা যায়। বিপরীতে ১৩ জন ইসরায়েলি সৈন্য মারা যায়, যার মধ্যে চারজন মারা যায় নিজেদের বাহিনীর গুলিতে।

দক্ষিণ অফ্রিকার বিচারক রিচার্ড গোল্ডস্টোনের তত্ত্বাবধানে ২০০৯ সালে জাতিসংঘের একটি দল ফিলিস্তিনে রাসাযনিক হামলা সম্পর্কিত ৫৭৫ পৃষ্ঠার একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করা হয়।

গোল্ডস্টোন এসময় ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এবং আহত-নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। অনেকগুলো স্বাক্ষাৎকার এবং ইসরায়েলের ব্যবহৃত ক্ষেপনাস্ত্রের ভগ্নাবশেষ পরীক্ষা করে দেখা যায় ওই হামলায় ইসরায়ের ‘সাদা ফসফরাস’ ব্যবহার করেছিল সাধারণ নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর।

সাদা ফসফরাস এমন এক রাসায়নিক পদার্থ যা বাতাসের সংস্পর্শে আসামাত্রই জ্বলে ওঠে। এই দাহ্য পদার্থ মানুষের চামড়ার সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে মাংস পুড়ে হাড়ও পর্যন্ত গলে যায়। এছাড়াও এই গ্যাস শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করলে মৃত্যু অনিবার্য। যুদ্ধক্ষেত্রে এবং সাধারণ মানুষদের ওপর এই অস্ত্র প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ ইসরায়েল এই অস্ত্র শুধু সাধারণ মানুষের ওপর প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত দেয়নি, হাসপাতালের ওপরও প্রয়োগ করেছে।

যখন ইসরায়েলকে জাতিসংঘের তরফ হতে এই হামলা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় তখন তারা স্রেফ এই অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু ফিলিস্তিনে হামলার মাত্র তিন দিন আগে ২০০৯ সালের ১৫ জানুয়ারি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এহুদ বারাক যুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সমালোচনা করেন।

ইসরায়েলের প্রতি সাদা ফসফরাস হামলার অভিযোগ করা হলে সেই অভিযোগ শুধু অস্বীকারই করা হয়নি। উল্টো হামাসকে সাদা ফসফরাস হামলার জন্য দায়ী করে ইসরায়েল। অবশ্য ইসরায়েলকে তার বক্তেব্যের পক্ষে যুক্তি-প্রমাণ দেখাতে বলা হয় গোল্ডস্টোনের তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে। কিন্তু ইসরায়েল কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি।

প্রমাণিত অপরাধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বদলে প্রমাণ হয়নি এমন ঘটনার পেছনে সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করতে রাজি যুক্তরাষ্ট্র। কারণ একদিকে তার কাধে রয়েছে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাবস্থার পরিণতি এবং অণ্যদিকে দেশিয় অস্ত্র ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত চাপ। তবে এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সম্প্রতি শেষ হওয়া জি-২০ সম্মেলনে রাশিয়া স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে যদি সিরিয়াতে আক্রমন হয় তাহলে রাশিয়া সিরিয়ার পক্ষে লড়বে। আরেক পরাশক্তি চীনও সিরিয়ার পক্ষে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। তাহলে কি বিশ্ব তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগুচ্ছে?

>