মঙ্গলবার , ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ , ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ , ৮ই রবিউস সানি, ১৪৪২

হোম > Uncategorized > ৪-১/৫-০’র জন্য রাজনীতির নয়-ছয়

৪-১/৫-০’র জন্য রাজনীতির নয়-ছয়

শেয়ার করুন

স্টাফ রিপোর্টার ॥
রাজনীতিতে শেষ বলতে কিছু নেই। এটি শুধু আমাদের রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, পৃথিবীর সব দেশের রাজনীতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে অন্যান্য দেশের রাজনীতি ও আমাদের দেশের রাজনীতির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য হলো যে সেখানকার রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মৌলিক আদর্শগত স্থান থেকে বিচ্যুত হয় না। আর বিচ্যুত হ্ওয়াই আমাদের মূল বৈশিষ্ট্য।

এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কেন্দ্র থেকে তৃণমুল পর্যায় পর্যন্ত তাদের শত্রু-মিত্র পরিবর্তন করে। এমনও হয় যে, কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যে দলের সাথে বিরোধিতা, তৃণমূল স্থানীয় পর্যায়ে সেই দলের সাথেই সখ্য। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার পর্যালোচনা করলে সে রকম আলামই দেখা যায়।

এরই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি, এখন গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। নির্বাচনের প্রার্থীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে যেভাবে কোলে তুলে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাতে কিছু দিন আগের রাজনীতির মাঠের প্রবহমান হাওয়া এখন উল্টো দিকেই বইছে বলে মনে হয়।

বলা যায়, ঢাকায় যে নৌকা উজানে, গাজীপুরেই সে নৌকা চলছে ভাটিতে। উজান-ভাটির এ দোলাচলে কোন ঘাটে নৌকা ভিড়বে জনগণই তা ঠিক করবে।

সিটি করপোরেশন নিবার্চনের ফলাফল এখন পর্যন্ত ৪-০। জাতিকে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে গিয়ে যে সরকারকে এই ফল বরণ করতে হবে তা হয়তো ভাবতেও পারেনি। অন্তত ড্র বা ৩-১ হলেও মণকে একটা বুঝ দেওয়া যেতো!

বিরোধীদলের তত্ত্বাবধায়কের দাবিকে অযৗক্তিক প্রমাণ করতে গিয়ে সরকারকে এ ফল বরণ করতে হলো। সরকার অতি উদ্যোগী হয়ে কোথাও কোথাও নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই নির্বাচন দিয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়াদ কয়েক বছর পার হয়ে গেলেও এখানে নির্বাচন দেওয়ার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। হয়তো কেন্দ্রে পরাজয়ের আশঙ্কায় সরকার এতো বড় ঝুঁকি নিতে চায়নি।

কিন্তু অন্য চার সিটিতে পরাজয়ের পর সরকার কেন গাজীপুরে নির্বাচন দিতে গেল?

কারণ, সরকারের জন্য মূল এজেন্ডা হলো বর্তমান সংবিধানের আলোকে আগামী নির্বাচন পরিচালনা করা। সে নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনে স্থানীয় কয়েকটি নির্বাচনে সম্ভাব্য পরাজয়কেও সরকার ইতিবাচকভাবেই দেখছে।

এখন প্রশ্ন হলো, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার সমর্থক প্রার্থী যদি পরাজিত হয় সেটাও কি সরকার ইতিবাচকভাবে দেখার সাহস রাখে কিনা?

একইভাবে বিরোধীদলের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী পরাজিত হলে বিএনপি সে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে গ্রহণ করবে কিনা?

কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্বাচনে যদি বিএনপি প্রার্থী জয়ী হয় তাহলেও তারা তাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল করার দাবি থেকে পিছু হটবে না। এ অভিজ্ঞতা সরকারের ইতিমধ্যেই হয়েছে। কারণ, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হয়েও বিরোধী দল তাদের দাবী থেকে সরে যায়নি। আবার সরকারও জনগণকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে যে তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। যদিও চারটি নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়েছে। কিন্তু আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটি এখনও তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হতে সময় লাগবে। কারণ, অতীতে কোনো সরকারের আমলেই সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। স্বাধীনতার পর দলীয় সরকারের অধীনে দেশে যতোগুলো জাতীয় নির্বাচন হয়েছে তার সবগুলোই প্রশ্নবিদ্ধ।

গাসিক-এ সরকার পরাজিত হলে সে নির্বাচনকে নেতিবাচকভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, সেটি সরকারের অবস্থানগত অসুবিধার জায়গা।

বিরোধীদল যেকোনো কথাই বলতে পারে। জয়ী হলে বলতে পারে যে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বা হয়নি। যেমনটি শনিবার বিরোধীদলের নেত্রী সংসদে বলেছেন নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু হয়নি।পুরোপুরি সুষ্ঠু হলে সরকার সমর্থনপুষ্ট প্রাথীদের নাকি জামানত বাজেয়াপ্ত হতো! বিরোধীদলে থাকলে সব কথাই বলা যায়।

সন্দেহ নেই, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিরোধীদল সে অবস্থানই গ্রহণ করবে। জয়ী হলে তারা বলবে, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে অথবা আরো সুষ্ঠু হলে আরো বেশি ভোট পেতো ইত্যাদি।

অন্যদিকে সরকারও তাদের সেই পুরোনো দাবিই তুলে ধরবে।

ফলে, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আশা করা যায় না। সরকারের এখানে হারানোর কিছু নেই।

অন্যদিকে বিরোধীদলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি তারা পরাজিত হয় তবে সরকারের প্রতি দোষারোপ; আর জয়ী হলে তো আরো ভালো।

তবে, আগের চারটি নির্বাচনে সরকার জয়ের ব্যাপারে যতটা উদাসীনতা দেখিয়েছে গাসিক-এ ততোটা উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে না। আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় মন্ত্রী সাহেবরা গাজিপুর যেতে না পারলেও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ গাজীপুরেই থাকছেন। ঢাকার লাগোয়া হওয়াতে কেন্দ্রীয় রাজনীতির ইস্যুগুলোও এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। সেকারণেই কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও এর একটা প্রভাব আছে। আর ঢাকা ও গাজীপুরের স্থানীয় ইস্যুগুলোও মোটামুটিভাবে অভিন্ন। নাগরিক সুবিধা-অসুবিধার ক্ষেত্রে ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। তবে গাজীপুরের প্রত্যন্ত এলাকার কথা ভিন্ন।

গাজীপুরের মতো ঢাকার উপকন্ঠে আরেকটি সিটি করপোরেশন (নারায়নগঞ্জ)নির্বাচনও জাতীয়ভাবে আলোড়ন তুলেছিল।সেখানে সরকার শেষ পর্যন্ত ভুল নৌকার গুন(রশি দিয়ে নৌকা টানা) টেনেছিল। গাজীপুরেও সরকারকে জাহাঙ্গীর-আজমতের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে হয়েছে। আজমত শেষ পর্যন্ত সরকারের মুখে হাসি ফোটাতে পারে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। তবে তার চেষ্টার ত্রুটি নেই। সরকার থেকেও তাকে সমর্থন দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করা হচ্ছে না।

জাতীয় নির্বাচনে যেমন বিভিন্ন দল-উপদলকে কাছে টানতে তদবির চালানো হয় তেমনি গাজীপুর নির্বাচনেও একই রকম কৌশল অবলম্বল করা হচ্ছে। কৌশলগত কারণে অধ্যাপক মান্নান জাতীয় ইস্যুগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরে তার একটি সুবিধা নিতে চাচ্ছেন। অন্যদিকে অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ স্থানীয় বিষয়গুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান। তবে এক্ষেত্রেও যে তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না।

এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ও হেফাজতের অবস্থানগত রহস্যভেদ এখন পর্যন্ত হয়নি। সরকারের আশার প্রতিফলন ঘটিয়ে জাপা কেন্দ্র থেকে তৃণমুলে কোনো জোরালো আহবান জানায়নি। আবার তৃণমূল নেতৃত্বও মান্নানের পক্ষেই কাজ করছে বলে খবরে প্রকাশ।

আবার সরকার কেন্দ্রে বসে হেফাজতের সমালোচনায় মুখর, অন্যদিকে গাসিকে সরকার সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী হেফাজতেরও সমর্থন প্রত্যাশী। তিনি হেফাজতের হেফাজতেই আছেন বলে প্রচার করছেন। মান্নান সাহেবেরও একই দাবি। এক্ষেত্রে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কোনো রা করছেন না। তৃণমূলেও একই অবস্থা। কে যে কার হেফাজতে আছে তা ফলাফলই বলে দেবে।

তবে, সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, গাসিক-এ সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা। অন্য চারটি নির্বাচনের চেয়ে এখানে সরকারের শক্তি ও ইচ্ছার প্রতিফলন বেশি থাকা জরুরি। গাজীপুরের অবস্থা ও অবস্থানগত বাস্তবতার জন্যই সেটি প্রয়োজন। সরকার এখানে ৪-১কে গুরুত্ব দেবে নাকি ৫-০হলেও আগামী নির্বাচনে বিরোধীদলসহ জনগণের আস্থা অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেবে সেটি তাদের বিবেচ্য। আমরা শুধু জনগণের জান-মালের হেফাজত চাই। আর গাসিক-সহ সকল স্থানীয় সরকারে চাই জনমতের প্রতিফলন।

>