অস্তিত্বহীন বাদীর মামলায় ফাঁসিয়ে : কাপাসিয়ায় আম্বিয়ার জমি গ্রাসের ষড়যন্ত্র

প্রকাশিত: November 18, 2013 | সময়: 4:12 am

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাস্তবে বাদীর কোন অস্তিত্ব নেই। গাজীপুরের বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ (কাপাসিয়া অঞ্চল) থেকে প্রেরণ করা অপহরণের সিআর মামলা নং ৩০২/১৩ কোন রকম তদন্ত ছাড়াই এফআইআরভূক্ত হয়েছে কাপাসিয়া থানায়। ধারা ঃ ৪২০/৪০৬/৩৮৬/৩৭৯/৩৬৫ দন্ডবিধি।
মামলা সূত্রে জানা যায়, বাদী মোসাঃ নাজমা বেগম, পিতা- মৃত আতিক উল্যাহ, সাং- মুন্সীপাড়া, পোঃ গাজীপুর-১৭০০, থানা- জয়দেবপুর, জেলা- গাজীপুর।
অপরদিকে মামলার বিবাদীরা হলেন- কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকানার মৃত ইছব আলীর ছেলে মোঃ লোকমান হোসেন, উপজেলা সদরের কাপাসিয়া গ্রামে আঃ খালেকের তিন ছেলে মোঃ আলমগীর হোসেন, মোঃ হানিফা ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মোঃ জামান।
মামলার এজাহারে পৃথক ২টি ঘটনাস্থল উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম ঘটনাস্থল গাজীপুর শহরের মুন্সীপাড়া। এখানে বাদীর ভাড়া বাসায় নসিমন গাড়ী ক্রয়ের ব্যাপারে ৭০ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে বিবাদীদের সাথে। আরো ৫০ হাজার টাকা নিয়ে পরবর্তীতে আরেকটি ঘটনাস্থল বিবাদীদের বাড়িতে যান গাড়ী এবং গাড়ীর কাগজপত্র আনতে। বাদী অভিযোগে বলেন, গাড়ী এবং কাগজপত্র না দিয়ে তাকে মারধোর করে জোরপূর্বক ৫০ হাজার টাকা নিয়ে যায় এবং তার ভাই আলমগীরকে অপহরণ করে বিবাদীরা।
আদালতের বিচারক আদেশে লিখেন- ১৮৯৮-এর ২০০ ধারার বিধানমতে অভিযোগকারীকে হলফান্তে পরীক্ষা করা হয়। আনিত অভিযোগ গুরুতর। ঘটনাস্থল পরিদর্শক, স্থানীয়ভাবে স্বাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ, প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য ও আলামত জব্দকরণসহ পূর্ণাঙ্গ ইনভেস্টিগেশন আবশ্যক। অভিযোগটি এফআইআর এর হিসেবে গণ্য। সংশ্লিষ্ট কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হল।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কাপাসিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোঃ কুতুব উদ্দিন অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তদন্ত না করেই এফআইআর ভূক্ত করেন [মামলা নং ২৩(৯)১৩]।
গাজীপুর শহরের মুন্সীপাড়া একটি ছোট মহল্লা। তিনদিন তন্ন তন্ন করে খোঁজেও সেখানে ওই মামলার বাদী কোন নাম গন্ধ পাওয়া যায়নি। পরে গত ১৩ নভেম্বর দুপুরে বাদীর নিযুক্ত আইনজীবী অ্যাড. মোঃ লুৎফর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে বাদীর মোবাইল নাম্বার নেই। বাদীকে দেখলে চিনব। থানায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেন’।
তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মোঃ কুতুব উদ্দিন ওইদিন সেলফোনে বাংলাভূমিকে এ ব্যাপারে বলেন, ‘বাদীর সাক্ষাৎ এখনও পাইনি। তার সেলফোন নম্বরও আমার কাছে নেই’। বাদীর সাক্ষাত এবং তদন্ত ছাড়া কিভাবে মামলাটি এফআইআর ভূক্ত করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোর্টের নির্দেশ ছিল। আপনারা কোর্ট থেকে আসামীদের জামিনের ব্যবস্থা করান। আমি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিচ্ছি’।
বিবাদীরা অভিযোগ করেছেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন কিংবা তদন্ত ছাড়াই আসামীদের ধরপাকড় করার জন্য ব্যস্ত রয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। পুলিশের ভয়ে তারা এখন ভিটামাটি ছাড়া।
নাটের গুরু রাজাকার জাহাঙ্গীর :
আলোচ্য মামলার ১নং আসামী মোঃ লোকমান হোসেন হচ্ছেন জনৈক আম্বিয়া খাতুনের মেয়ের জামাই। অন্য তিন দিনমজুর আসামিরা হলেন- আম্বিয়া খাতুনের তিন সন্তান। আম্বিয়া খাতুনের শেষ সম্বল এক টুকরা ভিটাজমি। এই জমি গ্রাস করতে আম্বিয়ার সর্বনাশের জন্য পেছনে লাগে কাপাসিয়ার গ্রামের রাজাকার জাহাঙ্গীর। রাজাকার জাহাঙ্গীর ডাকাত সরদার হিসেবে কুখ্যাত। আম্বিয়ার অভিযোগ- ডাকাত সরদার রাজাকার জাহাঙ্গীর তার ভিটেবাড়ির অর্ধেক প্রায় জোরপূর্বক বেআইনী ভাবে দখল করে নেয়ার পায়তারা করছে। এই জমি দখলকে কেন্দ্র করেই তাঁর আরেক ছেলে শাহজাহান দীর্ঘদিন যাবৎ নিখোঁজ রয়েছে। তার ছেলেকে অপহরণ, গুম ও জমি বেদখলকে কেন্দ্র করে গাজীপুর আদালতে সিআর মোকদ্দমা নং ২৫৭/১৩ তাং ২১/৭/১৩ইং ধারা ঃ ৪৪৭/৩৬৪/৩৬৮/৩৮৬/৩৪ দঃবিঃ দায়ের করেন। এই মামলার প্রধান আসামী রাজাকার জাহাঙ্গীর।
অপরদিকে আম্বিয়ার আরেক ছেলের নাম জাহাঙ্গীর আলম। সে মালয়েশিয়ায় চাকুরি করার জন্য যান। রাজাকার জাহাঙ্গীরের ছেলে সাতটি ডাকাতি মামলার আসামী ফয়সালও জেল থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে গোপনে মালয়েশিয়ায় চাকুরির উদ্দেশ্যে যান। মালয়েশিয়া আম্বিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর আলম আর রাজাকার জাহাঙ্গীরের ছেলে ফয়সালের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত ও যোগাযোগ ছিল। আম্বিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর আলম মালয়েশিয়ায় লটারী পেয়ে অনেক অর্থের মালিক হন। ২০১১ সালে আম্বিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর আলম সেখানে খুন হন। আম্বিয়ার মতে তার ছেলে খুন হওয়ার ঘটনার সাথে রাজাকার জাহাঙ্গীরের ছেলে মালয়েশিয়া প্রবাসী ফয়সালের কোন না কোনভাবে যোগসূত্র রয়েছে। এ বিষয়ে ওই দেশের পুলিশ বাদী হয়ে একটি খুনের মামলা দায়ের করে। কিন্তু ফয়সাল মালয়েশিয়া থেকে পালিয়ে অন্য দেশে আত্মগোপন করে আছে।
সরেজমিনে জানা যায়, রাজাকার জাহাঙ্গীর এলাকায় বহুপরিবারকে জমাজমি ও অর্থ আত্মসাত করে পথে বসিয়েছে। তাছাড়া কূটকৌশল প্রয়োগ করে একে অপরের সাথে মামলায় জড়িয়ে সুবিধা আদায় করা তার প্রিয় খেলা। সে অসংখ্য বিয়ে করে প্রত্যেকের কাছ থেকে অর্থ লুফে নিয়ে তাদের কাছে সটকে পরে। বিয়ের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াও তার আরেক প্রকার নেশা। রাজাকার জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কাপাসিয়া থানায় একাধিক ডাকাতির মামলা রয়েছে। সে বর্তমানে আম্বিয়া খাতুনের দায়ের করা মামলায় পলাতক রয়েছে। তবে থেমে নেই তার অপকর্মের লম্বা হাত।
আম্বিয়া খাতুনের পরিবারকে পথে বসানো এবং হয়রানী করার জন্যেই মূলত গাজীপুরের মুন্সীপাড়া ঠিকানায় ভুয়া বাদীর নামে সাজানো মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মুন্সিপাড়ায় রাজাকার জাহাঙ্গীরের সাবেক এক স্ত্রীর পিত্রালয়।
আম্বিয়া খাতুনের ভিটাবাড়ি গ্রাস করার জন্য ঠাকুরগাঁও আদালতে এই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আরো দু’টি ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দিয়ে হয়রানির চূড়ান্ত করা হচ্ছে। একটি মামলা হয়েছে, আদম ব্যবসার নামে টাকা আত্মসাৎ করা। অপরটি চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে দায়ের করা হয় বানানো বাদী দিয়ে। মামলা নং ৯২/২০১০। ওই মামলার বাদী বানুকে আম্বিয়ার ছেলে আলমগীরের বানোয়াট স্ত্রী দেখিয়ে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করা হয়। প্রকৃত পক্ষে বানু নামে আলমগীরের কোন স্ত্রী নেই। ওই বাদীকে আদালতের কাঠগড়ায় কখনো দেখা যায়নি বলে জানান আম্বিয়া খাতুন। এই মামলায় আলমগীর ও তার মা আম্বিয়াকে আসামী করা হয়েছে এবং আলমগীর এই মামলায় জেল খাটে দীর্ঘদিন। এই মামলাটির ২নং সাক্ষী কাপাসিয়ার আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে মোঃ জাহাঙ্গীর (ডাকাত সরদার)। বহু বিবাহের কলনায়ক রাজাকার জাহাঙ্গীরের প্রথম স্ত্রীর বাড়ি ঠাকুরগাঁও।