আতঙ্কে নির্বাচনী কর্মকর্তারা

প্রকাশিত: November 22, 2013 | সময়: 3:34 am

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা, সঙ্কট, সঙ্ঘাত ও উত্তেজনা চলছে। ফলে এ নিয়ে আতঙ্ক ও নিরাপত্তহীনতা বিরাজ করছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন ধরনের জনবল এবং নির্বাচন আয়োজনের সাথে জড়িত শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যেও। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই এখন নির্বাচনের কাজে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে ঊধ্বর্তন দায়িত্বশীলদের কাছে আবেদন করছেন। আর ইসির জনবল বদলির জন্য তারা এখন ঢাকায় এসে ঊর্ধ্বতনদের অনুরোধ করছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে তারা লিখিতভাবে অপারগতা প্রকাশ করে দায়িত্বশীলদের কাছে চিঠি দিচ্ছেন বলে মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও শিক্ষক-কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। ইসির তথ্যানুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে সাত লাখ নির্বাচনী কর্মকর্তা লাগে। ভোট গ্রহণের জন্য ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে জেলা প্রশাসক (সম্ভাব্য রিটার্নিং কর্মকর্তা), আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে ১৩ নভেম্বর চিঠি পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চিঠিতে ১০টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আগামী ২৫ নভেম্বরের মধ্যেই প্রায় সাত লাখ ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত করে ইসিতে পাঠাতে বলা হয়েছে; কিন্তু তফসিল ঘোষণা না হলেও ওই চিঠি আসার পরই নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে যাতে অব্যাহতি পাওয়া যায়, তার জন্য তদবির শুরু করেছেন সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক ও কর্মকর্তারা। তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করা হবে। প্রধান বিরোধী জোটের ‘একদলীয় নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণা’ এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তা ছাড়া সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে ইসির অফিসে আগুন এবং ৫০০ ব্যালট বাক্স পুড়িয়ে ফেলার ঘটনায় আতঙ্ক আরো তীব্র হচ্ছে। ফলে বিপদে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধানেরা। প্রায় ৩৮ হাজার ভোট কেন্দ্রের প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব ভোট কেন্দ্রে নিয়োগ পাবেন জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত অফিস ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা। কমিশন থেকে সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্র ৩৮ হাজার আর ভোট ক ধরা হয়েছে দুই লাখের মতো। নিয়মানুযায়ী প্রতিটি কেন্দ্রে একজন প্রিজাইডিং অফিসার এবং প্রতিটি ভোট কে একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও দুইজন পোলিং অফিসার দায়িত্বে থাকেন। সে অনুযায়ী ৩৮ হাজার ভোট কেন্দ্রের ৩৮ হাজার প্রিজাইডিং অফিসার, দুই লাখ সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং চার লাখ পোলিং অফিসারসহ এসবের ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ধরে মোট সাত লাখ কর্মকর্তার তালিকা করতে বলা হয়েছে। এ দিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ইতোমধ্যে ভোট কেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠন করেছে। এ ছাড়া এ দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা দিয়েছেন তফসিল ঘোষণার পর কোনো ব্যালট বাক্স কেন্দ্রে নিতে দেয়া হবে না। এরপর থেকে স্থানীয় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বিএনপির নেতারা কর্মীদের তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন, একদলীয় নির্বাচন কোনোভাবেই হতে দেয়া হবে না। তারা সংশ্লিষ্টদের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন না করার আহ্বান জানান। ইসি সূত্র জানায়, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের অফিসগুলোতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা নেই। নির্বাচনী অফিসগুলোর এমএলএসএস এবং পিয়নরা রাতে অফিসে থাকতে চাচ্ছে না। ইসিতে আসা কয়েকজন উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তার সাথে কথা বলে আরো জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে অফিস ও ব্যালট বাক্স পুড়িয়ে ফেলার কারণে এখন সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ব্যালট বক্সের নিরাপত্তার জন্য যারা রাতে এখন অফিসে থাকেন তারাও এখন আর থাকতে চাচ্ছেন না। ফলে এখন বিশেষ নিরাপত্তা না দিলে তফসিল ঘোষণার পর তাদের টিকে থাকাটা কঠিন হবে। ইসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, একতরফা নির্বাচন যে কি ভয়ানক হয় তা আমি গত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নিজ চোখে দেখেছি। ভোটাররা তো আসেননি ভয়ে। আর আমরা যারা ভোট কেন্দ্রে ভোট নেয়ার দায়িত্বে ছিলাম তারাও জীবন নিয়ে শঙ্কিত অবস্থায় বসেছিলাম। আতঙ্কে ছিল আমাদের পরিবারগুলো। এমনকি ইসি সচিবালয়ের ফটকের মধ্যে এসেও বোমা মারা হয়েছিল। আর এবারে নির্বাচন করা আরো কঠিন হবে। এখানে ভোট কেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের আগের রাতে যে থাকার নিয়ম আছে সেটিও হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, ভাই আমি ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও দায়িত্ব পালন করেছি। কী ঝামেলায় যে পড়েছিলাম! এবারো যদি তেমন হয়, তাই আগেভাগে কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না, দেখতে এসেছি। ছিয়ানব্বই সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ভাঙচুর হয়েছে। নাজেহাল ও হামলার শিকার হয়েছিলেন ভোট গ্রহণকারীরা। আওয়ামী লীগসহ বড় সব দল ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল। নির্বাচন কর্মকর্তার দফতরে সশরীরে আসার চেয়ে টেলিফোনে বেশি তদবির আসছে বলে জানান, নগর ও উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সমন্বয়কারী রনজিৎ কুমার সাহার সাথে কথা বললে তিনি জানান, নির্বাচনের সাথে শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীরা জড়িত। তারাই রাষ্ট্রীয় এই দায়িত্ব পালন করেন; কিন্তু আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের মধ্যে যে ধরনের রাজনৈতিক সঙ্ঘাত ও অস্থিরতা চলছে তাতে তারাও এখন নির্বাচনী দায়িত্ব পালন নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা উদ্বিগ্ন। শঙ্কিত তাদের পরিবার। তারা নির্বাচনী কাজে জড়িত না হওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের কাছে আবেদন করছেন। তারা এখন বিপদগ্রস্ত বলে জানিয়েছেন। সব দলের অংশ গ্রহণে নির্বাচন না হলে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী না। আর এই জন্য আগামী শনিবার শিক্ষক সমিতির জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। তাতে আমরা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নেবো। তারপর ঐক্যপরিষদের সাথে বৈঠক করব। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে পরিস্থিতির মধ্যে সরকার নির্বাচনের আয়োজন করতে যাচ্ছে তাতে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করাটাই স্বাভাবিক। যে ধরনের সহিংস পরিস্থিতির দিকে সরকার নিয়ে গেছে তাতে কেন্দ্রের কর্মকর্তারা তো এমনই আতঙ্কে থাকতে পারেন। বহু দিনের পুরনো গণতন্ত্রের ধারাকে নষ্ট করে এভাবে নির্বাচন করাটা ঠিক হচ্ছে না। বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতি অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া জানান, নির্বাচনের সাথে জড়িত প্রায় ছয় লাখ শিক্ষক ও কর্মচারী এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে আছেন। একতরফা নির্বাচনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে চাচ্ছেন না। শিক্ষক-কর্মচারীরা বলছেন, কেন্দ্রে গেলে তারা মারা পড়বেন। কে নেবে তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব। তিনি বলেন, গত নির্বাচনে কুমিল্লা সদর-লাকসাম অংশ নিয়ে গঠিত আসনে একজন শিক্ষককে ভোটগ্রহণের পর খুন করা হয়। তার নামাজে জানাজায় পর্যন্ত কেউ ভয়ে যেতে সাহস পায়নি। ফলে এখন সবার মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।