দুই হাজার নেতাকর্মীকে ধরতে অভিযান

প্রকাশিত: December 7, 2013 | সময়: 3:10 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ফের মামলার জালে পড়েছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তার মিত্র জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। গত দেড় মাসে সহিংস হরতাল-অবরোধে শুধু রাজধানীতেই বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তিন শতাধিক মামলা হয়েছে। এতে আসামি হিসেবে এজাহারে নাম রয়েছে দুই হাজারেরও বেশি নেতাকর্মীর। আর অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এজাহারে নাম থাকা দুই শতাধিকসহ হাজারখানেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে। এদিকে একের পর এক মামলা দায়েরের পর গ্রেফতার আতংকে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে জ্বালাও-পোড়াও মামলার আসামি বিএনপি-জামায়াতের দুই সহস াধিক নেতাকে পাকড়াও করার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে র‌্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, জনস্বার্থ সমুন্নত রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং আইন-শৃংখলা রক্ষার্থে পুলিশের প্রতিটি সদস্য দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। কোনো একটি ঘটনা ঘটলে যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধেই বিধিবিধান মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হয়। এক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সাহায্য-সহযোগিতা করার সুযোগ নেই। পুলিশও এটা করছে না বলে তার বিশ্বাস।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গত অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া তিন দিনের হরতালে ৭০টি মামলার পর গত দুই সপ্তাহে আরও দুই শতাধিক মামলা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের কাছে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব মামলায় বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে। বাকি নেতারা রয়েছেন আত্মগোপনে। স্থানীয় পর্যায়ের অনেক নেতাও গ্রেফতার হয়েছেন অনেক আগে। মাঠ পর্যায়ের পরীক্ষিত নেতাকর্মীরাও এলাকায় ভিড়তে পারছেন না পুলিশি তৎপরতার কারণে। এদের বেশির ভাগই বহু আগ থেকে এলাকাছাড়া। সূত্রগুলো বলেছে, গত দু’সপ্তাহের অবরোধ ও এর আগে হরতালে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংঘর্ষে শুধু রাজধানীতে আহত হয়েছেন তিন শতাধিক নেতাকর্মী। তবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির দাবি এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

জানা গেছে, নির্দলীয় সরকারের দাবিতে প্রথম ২৫ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় তিন দিনের টানা হরতালের ডাক দেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। ওই দিন সমাবেশ শেষেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। প্রথম দিনের এসব ঘটনায় শুধু রাজধানীর ২৫ থানায় ৩৬টি মামলায় ৫ শতাধিক নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। সহিংস এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অনেকেই গ্রেফতার হয়ে এখন কারাগারে।

এদিকে ২৬ অক্টোবর হরতাল চলাকালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতা ও মন্ত্রীর বাসভবন লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ফাঁড়িসহ যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ওই দিনই প্রায় অর্ধশত মামলা হয় রাজধানীর বিভিন্ন থানায়।

২৮ অক্টোবর সারা দেশে সংঘর্ষে নিহত হন ৬ জন। এদিন রাজধানীতে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ এবং ভাংচুর অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয় ৩৮টি। ২৯ অক্টোবর টানা তিন দিনের হরতালের শেষ দিনে সারা দেশে সংঘর্ষে মারা যান ৬ জন। রাজধানীতেও ঘটে ব্যাপক সহিংস ঘটনা। এসব সহিংস ঘটনায় রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ৬৭টি মামলা হয়। এর মধ্যে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় দায়ের করা একটি মামলায় বিএনপি নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে হুকুমের আসামি করা হয়। এ মামলায় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ২৩ নেতাকর্মীর নামসহ অজ্ঞাতনামা অনেককেই আসামি করা হয়। অন্যান্য থানায় দায়ের করা মামলায় বিএনপি ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ছাড়াও মাঠ পর্যায়ে দুই শতাধিক নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়। এসব মামলায় বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের অজ্ঞাতনামা কয়েক হাজার নেতকর্মীকে আসামি করা হয়। অন্যদিকে হরতাল চলাকালে তাৎক্ষণিক সাজা দেয়া হয় শতাধিক নেতাকর্মীকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, গত দুই সপ্তাহে অবরোধ চলাকালে সারা দেশের মতো রাজধানীতেও ব্যাপক সহিংস ঘটনা ঘটে। পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল, বোমাবাজি, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ ছাড়াও যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। শুধু গত দু’সপ্তাহের এসব সহিংস ঘটনায় রাজধানীর ৪৯ থানায় মামলা হয়েছে দুই শতাধিক। এসব মামলার বেশির ভাগই বিএনপি নেতাদের হুকুমের আসামি বা নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ নভেম্বর রোববার রাজধানীর শাহবাগে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াতের ১৭ শীর্ষ নেতার নাম উল্লেখ করে ৫৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পুলিশ। শাহবাগ থানার ওই মামলায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ ১৭ নেতাকে হুকুমের আসামি করা হয়। এছাড়া বিরোধী দলের আন্দোলন চলাকালে মালিবাগে যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগে মাহবুবুর রহমান নামে এক যাত্রীর মৃত্যু, পল্টন, পুরান ঢাকা ও রামপুরা থানার একাধিক মামলায় আসামি করা হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের।

বিরোধী দলের নেতারা বলছেন, এসব মামলায় আসামি করার মাধ্যমে আগে থেকেই বিএনপি নেতাদের গ্রেফতারে ফাঁদ তৈরি করে রেখেছে পুলিশ। এখন সরকারের ইশারা পেয়ে পুলিশ এসব মামলায় বিএনপির নেতাদের গ্রেফতার করছে। অন্যদিকে মামলাগুলোর এজাহারে দু-একজনের নাম থাকলেও সব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি রাখছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বিরোধী দল দমনে সরকারের ইশারায় পুলিশের বিশেষ কৌশল অবলম্বন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র যুগ্ম-কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম অবশ্য এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। আর রাজনৈতিক পরিচয়ে পুলিশ কাউকে আটক বা গ্রেফতারও করে না। মনিরুল ইসলাম বলেন, যারা অপরাধ করবে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই শুধু তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা যে দলেরই হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা পুলিশের কাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এর আগে বিভিন্ন সময়ে দায়ের হওয়া মামলা নিয়ে এমনিতেই বিপাকে রয়েছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা। সাম্প্রতিক সময়ে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে নতুন করে দায়ের হওয়া এসব মামলা তাদের কাছে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবরের পর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, বোমা ও ককটেল নিক্ষেপ, পুলিশের ওপর হামলা ও হানাহানির ঘটনায় শুধু রাজধানীর ৪৯ থানায় ৩১৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার বেশ কয়েকটিতে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা হুকুমের আসামি।