পোলট্রিশিল্পে বিপর্যয়

প্রকাশিত: December 12, 2013 | সময়: 5:55 am

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজনৈতিক সহিংসতা ও হরতাল-অবরোধে গত তিন মাসে পোলট্রিশিল্পে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা। গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি করেছেন এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছয় সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির নেতারা।

পোলট্রিশিল্প খাতের নেতারা সব বিরোধ মিটিয়ে অবিলম্বে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা পোলট্রি খাদ্য, ডিম, মুরগি এবং ওষুধ বহনকারী গাড়ি হরতাল-অবরোধের আওতামুক্ত রাখারও আহ্বান জানান।

এদিকে গতকাল বিকেলে এক সংবাদ বিজ্ঞতিতে জানানো হয়, পুঁজি ও পেশার নিরাপত্তা দাবি করে পোলট্রি খাতের নেতারা প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দেন।

পোলট্রি খাতের ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই শিল্প ধ্বংস হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বেড়ে যাবে। এ কারণে অপুষ্টির শিকার মা ও শিশুর সংখ্যা বাড়বে, খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে, মেধার বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কো-অর্ডিনেশন কমিটির আহ্বায়ক মশিউর রহমান বলেন, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পোলট্রিশিল্পে যে লোকসান হয়েছে, তা বহন করার সামর্থ্য তাঁদের নেই। তিনি বলেন, প্রায় ৩০ শতাংশ খামার ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো টিকে আছে, তা ঋণের দায়ে জর্জরিত হচ্ছে। পোলট্রি খামারি, ফিড ও ওষুধ প্রস্তুতকারক, বিপণনকারীসহ পোলট্রি খাতের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকঋণ পুনঃ তফসিল ও সুদ মওকুফ করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া খামারগুলো আবার চালুর জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে এ খাতের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ চান তিনি।

ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) মহাসচিব সাইদুর রহমান বলেন, প্রায় ৩৫ টাকা খরচ করে যে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়, তা গড়ে মাত্র ১৫-২০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। ১১০-১২০ টাকায় এক কেজি ওজনের মুরগি তৈরি করে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭০-৮০ টাকায়। তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহে ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ। হরতাল-অবরোধের কারণে অবিক্রীত থাকছে প্রায় ৩০ শতাংশ বাচ্চা। এ জন্য গত তিন মাসে প্রায় ১৬৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ বাচ্চা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে বিক্রি করে লোকসান হয়েছে প্রায় ২১৮ কোটি টাকা। বাচ্চায় মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩৮২ কোটি টাকা।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ফিআব) সাধারণ সম্পাদক ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বলেন, গত তিন মাসে প্রত্যাশিত উৎপাদন-চাহিদা ছিল প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন; যার দাম প্রায় দুই হজার ৪০০ কোটি টাকা। হরতাল-অবরোধের কারণে এখাতে ৩৫-৪০ শতাংশ চাহিদা কমে গেছে।

বাংলাদেশ এগ প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহের আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, প্রতি সপ্তাহে ডিম উৎপাদিত হয় প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ পিস। হরতাল-অবরোধে নষ্ট বা অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে ৩০ শতাংশ ডিম। ১৩ সপ্তাহে লোকসান হয়েছে প্রায় ২৬৬ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ ডিম খামারিকে বিক্রি করতে হয়েছে গড়ে প্রায় পাঁচ টাকা দরে, অথচ উৎপাদন খরচ ছয় টাকা। সে হিসাবে তিন মাসে ডিম বিক্রি করে লোকসান হয়েছে প্রায় ৩৬৪ কোটি টাকা। এখাতে গত তিন মাসে লোকসান হয়েছে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা।

ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার (ওয়াপসা-বিবি) সাধারণ সম্পাদক রফিকুল হক বলেন, কমার্শিয়াল ব্রয়লার মুরগির মাংসের মাসিক উৎপাদন প্রায় ৬০ হাজার টন। তিন মাসে এ খাতে লোকসান হয়েছে প্রায় ৯৭৫ কোটি টাকা।

অনুষ্ঠানে এফবিসিসিআইর সহসভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, রাজনীতির আগুনে এখন পুড়ছে বাংলাদেশের পোলট্রিশিল্প।