বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ রাজনৈতিক বিবাদের জেরেই দুই গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ভারতের হাওড়ার আমতায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও সিপিআইএম নেতারা এ অভিযোগ করেছেন। প্রাথমিকভাবে পুলিশও এমন ধারণা করছে।
গত মঙ্গলবার রাতে আমতার মুক্তিরচক গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ট্রান্সফর্মারের সুইচ নিভিয়ে গোটা এলাকা অন্ধকার করে বাড়িতে ঢুকে দুই মহিলাকে গণধর্ষণ করা হয়। শুধু তাই নয়, মদ্যপ দুর্বৃত্তরা ব্লেড দিয়ে তাদের দেহের বিভিন্ন অংশ চিড়ে দিয়েছে।
এ ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত বরুণ মাকাল এলাকায় তৃণমূলকর্মী বলেই পরিচিত। সে আপাতত পলাতক। তবে তার সাতজন সঙ্গীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকিদের খোঁজ চলছে।
গ্রামবাসীদের একাংশ এবং স্থানীয় সিপিএম নেতৃত্ব ঘটনার পিছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ এনেছেন। তাঁরা বলছেন, বেশকিছুদিন ধরে গ্রামের সিপিআইএম সমর্থকদের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক গণ্ডগোলও চলছিল। এ নিয়ে সম্প্রতি শাসক ও বিরোধী দলের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষও হয়।
আমতা থানায় অভিযোগ দায়েরের পর শুরু হয় ধরপাকড়। স্থানীয় নেতাদের দাবি, তবে পুলিশ কেবল সিপিআইএম সমর্থকদেরই গ্রেপ্তার করে। আতঙ্কে তাই পুরুষরা ছিলেন গ্রামছাড়া। সেই সুযোগেই মঙ্গলবার রাতে দুই গৃহবধূকে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা।
এ ঘটনা আটক সাতজনকে বুধবার উলুবেড়িয়া অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে তোলার পরে ১০ দিনের রিমাণ্ডে নিয়েছে পুলিশ। এরা সবাই মুক্তিরচক গ্রামেরই বাসিন্দা। এদের নাম শঙ্কর মাকাল, ঝন্টু মণ্ডল, গৌরহরি মাকাল, শ্রীকান্ত পাত্র, বংশী গায়েন, গৌতম মাকাল এবং নব গায়েন।
ধর্ষিতা দুই মহিলা উলুবেড়িয়া মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চার সদস্যের একটি চিকিৎসক দল তাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করেছেন। পরীক্ষায় ধর্ষণের প্রাথমিক প্রমাণও মিলেছে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।
পুলিশের একাংশ জানাচ্ছেন, বিবাদের ইতিহাস পঞ্চায়েত ভোটের সময় থেকেই শুরু। আমতা গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূল দখল করলেও মুক্তিরচক এলাকা থেকে দুজন সিপিএম-সমর্থিত নির্দলীয় প্রার্থী জিতে যান। অভিযুক্ত বরুণ তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে ভোটে হারে। গত ১৭ ডিসেম্বর একটি রাস্তার কাজকে কেন্দ্র করে নির্যাতিতা বধূর স্বামীর সঙ্গে বরুণের মারামারি হয়। বরুণকে মারধরের দায়ে বধূর স্বামীকে গ্রেপ্তারও করেছিল পুলিশ। ১৫ দিন আগে জামিন পান তিনি। কিন্তু ঘরে ফিরতে পারেননি। তার খোঁজে বরুণরা মঙ্গলবার রাতে ওই বাড়িতে চড়াও হয় বলে পুলিশের ধারণা।
আটককৃতরা জেরায় স্বীকার করেন, বরুণের প্ররোচনাতেই তারা হামলা চালিয়েছিল। নির্যাতিত পরিবারটির বাড়ি খাল পাড়ে, রাস্তার ধারে। তিনটি পাকা গাঁথুনির ঘর, টালির চাল। একটি ইটের পাঁচিলও রয়েছে, তবে তার পাল্লা টিনের।
স্থানীয় গণমাধ্যমের বিবরণ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সারা দিন সরস্বতী পুজার ব্যস্ততার পর দুই বছরের শিশুকন্যাকে নিয়ে ঘরে শুয়েছিলেন বধূ (২৮), সঙ্গে তাঁর শাশুড়িও ছিলেন। পাশের ঘরে শুয়েছিলেন বধূর চাচি শাশুড়ি (৪০)। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ১০-১২ জন মদ্যপ টিনের দরজা খুলে ভিতরে ঢোকে।
পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে জানা গেছে, দুর্বৃত্তরা বারান্দার হারিকেনটি আছাড় মেরে ভাঙে। শব্দ শুনে বধূর চাচি শাশুড়ি নিজের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেই কয়েকজন তাদের গলার মাফলার দিয়ে তার হাত পা এবং মুখ বেঁধে ফেলে। ঘরের ভিতরে ঢুকে আসবাবপত্র তছনছ করে। এর পরে কয়েকজন তাকে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। বাকিরা পাশের ঘরের দরজা লাথি মেরে ভাঙে। শিশুকন্যাটি কেঁদে উঠলে ওরা তাকে ছুড়ে ফেলে দেয় উঠোনে। তার পরে বধূকে উঠোনে টেনে নিয়ে গিয়ে চার-পাঁচ জন মিলে ধর্ষণ করে। কোনো রকমে ফাঁক গলে পালান বধূর শাশুড়ি। তিনি পালিয়ে গিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেন।
ট্রান্সফর্মারের সুইচ নিভিয়ে দেওয়ায় এমনিতেই গোটা এলাকা অন্ধকার ছিল। তার ওপর আশপাশের বাড়িগুলো ছিল পুরুষশূন্য। প্রতিবেশীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবাদের জেরেই পাঁচ-ছটি পরিবারের পুরুষরা দীর্ঘদিন ঘরছাড়া হয়ে রয়েছেন। ফলে সেদিন রাতে দুষ্কৃতকারীদের তাণ্ডব টের পেয়েও ভয়ে এগিয়ে আসতে পারেননি অন্য বাড়ির মহিলারা। ফাঁড়ি থেকে খবর যায় আমতা থানায়। বিশাল পুলিশ বাহিনী এসে গ্রাম থেকেই প্রথমে দুজনকে ধরে। তাদের জেরা করে রাতেই আশপাশের গ্রাম থেকে বাকিদের ধরা হয়।
সিপিএম জেলা সম্পাদক বিপ্লব মজুমদার ওইদিন বলেন, আমাদের বহু সমর্থক ঘর ছাড়া। পরিবারের মহিলারা অরক্ষিত। যারা এখনো সিপিএম সমর্থক রয়েছেন, তাদের ভয় দেখাতে ওই মহিলাদের ওপর অত্যাচার চলছে।

