কালিয়াকৈরের পঁচা মিয়ার এক কাপ মালাই চায়ের গল্প

প্রকাশিত: May 19, 2025 | সময়: 8:38 pm

পঁচা মিয়া শুধু চা বিক্রি করেন না, বিক্রি করেন এক গর্বিত আত্মমর্যাদা

নুর আলম সিদ্দিকী মানু:
চায়ের কাপ হাতে আপনি হয়তো কখনও ভাবেননি, একটি কাপের ভেতর গাঁথা থাকতে পারে এক জীবনের সংগ্রাম, এক চরিত্রের দৃঢ়তা, কিংবা এক নিঃসঙ্গ অথচ প্রেরণামূলক কাহিনি। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের নাবিরবহর গ্রামে প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এমনই এক জীবন কথা ফোঁটে দুধে-মিশে, এক কাপ মালাই চায়েতে।

সেই চায়ের কারিগর ৯০ বছরের রহিম উদ্দিন, যাকে সবাই ডাকেন ‘পঁচা মিয়া’।
ছোট্ট একটি ঝুপড়ি, মোড়ানো পলিথিনে। নেই ঝকঝকে চেয়ার, নেই টিনের ছাউনি। কিন্তু আছে এক কাপ চায়ের জন্য শত শত মানুষের অপেক্ষা। কারণ এটি কেবল চা নয়, এটি পঁচা মিয়ার আত্মার অংশ।

এই দোকানে একটিই নিয়ম—একজন মাত্র এক কাপ চা পাবেন। লক্ষ টাকা দিলেও দ্বিতীয় কাপ নয়। এমন কড়াকড়ির পেছনে নেই অহংকার, আছে আত্মমর্যাদা। তিনি বলেন, “এক কাপই দেই, কারণ এই কাপেই আমার চরিত্র, আমার নিয়ম।”
এই দৃঢ়তা আজকের দিনে এক উদাহরণ, যেখানে অনেকে নিয়ম বেচে দেয় টাকার কাছে।

চা তৈরির প্রক্রিয়াটিও কম অভিনব নয়। মাটির চুলায় তিন ঘণ্টা ধরে ৪০ কেজি খাঁটি গরুর দুধে তৈরি হয় এই চা। সামান্য লিকার ও চিনি মিলিয়ে এক কাপ যখন গরম গরম এসে সামনে দাঁড়ায়, তখন তা শুধুই পানীয় নয়—সে এক শিল্পকর্ম। শুক্রবারে চাহিদা এত বেড়ে যায় যে দরকার পড়ে ৮০ কেজি দুধের।

চায়ের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকার মহাখালীতে, ওস্তাদ মহসিন মুন্সির কাছে শেখা সেই দিনগুলোতে। তখন এক কাপ চা বিক্রি করতেন মাত্র ১০ পয়সায়। সাত দশক পেরিয়ে এখন সেই কাপের দাম ২০ টাকা। কিন্তু পঁচা মিয়ার জীবন? এখনো দরিদ্র, এখনো একাকী, কিন্তু গর্বিত।

প্রতিদিন ৪-৫ হাজার টাকার চা বিক্রি হলেও তা দিয়ে চলে না স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন। কিন্তু তবু এই মানুষটি দান চান না, করুণা চান না। বরং তিনি চান শ্রদ্ধা। তার পরিশ্রম, নিষ্ঠা আর সত্যিকার অর্থে ব্যবসার এক অদ্বিতীয় দর্শন আমাদের নতুন করে ভাবায়—জীবন মানেই শুধু টাকা নয়, চরিত্রও এক সম্পদ।

এই প্রতিবেদন শুধু এক কাপ চায়ের স্বাদের বিবরণ নয়—এ এক অসাধারণ মানুষের জীবনচরিত, যা আমাদের প্রত্যেককে স্পর্শ করে, নড়েচড়ে বসায়।

এক কাপ চা, এক গল্প, এক চেতনা।
এবার আমাদের পালা—পঁচা মিয়ার গল্পকে সম্মান জানানোর।