সাতক্ষিরা প্রতিবেদকঃ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ১৩ অক্টোবর (সোমবার) বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’।
জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও বিপদ মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সমন্বিত উদ্যোগ, প্রতিরোধ করি দুর্যোগ’। মানব সৃষ্ট দুর্যোগ কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ এখন মানব সৃষ্ট দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশি দেশ ভারতেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে মানব—সৃষ্ট মৃত্যু ১৫ গুণ বেশি। উত্তোরণে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। পরবর্তী প্রজন্মকে গুনতে হবে মাশুল।
অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে তৈরি হচ্ছে বস্তি সমস্যা। জলাধারগুলো ভরাট হয়ে গেছে, খালগুলো অপদখল হয়ে গেছে। নেই সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বাঁচার স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ। পরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে ওঠলে যানজট, লোডশেডিং, জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাগুলো তৈরি হতো না। গ্রাম পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে মানুষ এভাবে শহরমুখী হতো না। নগরে এমন বদ্ধ রুমেও মানুষ থাকছে, যেখানে আলো বাতাস পৌঁছায় না। এমন বিল্ডিংও আছে, যেগুলো সাধারণ মাত্রার ভূমিকম্পনও সহ্য করতে পারবে না।
অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে বায়ু ও পানি দুষিত হয়েছে। শব্দ দূষণে তৈরি হয়েছে শিল্প কারখানার আশেপাশের মানুষের শারীরিক ও মানসিক নানা রোগ। বিষাক্ত ধোঁয়া ও শিল্প বর্জ্যের কারণে মাটি গুণাগুণ হারিয়েছে, জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়েছ।
মানুষ তার প্রয়োজনে যে পরিমাণ বৃক্ষ কেটেছে, সেই পরিমাণ বৃক্ষ লাগায়নি। বন উজার করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়াতে সহায়তা করেছে। পাহাড় থেকে মাটি কেটেছে, নদী থেকে বালু উত্তোলন করেছে। এক শ্রেণীর পাহাড় ও বন খেকোর লোলুপ দৃষ্টিতে উজার হতে হতে অনেক বনই বিলুপ্তির পথে চলে গেছে। ফলে বাড়ছে পাহাড় ধ্বস, পাহাড়ের ঐতিহ্য হারানোর পাশাপাশি বিলুপ্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, মরুকরণ ঘটেছে। আর এসবের কারণে বাড়ছে খরা, ঘটছে মরুকরণ,মানবসৃষ্ট কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে কৃষিতে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে, যার মধ্যে রয়েছে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, কালভার্ট দখল, এবং অব্যবস্থাপনা। এর ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কৃষকদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে এবং অর্থনৈতিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া বাঁধ নির্মাণ করা হলে তা উপকূলীয় কৃষি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর দিনটি পালিত হয়ে আসছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প কিংবা খরা—প্রতিটি দুর্যোগ মানবজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। গত দুই দশকে দেশে ১৮৫টির বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে, যার অধিকাংশের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে উপকূলীয় এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক সময় অনুমানের চেয়ে বেশি হয়। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এজন্য সরকারি বাজেট ও আন্তর্জাতিক সহায়তায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (ডিআরআর) খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি, যাতে ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো আরও স্থিতিশীল ও ঝুঁকি—সচেতন হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে দুর্যোগজনিত মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। যথাযথ বিনিয়োগ ছাড়া এসব দেশে দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্তি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে।
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে আন্তর্জাতিকভাবে দিকনির্দেশনা দেয় ‘সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক ফর ডিআরআর (২০১৫—২০৩০)। এটি একটি বৈশ্বিক চুক্তি, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দুর্যোগ থেকে উন্নয়ন অর্জন রক্ষা ও টেকসই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। এই দিবসটি মূলত সেই লক্ষ্যগুলোর অগ্রগতি মূল্যায়ন ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলায় কেবল সরকার নয়, প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ অপরিহার্য। পরিবার ও সমাজস্তরে দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপই পারে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমিয়ে আনতে। তাই আজকের দুর্যোগ প্রশমন দিবস হোক ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত সচেতনতার নতুন অঙ্গীকার

