বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াও শুরু করেছে সরকার। গত সপ্তাহে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা চেয়ে জ্বালানি বিভাগের কাছে চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠকও করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর বিইআরসির কাছে প্রস্তাব জমা দেবে বিতরণ কোম্পানিগুলো। গণশুনানি শেষে শিগগিরই গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে।
জানা যায়, সর্বশেষ ২০০৯ সালের আগস্টে সব ধরনের গ্যাসের মূল্য ১১ দশমিক ২২ শতাংশ বাড়িয়েছিল বিইআরসি। এছাড়া ২০১১ সালে দুই দফায় সিএনজির দাম বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার ৩০ টাকা করা হয়। এরপর ২০১২ সালের মে মাসে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় পেট্রোবাংলা। কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে পৃথক প্রস্তাব জমা দেয়ার পরামর্শ দেয় বিইআরসি। যদিও শেষ পর্যন্ত গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সেবার সরে আসে সরকার।
এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান ড. হোসেন মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, বিইআরসির কাছে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আবেদন জমা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। মন্ত্রণালয়ের কাছে নির্দেশনা চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। নির্দেশনা পেলেই মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি আরো বলেন, ‘গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর আগে শুধু উত্পাদন খরচ বিবেচনায় নেয়া হয়। অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ক্ষেত্রে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপ এবং কূপ খননের ব্যয় যোগ করা হয় হয়নি। এসব খরচ সমন্বয় করে একটি সুস্পষ্ট নীতি করার কথা জ্বালানি বিভাগকে বলেছি।’
গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের নীতিমালায় দেখা যায়, মূল্যবৃদ্ধির সময় গ্যাসকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। কোম্পানির উত্পাদন খরচের সঙ্গে সামান্য মার্জিন (লাভ) বিবেচনা করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। উত্পাদন পর্যায়ের সব খরচ এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় না। এ কারণে দেশে গ্যাসের দাম অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো থেকে প্রতি ইউনিট (হাজার ঘনফুট) গড়ে ৩ ডলারে গ্যাস কেনে সরকার। অথচ শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা হয় প্রতি ইউনিট ২ দশমিক ১৯ ডলারে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে শিল্পে ব্যবহূত গ্যাসের দামে সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে বাংলাদেশে। ভারতে এর দাম আট গুণ বেশি। অন্যান্য খাতেও অত্যন্ত নিম্নমূল্যে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এছাড়া উত্পাদন পর্যায়ে ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে। তাই দাম পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ম. তামিম বলেন, শুধু শিল্পে নয়, সর্বক্ষেত্রে গ্যাসের দাম অনেক কম। শিল্পে গ্যাস অপচয়ের অন্যতম কারণ এর স্বল্পমূল্য। তাই গ্যাসের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিকল্প নেই। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পেলে দাম বেশি দিতেও আপত্তি নেই শিল্প গ্রাহকদের।
এর আগে জমা দেয়া প্রস্তাবে আবাসিক ছাড়া সাত ধরনের ব্যবহারকারী বিদ্যুত্, সার, ক্যাপটিভ পাওয়ার, শিল্প, চা বাগান, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে দাম বাড়নোর সুপারিশ করে পেট্রোবাংলা। এ প্রস্তাবে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১০৩ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০২ দশমিক ৯৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয় ক্যাপটিভ পাওয়ার খাতে। এছাড়া শিল্পে ৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ বাড়নোর প্রস্তাব করা হয়। এটি বাস্তবায়ন হলে শিল্প-কারখনায় ব্যবহূত প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম বাড়ত প্রায় ৫৫ টাকা।
বর্তমানে বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ৭৯ টাকা ৮২ পয়সা। পেট্রোবাংলার প্রস্তাবনায় ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৮৪ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়। এছাড়া সার কারখানায় ৭২ টাকা ৯২ পয়সা থেকে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ বাড়িয়ে ৮০ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ১১৮ টাকা ২৬ পয়সা থেকে ১০২ দশমিক ৯৪ শতাংশ বাড়িয়ে ২৪০ টাকা, শিল্পে ১৬৫ টাকা ৯১ পয়সা থেকে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ২২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া সিএনজি স্টেশনে সরবরাহ করা গ্যাসের দাম ৩৯ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করে প্রতিষ্ঠানটি।
এ প্রসঙ্গে বিইআরসি সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ বলেন, পেট্রোবাংলা সরাসরি গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ করে না। তাই তাদের আবেদনের ভিত্তিতে কমিশন দাম বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে না। পেট্রোবাংলার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে। বিতরণ কোম্পানিগুলো আবেদন করার পর কমিশন তা মূল্যায়ন করে গণশুনানির ব্যবস্থা করবে।
প্রসঙ্গত, সারা দেশে আবাসিক গ্রাহক গ্যাস ব্যবহার করেন মোট উত্পাদনের মাত্র ১১ শতাংশ। এছাড়া শিল্পে ব্যবহার ৩৩ শতাংশ (ক্যাপটিভ বিদ্যুত্সহ), বিদ্যুতে ৪২, সিএনজিতে ৬ ও সার কারখানায় ৭ শতাংশ। বাকি গ্যাস ব্যবহার হয় চা বাগান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে গৃহস্থালিতে এক চুলায় ব্যবহূত গ্যাসের জন্য মাসে ৪০০ ও দুই চুলার জন্য ৪৫০ টাকা দিতে হয়। বেঙ্গলিনিউজটোয়েন্টিফোর.কম ডেস্ক:

