কাঁঠাল নিয়ে বিপাকে প্রান্তিক চাষীরা, কাগজে—কলমে নানা উদ্যোগ

প্রকাশিত: July 5, 2026 | সময়: 9:19 pm

এম আরমান হোসেন
স্টাফ রিপোর্টার:
গাজীপুর জেলাকে বলা হয় কাঁঠালের রাজধানী। গাজীপুর জেলার জিআই পণ্যও হলো কাঁঠাল। এখানকার মাটি ও আবহাওয়ার কারণে কাঁঠালগুলো অত্যন্ত বড়, মিষ্টি এবং সুগন্ধযুক্ত হয়। এদিকে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশও বাংলাদেশ। মিষ্টতা, সুবাস ও উৎপাদনে এগিয়ে থাকলেও বিপণন সংকট এবং পর্যাপ্ত মূল্য না পাওয়ায় হতাশ কাঁঠাল চাষিরা। বাজারে কাঁঠালের স্তূপ থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা ও দাম একেবারেই কম। অনেক বাগানে পাকা কাঁঠাল গাছেই নষ্ট হচ্ছে, কিন্তু বিক্রির আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। এ কাঁঠালই যেনও অনেক চাষীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়ের এই ভরা মৌসুমে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ ও জয়দেবপুর অঞ্চলের প্রতিটি প্রাথমিক ও পাইকারি বাজারে সাজানো রয়েছে কাঁঠাল কিন্তু নেই পর্যাপ্ত মূল্য। চাষীরা বলছেন, যে ভাড়ায় বাজারে কাঁঠাল নিয়ে আসি বিক্রির জন্য বিক্রির পর সে ভাড়ার মূল্যই পাওয়া যায় না।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর এ উপজেলায় ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৫২৪ টন।
তথ্য বলছে, গাজীপুরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর অতিথি আপ্যায়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল। লাল মাটির এই জেলায় এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যে বাড়িতে অন্তত একটি কাঁঠাল গাছ নেই। গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা ভাওয়াল গড়ের এই কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়, বরং এই অঞ্চলের মানুষের আবেগ, যত্ন ও গর্বের প্রতীক।
২০২৫ সালে গাজীপুরের কাঁঠাল ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে, কিন্তু এত অর্জনের পরও বাজারে কাঁঠালের দরপতনে হতাশ স্থানীয় চাষিরা। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাঁঠাল নিয়ে কাজ করলেও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা এ সুবিধা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গাজীপুরের কাঁঠাল রপ্তানির এক বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও তারা কিভাবে এটার সাথে যুক্ত হবেন এ নিয়েও তাদের নেই বিশেষ জ্ঞান।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আউলিয়া খাতুন বলেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে কাপাসিয়ার কাঁঠাল রপ্তানি হয়ে থাকে। সম্প্রতি একটি চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে কাপাসিয়ার কাঁঠাল চীনে রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উৎপাদিত কাঁঠালের সংরক্ষণ ও বহুমুখী ব্যবহারের ব্যবস্থা করা গেলে বাজারমূল্য বাড়বে। এ বিষয়ে শিগগিরই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন চাষী ও উদ্যোক্তারা বলছেন, সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাঁঠাল নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা বললেও এসব কাগজে—কলমে। বেশিরভাগ চাষীরা জানেনই না, কাঁঠাল নিয়ে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কি কাজ করে, কিভাবে করে। শুধুমাত্র সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং আধুনিক সংরক্ষণের অভাবে মৌসুমের সময় অযত্ন, অবহেলার শিকার হয় এ জাতীয় ফল কাঁঠাল। সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে এটি দেশের কৃষিখাত ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক দেশ হলো চীন। বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে দেশটি। কিন্তু বাস্তবে সেই দৃশ্য কম দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোকে টপকে বাংলাদেশ বড় বাজার ধরতে পারে। এর জন্য কোল্ড চেইন (ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা) ও বিমানযোগে পণ্য পরিবহনের সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।
গাজীপুরে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ—পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে কৃষকরা যাতে অধিক লাভবান হয় সেজন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কাঁঠাল চাষিদের প্রশিক্ষণ প্রদান করছে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভুঁইয়া বলেন, গাজীপুর হচ্ছে কাঁঠালের রাজধানী। কাঁঠাল নিয়ে সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বর্তমানে এখানে কাঁঠালের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাজার রয়েছে। আমরা কাঁঠাল ও এর প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছি। এটি সফল হলে এই বাজার দু’হাজার কোটিতে নেওয়া সম্ভব।