ইসির পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামবে বিএনপি

প্রকাশিত: March 25, 2014 | সময়: 10:00 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ উপজেলা নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে নামবে বিএনপি। সে আন্দোলনকে সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনে রূপ দেয়ার নানা প্রস্তুতি চলছে ১৯ দলীয় জোটে। দলটির নীতি-নির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের নানা বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত, উপজেলা নির্বাচনে অনিয়ম ও সহিংসতার সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সে সব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি করা হবে একটি প্রতিবেদন। নির্বাচনের পর বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহলের উদ্দেশে অনিয়মের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হবে। এরপর নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগ ইস্যুতে আন্দোলনে যাবে ১৯ দল। বিএনপি নেতারা জানান, আন্দোলনের অংশ হিসেবে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা। তাই অব্যাহতভাবে অনিয়ম ও সহিংসতা বাড়লেও তাৎক্ষণিক কর্মসূচি দিচ্ছে না বিরোধী জোট। কারণ নির্বাচনে ভোট কারচুপি ছাড়াও কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই, এজেন্টদের বের করে দেয়া, কেন্দ্রের গেটে সরকারদলীয় কর্মীদের মহড়া, জোর করে সিল মারা, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, নির্বাচন চলাকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের রহস্যময় বিদেশ সফরের ঘটনাগুলোর ব্যাপক প্রচার সরকার ও কমিশনের সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হবে পরবর্তী চূড়ান্ত আন্দোলন। এ জন্য চতুর্থ ধাপের নির্বাচনের আগে পুলিশ সুপারদের রদবদল ও প্রয়োজনীয় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনাসহ স্ট্রাইকিং ফোর্সকে নির্বাচনী এলাকায় দৃশ্যমান করার সিদ্ধান্তগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিরোধী নেতারা। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নয়- আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সবধরনের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থেকেছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন। জাতীয় নির্বাচনে তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে শক্ত অবস্থান নিলে কখনও একতরফা নির্বাচন হতো না। আবার উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলও সরকারের পক্ষে নেয়ার জন্য যা কিছু করা দরকার সবই করেছে। মেরুদণ্ডহীন এ নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই আমাদের আন্দোলন কর্মসূচি আসবে।

সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী তিন মাসের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। নেতারা জানান, বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল চেয়েছিল মহাজোট সরকার সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ পূর্ণ করুক। ততদিনে আন্দোলন ও আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধান আসতে পারে। তাই চূড়ান্ত আন্দোলনে যেতে কিছুটা বিলম্ব করেন তারা। যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল জানান, ১৯ দল মনে করেছিল দেশের জনগণের দাবি ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত আহ্বানকে সম্মান জানিয়ে শেষ মুহূর্তে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। সরকারের তরফে আলোচনার নানা আহ্বান ও সংসদ বহাল রাখায় বিরোধী নেতারা মনে করেছিলেন শেষ মুহূর্তে সংবিধানের সংশোধনী এনে হয়তো সংসদের মেয়াদপূর্তির তিন মাস পরেই নির্বাচনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্তু সরকারের মনোভাবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একতরফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ফলে পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব হয়নি। উল্টো নবম সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় দশম সংসদের এমপিদের শপথ পড়ানোর মাধ্যমে লঙ্ঘিত হয়েছে সংবিধান। নেতারা জানান, জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোসহ অন্যান্য কূটনীতিক যখন সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তখন সংবিধানের দোহাই দিয়ে রীতিমতো নির্বাচনী কর্মকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে কমিশন। কমিশনের এ পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থানের কারণে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ সেটাকে ‘নিয়ম রক্ষার’ নির্বাচন আখ্যায়িত করে পুরো পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বিরোধী নেতারা বলেন, জাতীয় নির্বাচনে নিবন্ধিত প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান কমিশন তাদের সে দায়িত্বে চরম স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিয়েছে। আন্দোলনরত বিরোধী দলকে নির্বাচনে নেয়ার ব্যাপারে কমিশনের পক্ষে ন্যূনতম ইতিবাচক ভূমিকা ছিল না। উল্টো অনেক সময় সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নানা ধরনের বেফাঁস মন্তব্য করে বিরোধী দলের নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এমনকি নির্বাচনের আগমুহূর্তে বিরোধী দলীয় নেতাকে নিজ বাসভবনে বালির ট্রাক দিয়ে আটকে রাখা হলেও কমিশন কোন ভূমিকা নেয়নি। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজির সৃষ্টি হয়েছে। ১৫৩টি আসনে নির্বাচন ছাড়াই বিজয়ী হয়েছে সরকারদলীয় প্রার্থী। বাকি ১৪৭টি আসনে নির্বাচন হলেও সেখানে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ৫ই জানুয়ারির একতরফা জাতীয় নির্বাচন দেশের বেশির ভাগ মানুষ বয়কট করেছে।

এদিকে জনমত ও জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে থাকলেও উপজেলা নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল মিলছে না বিএনপির। প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান ছিল খুবই কম। তৃতীয় ধাপ থেকে পরিস্থিতি পুরো পাল্টে যায়। ঘুরে দাঁড়ানোর বদলে রীতিমতো বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনেও সরকারের মনোভাব অনুযায়ী পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। বিরোধী নেতারা জানান, নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালিত হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারেনি। এমনকি সে উদ্যোগও নেয়নি। তারা বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে পিছিয়ে পড়ার পর বাকি নির্বাচনগুলোতে ঘুরে দাঁড়াতে ফলাফল নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটে সরকারি দল। তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা নৈরাজ্যের চূড়ান্ত করেছে। এ কাজে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা করছে স্থানীয় প্রশাসন। নেতাদের অভিযোগ, একদিকে বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর হামলে পড়ছে সরকারদলীয় তৃণমূল নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে সরকারবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনের সময় দায়েরকৃত মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান ও হয়রানির মাধ্যমে দৌড়ের ওপর রেখেছে বিরোধী নেতাকর্মীদের। নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়া দূরে থাকুক তারা এলাকাছাড়া হয়েছেন। ফলে নির্বাচনে বেশির ভাগ কেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট পর্যন্ত দিতে পারেননি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, বেশির ভাগ উপজেলায় জবর-দখলের ব্যাপক অপতৎপরতা চালিয়েছে সরকার দল সমর্থিত প্রার্থীর সমর্থকরা। ধাপে ধাপে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অনিয়মের ঘটনা। প্রথম ধাপে যেখানে শতাধিক কেন্দ্রে অনিয়মের ঘটনা দেখা গেছে সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে তা বেড়ে হয়েছে কয়েক গুণ। সহিংসতার হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও শক্তি প্রয়োগের ঘটনায় রীতিমতো সহিংসতায় রূপ নিয়েছে উপজেলা নির্বাচন। প্রতিটি উপজেলায় অনিয়ম ও সহিংসতার ঘটনায় বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষ থেকে একের পর এক অভিযোগ দেয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনে। কিন্তু কোন প্রতিকার মেলেনি। অভিযোগের দিকে আমল দেয়নি নির্বাচন কমিশন। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, লাঠিসোটা নিয়ে হামলা, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, কেন্দ্র দখল, মহড়া, জাল ভোটের দৃশ্য দেখা গেছে সর্বত্র। অনেক উপজেলায় দেখা গেছে প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং এজেন্টদের পরিচয়পত্রে সংশ্লিষ্টদের নাম, ছবি ও স্বাক্ষর ছিল না। শূন্য কার্ড বুকে ঝুলিয়ে তারা দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে তারা প্রিজাইডিং অফিসার না সরকার দলীয় নেতাকর্মী তা বোঝার উপায় ছিল না। জাল ভোটের ফলাফল ঘোষণা করতে দেরি না করলেও বিরোধী প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলে ফল বদলাতে সেখানে বিলম্ব করা হয়েছে ফল ঘোষণায়। এভাবে অনেক উপজেলায় স্বল্প ব্যবধানে ফল পাল্টানো হয়েছে। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কমিশন যেমন নিষ্ক্রিয়, তেমনি নিষ্ক্রিয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপে ব্যাপক সহিংসতার পরও তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন থেকে নেয়া হয়নি। তৃতীয় ধাপের নির্বাচন শেষে উল্টো সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করেছেন ভারপ্রাপ্ত সিইসি আবদুল মোবারক। এদিকে উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রতিদিনই সংবাদ সম্মেলন করে নানা অভিযোগ তুলে ধরছেন দলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। প্রতিটি ধাপের নির্বাচনের দিন ও পরে তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকারি দলের নেতাকর্মীরা প্রশাসনের সহায়তায় অনেক উপজেলায় নির্বাচন শুরুর পরপরই বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলা চালিয়ে কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও জাল ভোট দিয়ে ফল কেড়ে নিয়েছে। সার্বিকভাবে উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতা দমনে নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ নয়, সহিংসতা উৎপাদনে কমিশন যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সঠিক দায়িত্ব পালন ও প্রশাসন নিরপেক্ষ আচরণ করলে বিরোধী দল ৯০ ভাগ উপজেলায় জয় পেতো।মানবজমিন