হুমকির মুখে রয়েল বেঙ্গল টাইগার

প্রকাশিত: August 10, 2014 | সময়: 10:34 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: সুন্দরবনের বিশাল ভূখণ্ডে বাঘের বসতির স্থান কমে আসছে। খাদ্যাভাব, বন ধ্বংস ও চোরাকারবারিদের থাবায় বাঘ সংরক্ষণে দেশী ও আন্তর্জাতিক কোন উদ্যোগ কাজ হচ্ছে না। সুন্দরবন বিভাগের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০০-১২ সালের মধ্যে ১৩টি টাইগার রেঞ্জ দেশে ৬৫৪টি চামড়া, দেহাবশেষ ও হাড় জব্দ করেছে। এতে ধারণা করা হয়, এই সময় এক হাজার ৪২৫টি বাঘ মারা গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আগামী শতাব্দীতে এই প্রাণীটি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে। বাঘ বনের জীব- বৈচিত্র, খাদ্য শৃঙ্খল ও প্রতিবেশ চক্রের প্রধান নিয়ন্ত্রক।

বনের উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি যাতে ব্যাহত না হয় তার জন্য তৃণভোজী প্রাণী যেমন হরিণ, শূকর ইত্যাদি শিকার করে বনের প্রতিবেশ চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বাঘ বন রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী এবং একটি বনের জীব-বৈচিত্রের অবস্থা নিরূপণের নির্দেশক প্রজাতি। যে বনের অবস্থা ভালো সেখানে বাঘের সংখ্যা বেশি থাকে। সুন্দরবনের বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গণপিটুনি, চোরা শিকারসহ নানা কারণে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অন্যতম আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুরক্ষায় বনবিভাগ কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না।
সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব বিভাগের সূত্রে জানা যায়, গত ১২ বছরে সুন্দরবন এর আশেপাশের লোকালয়ে ৩৫টির অধিক বাঘ হত্যা করা হয়েছে। খাদ্য ও পানীয় জলের সঙ্কটে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাঘ অনেক সময় লোকালয়ে চলে আসে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা ছিল ৪৪০টি। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে কত বাঘের মৃত্যু হয়েছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সুন্দরবন পশ্চিম ও পূর্ব দু’টি বিভাগের চারটি রেঞ্জ পশ্চিমে খুলনা ও সাতক্ষীরা পূর্বে শরণখোলা ও চাঁদপাই বন সংলগ্ন গ্রামগুলোতে ঢুকে পড়া বাঘ গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রায়ই মারা পড়ে। গত এক যুগে সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে ২৪টি ও পূর্ব বিভাগে ১২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সবচেয়ে বেশি ১৪টি বাঘ গণপিটুনিতে মারা গেছে। বন বিভাগ ও এলাকাবাসীর সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৮ সালের ২৬শে মার্চ শ্যামনগরের দাঁতনিখালী গ্রামে একটি বাঘ ঢুকে পড়লে এলাকাবাসী বাঘটিকে গুলি করে হত্যা করে। এর একদিন পরে একই এলাকায় আরও একটি বাঘ গণপিটুনিতে মারা যায়।
২০০৮ সালের ২০শে জুন সন্ধ্যায় শ্যামনগরের দক্ষিণ কদমতলা গ্রামে একটি বাঘ প্রবেশ করে । এ সময় বাঘের আক্রমণে এক গৃহবধূসহ তিনজনের মৃত্যু হয় ও আহত হয় দুই জন। এ ঘটনার পরের দিন ২১শে জুন এলাকাবাসী বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে। ’০৯ সালের ২রা জুন সুন্দরবনের চুনা নদী পার হয়ে শ্যামনগরের খলিশাবুনিয়া গ্রামের কালীবাড়ী নামকস্থানে একটি বাঘ ঢুকে পড়ে। এই বাঘের আক্রমণে তিন জন গ্রামবাসী আহত হয়। এ ঘটনায় গ্রামবাসী ১০ ঘণ্টা পর বাঘটিকে আটক করে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে একটি বাঘ লোকালয়ে প্রবেশ করে। বাঘটি আবাদ চণ্ডীপুর গ্রামে খোরশেদ আলীর রান্নাঘরের চালের ওপর অবস্থান নেয়। গ্রামবাসী বাঘটিকে ঘেরাও করে বনবিভাগ ও পুলিশকে খবর দেয়। ১২ ঘণ্টা পরেও বনবিভাগ কোন ব্যবস্থা না করায় গ্রামবাসী বাঘটিকে পিটিয়ে হত্যা করে। ২০১০ সালের মে মাসে চণ্ডীপুর গ্রামের লোকালয়ে আবারও একটি বাঘ প্রবেশ করলে সেটিও গ্রামবাসী পিটিয়ে হত্যা করে।
২০১১ সালের ২৫শে মার্চ শ্যামনগরের ভোলাখালী গ্রামে জনগণের পিটুনিতে ১টি বাঘের মৃত্যু হয়। ২০১৩ সালের ২১শে জুলাই কৈখালী এলাকায় একটি বাঘ মৃত অবস্থায় দেখতে পায় এলাকাবাসী। সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে গণপিটুনিতে সুন্দরবনে ২০টি বাঘ মারা গেছে। পরিবেশবিদদের মতে, গণপিটুনিতে বাঘ মৃত্যুর সংখ্যা ৩০টির কম নয়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মতে, ২০০২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে সুন্দরবনের ১২০টি বাঘ মারা গেছে। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্নভাবে ৫৩টি বাঘ হত্যা করা হয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, আইলা ও সিডরের আঘাতে সুন্দরবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীর খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।
যে কারণে হিংস্র বাঘ খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং গ্রামবাসীর গণপিটুনির শিকার হচ্ছে। বন বিভাগের নাম না প্রকাশের শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, বাঘ সুরক্ষায় সুন্দরবনে ২টি ট্র্যাঙ্কুুলাইজার গান রয়েছে। তবে গান দু’টি ব্যবহারের দক্ষ কোন লোক নেই। তেমনি নেই পর্যাপ্ত পরিমাণ চেতনানাশক ওষুধ। সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে প্রবেশ করা এসব বাঘ সুন্দরবনে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হতো, যদি ট্র্যাঙ্কুুলাইজার গানের গুলি ব্যবহার করা যেতো। তার মতে জলবায়ু পরিবর্তনে দুর্যোগ, লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাঘ হিংস্রতর হয়ে উঠেছে। বনের ঘনত্ব কমে যাওয়ায় খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। যে কারণে খাদ্যের খোঁজে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ গণপিটুনিতে বেশি মারা পড়ছে। মানবজমিন