ঢাকা থেকে এক ফিলিস্তিনি বলছি

প্রকাশিত: August 16, 2014 | সময়: 12:05 pm

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক॥ বন্ধ হয়নি ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হলের বাসিন্দা সেলিম হোসনি কামনিতার বাড়ি গাজায়। সেখানে কেমন আছেন সেলিমের স্বজনেরা? কেমন আছে সেলিমদের বাগানঘেরা সুন্দর বাড়িটা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক হলের চারতলায় থাকেন সেলিম কামনিতা। কক্ষ নম্বর ৪০৬। ঘরের দেয়ালে সবার আগে যে জিনিসটি নজর কাড়ে, সেটি ফিলিস্তিনের বড়সড় একটি পতাকা। মাস দুয়েক আগে ভাই ইয়াসির ছিলেন এই ঘরে। এখন সেলিম একা।
সেলিমের ঘরে বসেই কথা হয় তাঁর সঙ্গে। কথা বলতে বলতে পতাকার পাশে রাখা মানচিত্রের শরীরে আঙুল রাখেন সেলিম। ‘ঠিক এই জায়গাটায় আমাদের বাড়ি। বাড়িটি এখনো অক্ষত আছে কি না জানি না। খবর পেয়েছি, অসংখ্য বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরে বিদ্যুৎ নেই, নেটওয়ার্ক নেই। জমিয়ে রাখা খাবার দিয়েই চলছে জীবনধারণ।’ এভাবে চলতে থাকলে তো জমানো সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। তখন? এর উত্তর নেই সেলিমের কাছে!
‘জানি না, আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে কী লিখে রেখেছেন।’ বলতে বলতে সেলিমের চোখ কি ঝাপসা হয়ে এল? আমরা কথা ঘোরাই। সেলিমের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি গাজা শহরের দির বাল্লাহ এলাকার আবো আরাফ রোড। যেখানটায় সেলিমদের দোতলা বাড়ি। ওপরের তলায় থাকেন সেলিমদের পরিবারের সবাই। নিচের তলা অতিথিদের জন্য। আর বাড়ির চারপাশটা কেমন? প্রশ্ন শুনেই সেলিমের বিষণ্ন মুখে ঝিলিক দিল খুশি। ‘আঙুর, কমলা, পিচ, জলপাই নানা জাতের ফলের গাছ আমাদের বাড়ির চারপাশে।’
জন্মভূমির নাম ফিলিস্তিন
সেলিম একটা পুরোনো ছবির অ্যালবাম মেলে ধরেন। জন্মভূমির নাম ফিলিস্তিন বলেই হয়তো আন্তর্জাতিক হলের অন্য বাসিন্দাদের তুলনায় সেলিম চিরকালই একটু আলাদা। তাঁর দেশের নাম শুনলে সবার মনে একটা প্রশ্নই ভাসে। ‘আপনার পরিবারের সবাই ভালো আছেন তো?’ আমরাও ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন করি ফিলিস্তিনের গাজা শহরে জন্ম নেওয়া সেলিম হোসনি কামনিতাকে। প্রশ্ন শুনে বিষণ্নতা আবারও জেঁকে ধরে টগবগে এই তরুণকে।
‘জানি না তারা কেমন আছে। কয়েক দিন ধরে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। দু-এক দিন আগে কথা হয়েছে। মোহাম্মদ নামে আমার এক চাচাতো ভাই বোমার আঘাতে মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী আহত হয়ে হাসপাতালে। আর আমার পরিবারের সবাই আছে খুব আতঙ্কে।’
সেলিমের পরিবার বলতে সেলিমের মা-বাবা, এক ভাই ও তিন বোন। ছোট বোন মাহা আর রুহিফা পড়ছেন গাজার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইয়াসির নামের অন্য ভাইটি মাত্র মাস দুয়েক আগে বাংলাদেশ ছেড়ে গেছেন।
বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। সোহা নামের বোনটির ছয় মাস বয়সী একটা ছেলেও আছে। মামা সেলিমের সঙ্গে এখনো দেখা হয়নি ভাগনে আবদুল রহিমের। দেশ ‘ঠান্ডা’ হলেই প্রিয় ভাগনেকে দেখতে পাড়ি দেবেন তিনি।
গাজার স্বজন
সেলিমের কাছে গাজাবাসী সবাই স্বজন। সবাই আত্মীয়। মুঠোফোনে যখনই কথা হয় পরিবারের কারও সঙ্গে, আগে জানতে চান প্রিয় গাজার অবস্থা। চোখের সামনে সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অথচ মাতৃভূমির জন্য কিছুই করতে পারছেন না—এ আফসোস সব সময় পোড়ায় সেলিমকে। ‘আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। অথচ তাঁর ছেলে হয়ে আমি দেশের জন্য কিছুই করতে পারছি না। এটা আমার জন্য অনেক কষ্টের। আমি মনে করি এটা যুদ্ধ না। এটা গণহত্যা।’
সেলিম পড়ালেখা করতে বাংলাদেশে আসেন ২০০৫ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে এই হলেই আছেন। ২০১১ সালে একবার দেশে গিয়েছিলেন। মাস দুয়েক ছিলেন নিজের শহরে। তারপর আবার ঢাকায়। সে হিসেবে সেলিমের কাছে বাংলাদেশ ‘সেকেন্ড হোম’। অসংখ্য বন্ধু আছে এই শহরে। এ দেশ কেমন লাগে? উত্তর দিতে গিয়ে একটু চিন্তা করেন সেলিম। ‘খুব ভালো। মনে হয় নিজের দেশেই আছি। আর এই শহরের মানুষগুলো সবচেয়ে ভালো। সহজেই সবাইকে আপন করে নেয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পি জে হার্টগ আন্তর্জাতিক হলের প্রভোস্ট মো. লুৎফর রহমানের কথা, ‘ফিলিস্তিন থেকে আগে অনেক ছাত্র বাংলাদেশে পড়ালেখা করতে আসত। এখন সে তুলনায় ফিলিস্তিনি ছাত্রদের ভর্তির হার খুব কম। সেলিমের সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হয়। সেলিম তার পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে। আমরা তার সুবিধা-অসুবিধার দিকে খেয়াল রাখি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শেষ। সেলিম অপেক্ষা করছেন দেশে ফেরার। পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হলেই পাড়ি দেবেন গাজায়। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে হাল ধরবেন সংসারের। সেলিম এমনটাই কথা দিয়ে রেখেছেন বাবাকে।