বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥ ছাত্র রাজনীতিকে গতিশীল করতে আন্দোলন ও সংগঠনমুখী পুনর্গঠন হচ্ছে ছাত্রদলে। নতুন কমিটির সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই করছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। তারই অংশ হিসেবে আজ ছাত্রদলের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সূত্র জানায়, মতবিনিময় সভায় ছাত্রনেতাদের মতামত ও প্রকৃত সাংগঠনিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য নেবেন বিএনপি চেয়ারপারসন। সব কিছু ঠিক থাকলে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নতুন কমিটির ঘোষণা আসতে পারে। এদিকে কমিটি পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে নানামুখী তৎপরতা চলছে ছাত্রদলে। জোরালো লবিং-তদবির চালাচ্ছেন ছাত্রনেতারা।
অনুসারীদের শীর্ষপদে আনতে লবিং-গ্রুপিংয়ে মরিয়া দলে প্রভাববিস্তারকারী সাবেক কয়েক ছাত্রনেতা। জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের স্টাফ ও ভাইয়া গ্রুপের কাছে দৌড়ঝাঁপ নিয়ে ক্ষুব্ধ খোদ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। এরই মধ্যে সাবেক এক ছাত্রদল নেতার সঙ্গে আলোচনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারেক রহমান। ভাইয়া গ্রুপে বন্দি ছাত্রদল ছাত্রদলের বিগত দু’টি কমিটি ছিল ‘ভাইয়া গ্রুপ’নির্ভর। বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার প্রভাবে গঠন করা হয়েছিল সে কমিটি।
কমিটি গঠনের সময় তারা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে বারবার ওই সব ছাত্রনেতার কৃতিত্ব, সাহস ও বিশ্বস্ততার গুণগান গেয়েছেন। নিজেদের পাল্লা ভারি করার জন্য তারা প্রতিবার কমিটি গঠনের সময়ে নানা ছলছাতুরীর আশ্রয় নেন। তারই ফল হিসেবে কমিটির নেতারা দলের চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত হয়ে পড়েন ভাইয়াদের। আন্দোলন-সংগ্রাম কিংবা সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুতের চেয়ে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের প্রধান কাজ ছিল ‘ভাইয়া’দের সন্তুষ্টি অর্জন। তাদের হকুম তামিল ও প্রচার-প্রচারণা চালানো। ছাত্রদলের ইতিহাসে নানা মেয়াদে কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেছেন ২৫ ছাত্রনেতা। ঢাকা বিভাগ থেকেই এ পদে দায়িত্ব পেয়েছেন সর্বাধিক ১৩ জন। ভাইয়া গ্রুপের প্রভাবে পরে নেতৃত্ব ঘুরপাক খাচ্ছে কয়েকটি জেলায়।
ছাত্রদল কর্মীদের প্রশ্ন, ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পরীক্ষায় যারা পক্ষ ত্যাগ করেছিলেন, তারা ভবিষ্যতে ভুল পথে পা দেবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়? ছাত্রদলে যারা বেঈমানি করেছেন তারা ভবিষ্যতে বিএনপিতে বেঈমানি করবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়? সাধারণ ছাত্র ও ছাত্রদল কর্মীদের মতে, আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাই অতীতে সর্বাধিক ভূমিকা পালন করেছে। অথচ বিগত কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছিল ঢাকা মহানগর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধান্য খর্ব হওয়ায় ক্যাম্পাস কেন্দ্রীয় সে অবস্থান ও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি ছাত্রদল। ৫ বছরের ঘেরোতে ২০ বছর কমিটি গঠনে বারবার অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নেতৃত্বের সেশনজট তৈরি হয়েছে ছাত্রদলে। বিএনপি ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও ছাত্রদল সভাপতির বয়সের ব্যবধান মাত্র ৫ বছর। একজন ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন ২০ বছর আগে এবং আরেকজন এখন।
এ ৫ বছর বয়সের ব্যবধানে ঘুরপাক খাচ্ছে ছাত্রদলের ২০ বছরের রাজনীতি। অথচ এ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে বিগত দু’টি কমিটি। আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখার চেয়ে তারা ব্যস্ত ছিলেন সংসার ও ব্যবসা নিয়ে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের বয়সও পেরিয়ে গেছে ৩০ বছর। ফলে ইচ্ছা করলেও এখন আর নিয়মিত ছাত্রদলের হাতে নেতৃত্ব দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বিএনপির সামনে। তবে ছাত্র নেতৃত্বের বয়সসীমা এখনও সম্মানজনক একটি পর্যায়ে নামিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। আর সে সুযোগ বিএনপি কাজে লাগাবে কিনা সেদিকে তাকিয়ে আছে দেশের অন্যতম বৃহত্তম এ ছাত্র সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী। ছাত্রদল সূত্র জানায়, বর্তমান কমিটির সহসভাপতিদের গড় বয়স ৩৯-৪২ এবং যুগ্ম সম্পাদকদের ৩৫-৪০। সহসভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদকদের অনেকেই বিবাহিত এবং সন্তানের জনক। সম্পাদকমণ্ডলীর মধ্যেও কয়েকজন রয়েছেন বিবাহিত। তাদের অধিকাংশই নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কেউ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ নিজ এলাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তৃণমূলে প্রচারণাও চালাচ্ছেন। আন্দোলনের স্বার্থে গঠিত বর্তমান কমিটিতে ঠাঁই করে নিয়েছিল সংস্কারপন্থি, ব্যবসায়ী, বিবাহিত, বিতর্কিত ও নেশাগ্রস্তরা। কাউকে কাউকে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে ছাত্রদলে ফিরিয়ে এনে সৃষ্টি করা হয়েছিল ইতিহাস। পদবাণিজ্যের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন হয়েছিল একাধিক। যে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কমিটি গঠনে এমন উদারনীতি নেয়া হয়েছিল পরে তা ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হয়। নব্বই-পরবর্তী ছাত্রদলের ইতিহাসে মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয় এম ইলিয়াস আলী, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে। ৩২-৩৫ বছর বয়সেই কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তারা।
তারা ছিলেন অবিবাহিত।
তখন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে পুলিশি নির্যাতন ও দফায় দফায় কারাভোগ করলেও তারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সামনে থেকে। নিয়মিত ছাত্রদের দাবি, বিএনপির ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য ছাত্রদলের নেতৃত্ব দিতে হবে ছাত্রদের হাতে। যারা নিয়মিত ক্যাম্পাসে যেতে পারবে। ছাত্র আন্দোলন সফল করতে ছাত্রদল নেতাদের যেতে হবে ক্যাম্পাসে। আর জন্য ছাত্রদের হাতে ছাত্রদলের নেতৃত্ব দেয়ার বিকল্প নেই। সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় যারা তবে সর্বশেষ আন্দোলনে ছাত্রদলের ব্যর্থতা ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবার কমিটি গঠনে বয়সসীমা নামিয়ে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। কিন্তু বয়সীদের দিয়ে কমিটি গঠনের কারণে চিন্তা করলেও বয়সসীমা নামিয়ে আনা যাচ্ছে না ৩০-এর নিচে। কারণ কেন্দ্রীয় সদস্যদের বেশির ভাগের বয়সই ৩০-এর ওপরে।
বিএনপি সূত্র জানায়, সংগঠনের জন্য ত্যাগ স্বীকার, আন্দোলনে সক্রিয় এবং ন্যূনতম অভিজ্ঞদের দিয়েই গঠন করা হবে কমিটি। সে ক্ষেত্রে যুগ্ম সম্পাদক বা সম্পাদকমণ্ডলী থেকেই নির্বাচন করা হবে নেতৃত্ব। যাদের সঙ্গে এখনও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সম্পর্কের ছেদ ঘটেনি। অপেক্ষাকৃত তরুণদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হলে শীর্ষ নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনা রয়েছে মামুনুর রশিদ মামুন, রাজীব আহসান, আকরামুল হাসান, এজমল হোসেন পাইলট, সাদীউল কবির নীরব, ফেরদৌস আহমেদ মুন্না, মনিরুল ইসলাম সোহাগ, নাজমুল হাসান ও মফিজুর রহমান আশিক।

