মান্নানের সোনার খনি পূর্ত মন্ত্রণালয়!

প্রকাশিত: August 22, 2014 | সময়: 10:52 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা: মন্ত্রিত্ব পাওয়ার আগে মধ্যবিত্তের সাদামাটা জীবন ছিল তার। নির্দিষ্ট আয়ে চলতো সংসার। ছিলো না সম্পদের ছড়াছড়ি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যেনো বদলে দেয় ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার কাটাখালি গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন আবদুল মান্নান খানকে।

বিগত মহাজোট সরকারের আমলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পরই মান্নান খানের সঙ্গে বিত্তশালী হয়ে উঠে তার পরিবারের সদস্যরাও। মন্ত্রিত্বের পাঁচ বছরে ফুলে ফেঁপে উঠে তার সম্পদ।

এসব সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন নিজেকে ‘হালাল উপার্জনকারী’ দাবিদার মান্নান খান। সাড়ে ৬ মাসের অনুসন্ধানে তার অনেক রহস্যময় অর্থ-সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

যেহেতু এসব সম্পদের অধিকাংশই তার স্ত্রী সৈয়দা হাসিনা সুলতানার নামে, তাই সুলতানার বিরুদ্ধেও পৃথক মামলার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে দুদক। আগামী সপ্তাহে এ মামলাটি দায়ের হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। মান্নান খানের মামলার বাদী দুদকের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারেন।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে মান্নান খানের সম্পদ ‘অস্বাভাবিক’ হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মামলা পরবর্তী তদন্তে মান্নান খানের আরও সম্পদ পাওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুদক যেসব অবৈধ সম্পদের খোঁজ পেয়েছে তার ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার রমনা মডেল থানায় মামলা দায়ের হয়েছে।

জানা গেছে, আগামী রোববার থানা থেকে মামলার কপি আদালতে পাঠানো হবে। অভিযোগ তদন্তের জন্য মামলার কপিগুলো আদালত থেকে দুদকে পাঠানো হবে। পরে দুদক তদন্ত শেষে আলাদাভাবে চার্জশিট আদালতে পেশ করবে। আদালতে চার্জশিট পেশ হলে মামলার বিচারকাজ শুরু হবে।

অনুসন্ধান প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে আবদুল মান্নান খান সম্পদ গোপন এবং অবৈধ সম্পদ উপার্জন করেছেন যা দুদক আইন ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অপরাধ। দুদক আইনে বলা হয়েছে, ২৬(২) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে ৩ বছর এবং ২৭(১) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে ৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, দুদকের অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে (আবদুল মান্নান খান) সম্পদ গোপন ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ পাওয়ার মামলা হয়েছে। এখন তদন্ত করা করা হবে।

তিনি বলেন, অনুসন্ধানের তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতেই দুদক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল এগুলো গৌণ।

কমিশনে দাখিল হওয়া দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, মান্নান খানের মালিকানাধীন ৯৬ লাখ ৮৯ হাজার ৯৫৯ টাকার স্থাবর সম্পদের মধ্যে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৫৯৭ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন, যা দুদক আইনের ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি অবৈধ পন্থায় ৭৫ লাখ ৪ হাজার ২৬২ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন, যা দুদক আইনের ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দুদক সূত্র জানায়, গত ৯ এপ্রিল মান্নান খান দুদক সচিব বরাবর সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। দাখিল করা বিবরণীতে তিনি ২ কোটি ২২ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৬ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৯৩ লাখ ৫ হাজার ৩৬২ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। কোনো দায়দেনা নেই বলে জানান তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার মালিকানাধীন উল্লিখিত মূল্যের স্থাবর সম্পদের মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয়কৃত স্থাবর সম্পদের মূল্য ৪১ লাখ ১০ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৯২ লাখ ৩০ হাজার ৩৬২ টাকা। তার নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয়কৃত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ১ কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার ৩৬২ টাকা। অথচ তিনি সম্পদ বিবরণীতে নিজস্ব অর্থায়নে ক্রয়কৃত সম্পদের মূল্য ৯২,৩০,৩৬২ টাকা উল্লেখ করেছেন। ফলে মান্নান খান দুদকে দাখিল করা বিবরণীতে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৫৯৭ টাকা মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। যা দুদক আইন-২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

মান্নান খানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন সম্পর্কে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, মান্নান খানের মালিকানাধীন ১ কোটি ৩৮ লাখ ১৩৭ টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জনকালীন তার জ্ঞাত আয়ের পরিমাণ ছিল ৬২ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৫ টাকা, যা তার ১ কোটি ৩৮ লাখ ১৩৭ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জনের জন্য আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এটা স্পষ্ট যে তিনি অসদুপায়ে ৭৫ লাখ ৪ হাজার ২৬২ টাকা মূল্যের মালিকানা অর্জন করেছেন।

হলফনামার হিসাব অনুযায়ী মহাজোট সরকারের পাঁচ বছর আগেও তার সর্বসাকল্যে ১০ লাখ ৩৩ হাজার টাকার সম্পত্তি ছিল। অল্পদিনের ব্যবধানে তা হয়েছে ১১ কোটি তিন লাখ টাকা। আগে তার বার্ষিক আয় ছিল তিন লাখ ৮৫ হাজার টাকা। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে বছরে তিন কোটি ২৮ লাখ টাকায়। পাঁচ বছরে তার সম্পদ বেড়েছে ১০৭ গুণ।

মান্নান খানের বিরুদ্ধে জালিয়াতি করে জমি, ফ্ল্যাট ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তার নামে ৩৭ লাখ টাকার এফডিআর, সাড়ে ছয় লাখ টাকার সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য সম্পদের উৎস পাওয়া গেছে। তিনি ও তার স্ত্রী সৈয়দা হাসিনা সুলতানা দুই দফায় ইউরোপ থেকে এক লাখ ৪০ হাজার ৫৫০ ইউরো এনেছেন। তিনি দুদককে জানিয়েছেন, ওই ইউরো তারা উপহার হিসেবে পেয়েছেন। তদন্তে এগুলো খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার আবদুল মান্নান খান ছাড়াও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান এবং সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে রাজধানীর রমনা মডেল মামলা করেছে দুদক। মামলায় তিনজনের বিরুদ্ধেই জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম