স্টাফ রিপোর্টার ॥
ভরা মৌসুমে প্রমত্তা পদ্মার পাড় ভাঙছে বেয়াড়া স্রোতে। বিলীন হচ্ছে গাছপালা, স্কুল, ঘর-বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম। সরেজমিনে পদ্মার ভাঙনের এই আগ্রাসী চিত্র দেখে এলো বাংলানিউজ। একটি টিম শুক্রবার কাকডাকা ভোর থেকে ছায়ানামা সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা প্রায় ১২ ঘণ্টা ভেসে বেড়িয়েছে পদ্মার উত্তাল বুকে।
রোদে পুড়েছে। বৃষ্টিতে ভিজেছে। হঠাৎ ওঠা ঝড়েও টালমাটাল ট্রলারে বসে দৃঢ় প্রত্যয়ে গভীর মনোযোগে দেখেছে স্রোতের গতিপথ, ভাঙনের স্বরূপ।
মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আরিচা ঘাট থেকে শুরু করে বাঁকের পর বাঁক ঘুরে দু:সাহসী এই অভিযাত্রা শেষ হয়েছে মুন্সীগঞ্জে, মাওয়া ঘাটে। তিনজনের এই দলে ছিলেন নিউজরুম এডিটর সৈয়দ ইফতেখার আলম, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শফিক শামীম ও চিফ অব ফটো করেসপন্ডেন্ট নাজমুল হাসান। বিস্তারিত পড়তে চোখ রাখুন বাংলানিউজে।
পদ্মার বুকে ঘুরে: শিবালয় থেকে মাওয়া পদ্মার ভয়াল রূপ। এ-রূপ যে কতটা ভয়াল তার বর্ণনা কেবল ভাঙন কবলিতারাই উপলব্ধি করেছেন। করছেন প্রতিনিয়তই। এ দীর্ঘ নদী পথের পাড়ে পাড়ে পদ্মার প্রবল ভাঙনকে কেন্দ্র করে মানুষ তার বসত বাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে অন্যত্র। ঠিক তেমনি ভাঙন শঙ্কায় প্রতিদিন এ সব এলাকায় কাটা হচ্ছে হাজার হাজার গাছ। এতে করে নদীভাঙন দুর্যোগের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তীব্র পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকিও।
ভাঙছে নদী, সেই সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে গ্রামের পর গ্রাম। এ ভাঙনের বালি হচ্ছে পদ্মাপাড়ের পরিবেশও। প্রতিদিনের নিয়ম করে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে ভূমি। সেই ভূমিতে বছর বছরের পুরনো সব গাছ বিলীয়ে যাওয়ার আগে কেটে ফেলা হচ্ছে। নয় তা ভূমির মতো চলে যে যাবে নদীর বুকে।
এ প্রসঙ্গটি নিয়ে কথা হলো মসনুর উদ্দিন ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি এসেছেন মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার তীব্র ভাঙন কবলিত এলাকা মান্দ্রাখোলায় ট্রলার নিয়ে। স্বভাবকই কাঠ কিনতে।
তিনি বাংলানউজকে বলেন, শিবালয় উপজেলা শহরে আমার কাঠের দোকান আছে। এ-গ্রাম এবার প্রবল নদী ভাঙনের শিকার বলে এখানকার সব গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছি। বিনিময়ে যার জায়গার গাছ রয়েছে সে সব দুস্থ ভাঙন কবলিতদের কাঠের টাকা দিচ্ছি।
তিনি বলেন, কিছু দিন আগে ট্রলার নিয়ে এ-গ্রামের একটু আগে নয়াকান্দি এলাকায় গিয়ে গাছ কেটে এনেছি। নয়াকান্দিতে যেখানে গাছ কেটে নিয়ে গেছি বর্তমানে সে জায়গাটি এখন আর নেই। সেখানে এখন শুধুই অথৈ পানি।
তিনি বলেন, এখন মান্দ্রাখোলায় এসেছি গাছ কাটতে। প্রায় লাখ টাকা মূল্যের কাঠ সংগ্রহ করছি প্রতিদিন। সন্ধ্যায় যেসব এলাকার কাঠ নিয়ে ফিরি পরদিন সকালে সেখানে নদী হয়ে যায়! এমন চিত্র দেখছি প্রতিদিনই।
ভাঙনে পড়ে এমন চিত্র এখন পদ্মার পাড়ে পাড়ে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার নয়াকান্দি, মান্দ্রাখোলা, গবিনাথপুর, উজানপাড়া, দরিকান্দি, বকচর।
এদিকে ঢাকার দোহার উপজেলার পানকুণ্ডু, দোয়ার বাজার, বাহ্রা বাজার, নারিশা, পশ্চিমপাড় চর, রানিপুর মেঘলাবাজার, মধুপুর, বিলাশপুর। এরপর আরো পশ্চিমে এগিয়ে গেলে মুন্সিগঞ্জের মাওয়াঘাট। সর্বত্রই যেন ভয়াল পদ্মার ভাঙনের মাতম। সেই সঙ্গে উদ্বাস্তু মানুষগুলোর মাতমের পাশাপাশি পরিবেশের প্রধান অনুষঙ্গ গাছ কাটারও ধুম।
শিবালয় থেকে মাওয়ায় বাংলানিউজের অভিযানকালে বিভিন্ন ভাঙন স্পটে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নয়াকান্দিতে এবছর ভাঙনে বাড়ি-ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনার পাশাপাশি নদীগর্ভ বিলীন হয়েছে বন। এখানে প্রায় শ’ খানেক গাছ কাটা পড়েছে নদীভাঙনে। তবে এর সুষ্ঠু হিসাব নেই। তবে সামাজিক বনায়নের আওতায় গাছ পালা কাটে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
এর পরের এলাকা মান্দ্রাখোলায় বাড়ি-ঘরের সংখ্যা যেমন বেশি ঠিক তেমনি এখানে ব্যক্তিগত জমিতে বিভিন্ন ফলজ, ওষুধি গাছের সংখ্যাও কম নয়। এখানে প্রায় হাজার খানেক গাছকাটা পড়েছে এ বছরের ভাঙনে। এমনটাই জানান স্থানীয়রা।
গবিনাথপুর, উজানপাড়াও গাছ কাটা পড়েছে পদ্মার ভয়াল ভাঙনে। তবে এখানকারও কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা নেই কারো। স্থানীয়দের ধারণা এখানে শ’ খানেক গাছ কাটা পড়েছে।
এরপর দড়িকান্দিতে আবাসস্থল বেশি। তা যেমন প্রমত্তা পদ্মা বিলীনও করেছে সমানতালে, ঠিক তেমনি এখানকার ফসলি জমি ছাড়াও প্রায় হাজার খানেক গাছপালা কেটে ফেলতে হয়েছে ভাঙনের কবলে পড়ে। এরপর পানকুণ্ডুতে এ বছরের ভাঙনে কেটে ফেলা গাছের সংখ্যা শ’ খানেক।
এরপর দোয়ার বাজারে প্রায় সবচেয়ে বেশি দু’হাজার গাছ কাটতে হয়েছে চলতি বছরের ভাঙনে।
এরপর বাহ্রাঘাট বাজার এলাকায় শ’ খানেক গাছ কাটা হয়েছে। এরপরের রাণীপুর মেঘলা বাজারে প্রায় হাজার খানকে গাছ কাটা হয়েছে।
এখানে ভয়াল পদ্মা কেবল মানুষের ঘর-বাড়ি, জায়গা-জমি, আবাসস্থলই কেড়ে নিচ্ছে না, এর ভয়াল রূপ যে বাস্তবে কতটা ভয়াল তার চাক্ষুস উদাহরণ এখন প্রমত্তা এ নদীটির পাড়ে পাড়ে।
এখানে নদীভাঙন কেবলই একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এর সঙ্গে যেমন জড়িত মানুষের আবাস, খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় ফসলি জমি, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ ঠিক তেমনিভাবে জড়িত পরিবেশের কারিগর গাছপালাও।
স্থানীরা বলছেন, নদী ভাঙন ঠেকাতে শুধু প্রশাসনের ব্যর্থতার জন্য ভয়াল হয়ে উঠেছে নদী। আর তার সে ভয়াল রূপে গ্রাস করছে মানুষ ও পরিবেশ দুটোই।
মানুষের দুঃখ, কষ্টের সঙ্গে প্রমত্তা এ নদীটির পাড়ে পাড়ে যেন এখন পরিবেশ বিপর্যয়েরও তীব্রতা। আর এর একমাত্র কারণ ভাঙন কবলিত ওই এলাকাগুলোতে শুধু একটি বাঁধের অভাব। এতো দুঃখ, কষ্ট, উদ্বাস্তুদের চোখের জল এসবে ধুয়ে যাওয়া পদ্মার পাড় কি আদৌ এর কোনো সমাধান পাবে? সে প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের জন্যই।
** ‘বাজান গো আমার সব শেষ’
** ‘আমগো কথা কী প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছাইতে পারবেন’

