ব্যবহারের আগেই অকেজো ১৬৫ ট্যাংক ওয়াগন

প্রকাশিত: July 17, 2013 | সময়: 12:28 pm

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ব্যবহারের আগেই অকেজো হয়ে পড়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় ঋণে কেনা তেলবাহী ১৬৫টি ব্রডগেজ ট্যাংকার। নানা ত্রুটির কারণে বর্তমানে এগুলো পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, ঈশ্বরদীসহ বিভিন্ন স্টেশনে ফেলে রাখা হয়েছে। পরিবহনমতা বাড়াতে বাংলাদেশ রেলওয়ের কেনা এসব ট্যাংক ওয়াগনে জ্বালানি তেল পরিবহনে রাজি নয় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা— এ তিন কোম্পানি।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বিভিন্ন ডিপোয় তেল সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ওয়াগনগুলো কেনে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ১২২ কোটি ২২ লাখ টাকায় কেনা তেলবাহী এসব ওয়াগন ও ছয়টি ব্রেকভ্যান চলতি বছরের মার্চে যুক্ত হয় রেলওয়ের বহরে; যা সরবরাহ করে ভারতের মেসার্স টেক্সমাকো লিমিটেড।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বহরে যুক্ত হওয়ার পর পরই নতুন ওয়াগনগুলোয় তেল ধারণমতা পরিমাপে সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি নকশাজনিত ত্রুটির কারণে তেল মজুদ ও খালাসেও নানা বিপত্তি ঘটতে থাকে। তখন ত্রুটি সারাতে ওয়াগনগুলো সৈয়দপুর রেলওয়ে ওয়ার্কশপে পাঠানো হয়। সেখানে হালকা মেরামতও করা হয়। তবে তাতে কোনো কাজ হয়নি। ওয়াগনগুলো ব্যবহার উপযোগী করতে বড় ধরনের মেরামত প্রয়োজন।

ভারত থেকে আনা ওয়াগনগুলো ৫০ হাজার লিটার ডিজেল ধারণমতাসম্পন্ন হলেও বাস্তবে এর কোনোটিতে তেল ধরে ৪৮ হাজার লিটার, কোনোটিতে ৪৯ হাজার আবার কোনোটিতে ৫২ হাজার লিটার। ওয়াগনগুলোয় তেল ধারণমতার এ গরমিলে আপত্তি জানায় পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা। এর পরিপ্রেেিত গত ১৭ জুন খুলনায় বিপিসি ও রেলওয়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ৪২০০৯, ৪২০১৮, ৪২০১৯ ও ৪২০২০ নম্বর ওয়াগনের ধারণমতা পরিমাপ করে। এতে দেখা যায়, ওয়াগনগুলোর তেল পরিমাপক যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন ঠিক নেই। এতে একেকটি ওয়াগনের ধারণমতার পরিমাপ একেক রকম পাওয়া যায়।

বর্তমানে  রেলওয়ের যে ট্যাংক ওয়াগন রয়েছে, তার মুখের ব্যাস ৮ ইঞ্চি।  কিন্তু ভারত থেকে যে ট্যাংক ওয়াগন আনা হয়েছে, তার মুখের ব্যাস মাত্র ৪ ইঞ্চি। সরবরাহের েেত্র বিপিসির ডিপো থেকে যে পাইপে তেল দেয়া হয়, তার ব্যাসও ৪ ইঞ্চি। ফলে ওয়াগনগুলোয় তেল সরবরাহের সময় কতটুকু ভরা হয়েছে, তা দেখা যায় না। এতে ওয়াগন ভরে গিয়ে তেল উপচে পড়ে। পাশাপাশি খালাসব্যবস্থার ত্রুটির কারণে ওয়াগনের ভেতর সবসময় তেল থেকে যায়। এ বিষয়ে চলতি বছরের ১২ মে বিপিসি  রেলওয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, খালাসের পরও ট্যাংকারের ভেতর তেল থেকে যাওয়ার দায়ভার কার?

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আবু তাহের বলেন, নতুন যেকোনো কিছুর মধ্যে সমস্যা থাকতে পারে। এর সমাধানও রয়েছে। তেলবাহী ওয়াগনগুলোর সমস্যা সমাধানে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিসিসহ বিভিন্ন অয়েল কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ত্রুটি সংশোধনে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। শিগগিরই এগুলো ব্যবহার করা যাবে।

এদিকে গত ১২ জুন রেলওয়েকে লেখা এক চিঠিতে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা অয়েল কোম্পানির দৌলতপুর ডিপোর তিন ব্যবস্থাপক নতুন ওয়াগনে তেল পরিবহনে রাজি নন বলে জানান। তিন ব্যবস্থাপকের স্বারসংবলিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ভারত থেকে আনা ওয়াগনগুলোর সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এগুলোয় তেল গ্রহণ করতে তারা অনিচ্ছুক। এ অবস্থায় পুরনো ওয়াগনগুলো ফেরত দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ রেলওয়ের পর্যাপ্ত তেলবাহী ওয়াগন রয়েছে। দেশের বিদ্যমান চাহিদা এগুলো দিয়েই পূরণ করা সম্ভব। অর্থ অপচয়ের জন্য নতুন ওয়াগনগুলো কেনা হয়েছে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে এেেত্র নকশার বিষয়টিও গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এছাড়া রেলের পণ্য বা যাত্রী পরিবহনের বিষয়টি দেখাশোনা করে ট্রাফিক বিভাগ। ওয়াগনগুলো কেনা বা নকশা অনুমোদনের সময় ট্রাফিক বিভাগের কোনো মতামত নেয়া হয়নি।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ওয়াগনগুলোর নকশা অনুমোদন করেছেন রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগের কর্মকর্তারা। এছাড়া নকশা অনুযায়ী ওয়াগন তৈরি হচ্ছে কিনা, তা পরীা-নিরীা ও সরবরাহের আগে যাচাই-বাছাই করতে একাধিকবার ভারত সফর করেন প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) খলিলুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ভারত থেকে কেনা ওয়াগনগুলো আন্তর্জাতিক মান ও নকশায় তৈরি। এতে তেল চুরি বন্ধ করা সহজ হবে। এ কারণে একটি স্বার্থান্বেষী মহল এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তেল কোম্পানিগুলোর আপত্তি ও বিপিসির বক্তব্যের পরিপ্রেেিত এগুলো মেরামতের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। আশা করা যায়, শিগগিরই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ৫৮১টি ট্যাংক ওয়াগন রয়েছে। এগুলো নিয়মিত তেল পরিবহনে ব্যবহার হচ্ছে।