জেলা প্রতিনিধ, বগুড়া ॥ অবৈধ দখল আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এক সময়ের ‘দীর্ঘ’ করতোয়া নদী এখন ‘খালে’ পরিণত হয়েছে। দেখে বোঝার উপায় নেই, এই নদীতেই একসময় জাহাজ ভিড়তো, করতোয়াকে কেন্দ্র করে ব্যবসা হতো সারা উত্তারঞ্চল জুড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বগুড়া পৌরসভা ও প্রশাসনের সঠিক নজরদারির অভাব এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই করতোয়া ক্রমশই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা সূত্র জানায়, করতোয়া দখলে জড়িত অভিযোগে সর্বশেষ ২৭ দখলদারের নামের তালিকা করা হয়েছে।
এরমধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টি.এম.এস.এস) মহিষবাথান মৌজায় ১৫৫৩ দাগে ৪.৯০ একর, নবাববাড়ী মৌজায় ১৭১৬ দাগে ৩৭৮ বর্গফুট বা .০০৮৬ একর দখল করে পুকুর, ছাত্রাবাস, ক্যান্টিন নির্মাণ করে ব্যবসা করছেন। সূত্রাপুর মৌজায় সূত্রাপুর এলাকার আবুল কালাম আজাদ নামের এক ব্যবসায়ী ১৭৫১ দাগে ৬৪০ বর্গফুট বা .০১৫০ একর দখল করে সীমানা প্রাচীর দিয়েছেন।
একই দাগে ফুলবাড়ীর আলহাজ খয়রুজ্জমান ৯৬ বর্গফুট বা .০০২২ একর, রাবাজারের আব্দুস সোবাহান ৫৪৬ বর্গফুট বা .০১২৫ একর, একই এলাকার শ্রী শংকর বাবু ও শ্রী কানাই লাল মিলে যথাক্রমে ৫০ ও ২১ বর্গফুটসহ মোট ৭১ বর্গফুট বা .০০১৬ একর দখল করে চালাঘর ও পাকা ভবন নির্মাণ করেছেন।
একইভাবে ১৭৫৮ দাগে ফতেহ আলী আল আরাবিয়াতুন খালাফিয়া ওয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদে মোবারক নামে ২০৯ বর্গফুট বা .০০৪৮ একর, নবাববাড়ী সড়কের এ. কে. এম ফজলুর রহমান ১৭১৬ দাগে ৮০ বর্গফুট বা .০০১৮ একর, একই দাগে মোক্তার হোসেন ২৪ বর্গফুট বা .০০০৫ একর, জোবাইদুল ইসলাম ৫০০ বর্গফুট বা ০.০১১৪ একর, মতিয়ার রহমান ৯০০ বর্গফুট বা ০.০২০ একর, মাজেদ হোসেন ১৮০ বর্গফুট বা ০.০০৪ একর, ডায়বেটিস হাসপাতাল ৩৫০০ বর্গফুট বা ০.০৮ একর, গুপিনাথ মন্দিরের সভাপতি শ্রী আনন্দ ৪০৯ দশমিক ৫০ বর্গফুট বা ০.০০৯৪ একর, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টি.এম.এস.এস. ৩৭৮ বর্গফুট বা ০.০০৮৬ একর, শ্রী সঞ্জীব কুমার বিহানী ২৪০ বর্গফুট বা ০.০০৫৫ একর, শ্রী প্রদীপ কুমার রায় ৫৪৪ বর্গফুট বা .০১২৪ একর এবং আব্দুল জলিল ১৫০ বর্গফুট বা ০.০০৩৪ একর জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন।
এছাড়া জেলার শাজাহানপুর, শেরপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সূত্রে করতোয়া নদীতে প্রায় ৫০ একর জায়গা দখলের অভিযোগ থাকলেও এসবের কোনো তালিকা প্রস্তুত করেনি স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। অভিযোগকারী না থাকায় বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে জায়গাগুলো দখল করে আছে দখলদাররা।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ. কে. এম সারোয়ার জাহান জানান, করেতায়া নদীর কিছু কিছু জায়গা দখলের কথা শোনা গেলেও এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ বা ভূমি অফিস থেকে কোনো তালিকা তার কাছে দেওয়া হয়নি। তবে খুব শিগগির তিনি এসব বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।
একই কথা বলেন শাজাহানপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিভা চাকমা ও শিবগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাজকির উজ জামান।
তারা বলেন, তাদের উপজেলা সীমানাতেও কিছু জায়গা দখল হয়েছে বলে শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো তালিকা করা হয়নি। তবে দ্রুত নদী সীমানা নির্ধারণ করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বগুড়া জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ডেপুটি নেজারত কালেক্টর (এনডিসি) মো. আরিফুজ্জামান জানান, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে তালিকা প্রণয়ন করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদুল আলম জানান, চিহ্নিত এসব দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ কেস রুজু করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ডদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করেন, করতোয়াকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটি একটি নদী। মনে হয়, একটি সরু খাল। অথচ এই নদীকে ঘিরে এক সময় কৃষি, মৎস্যসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা আবর্তিত হতো।

