ভুয়া কাগজে চলছে ব্যাংক লুট!

প্রকাশিত: November 9, 2014 | সময়: 9:30 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা : নামিদামি গ্রুপ অব কোম্পানিকে ঋণ দিতে আগ্রহী নয় ব্যাংকগুলো। বরং তাদের আগ্রহ বেশি নাম ও প্যাড সর্বস্ব ভুয়া কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে। এসব ভুয়া কোম্পানিকে ঋণ দেওয়া হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। ব্যাক টু ব্যাক এলসির নামেও এ টাকা দেওয়া হয়। এসব ভুয়া কোম্পানি যেসব কাগজপত্র জমা দেয় তাদের জমির দলিল থেকে শুরু করে কোনো কাগজপত্রই ঠিক নয়।

বাস্তবে দেখা যায়, এসব দলিল অধিকাংশই জাল ও ভুয়া। মিরপুরসহ রাজধানীর কিছু কিছু এলাকা আছে, যেখানে সরকারের খাস জমি রয়েছে সেগুলোর ভুয়া ও জাল দলিল তৈরি করে, আবার অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে কোনো জমিই নেই, অথচ জাল দলিল বানিয়ে ব্যাংকে জমা দিয়ে ব্যাংক ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে নাম ও প্যাড সর্বস্ব কোম্পানিগুলো। আর তাদের এই অনিয়মের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছেন খোদ ব্যাংকের কর্মকর্তারাই। তারাই এসব জাল দলিলকে আসল দলিল হিসেবে চিহ্নিত করেন, যার ফলে ভুয়া কোম্পানিগুলোর ঋণ পেতে কোনোরকম সমস্যা হয় না।আর ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে অনেক কোম্পানি-প্রধানই দেশ ছেড়েছেন। কেউ গেছেন দুবাই, আবুধাবি, কেউ বা ব্যাংকক। আবার মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমস নিচ্ছেন কেউ কেউ।
এ ছাড়া ব্যাংকের টাকা নিয়ে কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ায়ও নাগরিকত্ব নিয়েছেন অনেকে। জানা গেছে, গত কয়েক বছরে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে চলে গেছে আবুধাবি। তাদের আরেকটি গ্রুপ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমস নিচ্ছে।ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ মনিটরিং না থাকার কারণে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। এমনকি ভুয়া ও জাল দলিলের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেলেও এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়া নজরদারি নেই। মূলত ব্যাংকগুলোয় রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা পর্ষদ থাকার কারণে সহজেই হচ্ছে এসব অনিয়ম।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া ও জাল দলিলের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণ নিয়ে অর্থ লোপাটের এ প্রক্রিয়া বন্ধে এখনই লাগাম টেনে ধরতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকেরও নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হচ্ছে বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও হলমার্ক গ্রুপের জালিয়াতির ঘটনা। শুধু বিসমিল্লাহ কিংবা হলমার্ক নয়, এ দুই প্রতিষ্ঠানের মতো অসংখ্য গ্রুপ অব কোম্পানিজ দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এসব কোম্পানির নামে যাওয়া ব্যাংক ঋণগুলোকে পরবর্তীতে ভুয়া ঋণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক। আর বিশাল অঙ্কের এ টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, গত কয়েক বছরে দেশে অসংখ্য নামসর্বস্ব গ্রুপ অব কোম্পানিজ গঠিত হয়েছে। এসব কোম্পানির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে খোদ জয়েন্ট স্টক কোম্পানি। অথচ এ প্রতিষ্ঠানটি থেকেই নিবন্ধন নিয়ে ব্যবসা শুরু করতে হয় যে কোনো কোম্পানিকে। এসব কোম্পানির মধ্যে রয়েছে আনন্দ গ্রুপ, নির্ভরতা গ্রুপ, আইকন গ্রুপ, আইসিএল গ্রুপ, ট্রান্সপারেন্ট গ্রুপ, অন্যরকম গ্রুপ, স্বদেশ গ্রুপ, হিমালয় গ্রুপ, এবি গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, হলমার্ক গ্রুপ, অক্সফাম গ্রুপ, পিক্সেল গ্রুপ, স্বপ্নধারা গ্রুপ, কনফিডেন্স গ্রুপ। এসব গ্রুপের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। সবই কাগজে কলমে।
সূত্র জানায়, এসব কোম্পানিই ভুয়া ও জাল দলিল বানিয়ে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে এবং নিচ্ছে। জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিসমিল্লাহ গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে কোম্পানির নামে-বেনামে। একইভাবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে হলমার্ক গ্রুপ। এরকম আরও অনেক গ্রুপই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে জালিয়াতির ঘটনা এ খাতের শৃঙ্খলায় চিড় ধরিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী এবং নিজেদের তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকে যাবে বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকগুলোর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারাই এসব ঘটনার জন্য দায়ী। তারাই ভুয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে জালিয়াতির পদ্ধতি শিখিয়ে দেন। প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব মর্টগেজ দেয় ব্যাংক কর্মকর্তারা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সেগুলো সরেজমিন পরিদর্শন না করেই ব্যাংকে প্রতিবেদন জমা দেন। তিনি বলেন, এর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক নিয়োগ একটা বড় সমস্যা। তারা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঋণ দিতে বাধ্য করেন। ইব্রাহিম খালেদ মনে করেন, বড় ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক যদি কঠোর নজরদারি করে তাহলে এ প্রবণতা কিছুটা হলেও বন্ধ হত পারে।
বিডি-প্রতিদিন