প্রকাশ্যেই কালোবাজারে আসছে চোরাই কাগজ

প্রকাশিত: November 19, 2014 | সময়: 9:13 am

বাংলাভূমি২৪ ডেস্ক ॥
ঢাকা : কাগজশিল্পে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও রাজধানীর কাগজের পাইকারি বাজার নয়াবাজার বিদেশি কাগজে ভরপুর। রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য এসব কাগজ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা হলেও তা সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে না গিয়ে বন্দর থেকে সরাসরি চলে আসছে নয়াবাজারে।

শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাগজ আমদানি করে এনে এর বেশির ভাগই কালোবাজারে বিক্রি হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পেপার আইনের তোয়াক্কা না করে বিক্রি নিষিদ্ধ কাগজ বেশি মুনাফায় বাজারে ছাড়ার পাশাপাশি মজুদও করছে একটি চক্র। আর সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা এসব বিষয়ে জানলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভয়ে মুখ খোলে না কেউ। সম্প্রতি রাজধানীর কাগজের বাজার ঘুরে এসব তথ্য জানা যায়।
নয়াবাজারের কাগজ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তৈরি পোশাক, ওষুধশিল্প ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের জন্য শুল্ক সুবিধা নিয়ে আমদানি করা কাগজ খোলাবাজারে বিক্রির ফলে দেশীয় কাগজশিল্প বিপাকে পড়েছে। বিদেশি শুল্কমুক্ত কাগজের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না দেশীয় কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
দেশীয় উদ্যোক্তারা জানান, বিদেশ থেকে আমদানি করা এসব কাগজ নিম্নমানের হলেও দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা এসব কাগজের প্রতিই ঝুঁকছে বেশি। এভাবে চোরাকারবারির মাধ্যমে আসা এসব কাগজের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বর্তমানে চরম মন্দাবস্থা যাচ্ছে। কেউ কেউ এসব অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। শিগগিরই এসব অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সরকার কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দেশীয় কাগজশিল্পে ধস নামতে বাধ্য বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।
দেশে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭১টি কাগজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কারখানার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ১২ লাখ টন। আর কাগজের চাহিদা রয়েছে বছরে সাত লাখ টন। কারখানাগুলো দেশের সব ধরনের কাগজের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করতে সক্ষম। কিন্তু দেশে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা বিদেশি কাগজের কারণে মার খাচ্ছে দেশীয় শিল্প-কারখানাগুলো।
কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা এসব কাগজ রাজধানীর কাগজের বাজারে নিয়ে আসে একটি বড় সিন্ডিকেট। তারা কাস্টম ও পুলিশকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছে। শুল্ক গোয়েন্দা, বন্ড কমিশনারেট ও ভ্যাট কর্তৃপক্ষের নজরদারি এড়িয়ে সিন্ডিকেটটি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব আয় হারাচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী জানান, বিদেশি কাগজ চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট একসময় রাতের আঁধারে এসব কাগজ নয়াবাজারে খালাস করত। কিন্তু এখন তারা এতই প্রভাবশালী ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে দিনদুপুরেই চোরাই কাগজ বাজারে ঢোকাচ্ছে এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব কাগজ খালাস করছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রশাসনের লোকদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়েই চক্রটি প্রতাপের সঙ্গে এই কাজ করে আসছে।
নয়াবাজারের বিদেশি কাগজের মার্কেটখ্যাত নূরজাহান মার্কেটে ঘুরে দেখা যায় ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভারত থেকে আমদানি করা কৃষ্ণ, হানসল, গোড়া, পান্ডা, নিম্বো, ড্রাগন, শ্রিয়া মরিয়েম ব্র্যান্ডের আর্ট কার্ড, আর্ট পেপার ও ডুপ্লেক্স বোর্ডের ছড়াছড়ি। ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতের কৃষ্ণ ব্র্যান্ডের কাগজ বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে ঢুকছে। সম্প্রতি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আনা এসব কাগজ বাইরে বিক্রির সময় দুই ট্রাক কাগজ আটকও করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে এসব কাগজ আমদানি হয়েছে তাদের অস্তিত্বও পাওয়া যায় না। ধরা পড়লেই কৌশলে পাল্টে ফেলা হয় প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট কমিশনার ড. মো. সহিদুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে বন্ড লাইসেন্স পাওয়া ছয় হাজার ২৯টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ চালানো হয়। এ সময় ৩৫০টির ঠিকানায় গিয়ে কিছুই পাওয়া যায়নি। এসব অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পোশাক কারখানার নামই বেশি। এ ছাড়া টেক্সটাইল, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিং, প্লাস্টিক কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই ঢাকার মিরপুর, সাভার ও আশুলিয়া এবং গাজীপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায়। এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, আমদানি-রপ্তানির ওপর স্থগিতাদেশ, অর্থদণ্ডসহ মামলা- এমন বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়েছে বলে জানান সহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠান যাতে এখন থেকে আর আমদানি-রপ্তানি কিংবা দেশের ভেতরেও কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
-কালের কণ্ঠ